ভাষার কাছে আমার জবাবদিহি

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে, আমাদের একটি ভাষা ছিলো। সেই ভাষাকে ঘিরে অনেক মায়া ছিলো। ভাষার জন্য রক্তঝরা দিন ছিলো।

ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে, মাকে লেখা চিঠিটা খোকার বুকপকেটে ছিলো – ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা। পলাশ বনে তখন ফাগুন ছিলো, বুকে খোকার আগুন ছিলো।

ফেব্রুয়ারি এলেই খোঁজ পড়ে, দুঃখীনি বর্ণমালার। মনে পড়ে দিন দিন ভাষার বিকৃতির কথা। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার গুরুত্ব ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার কথা। বাংলা বই পড়তে ওদের কষ্ট হওয়ার কথা। স্কুলব্যাগ ও সিলেবাসে দুটো মাত্র বাংলা বইয়ের কথা।

ছেলেরা আমার ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। ইংরেজি বোলের তুবড়ি ছোটাতে পারে অনায়াসে। স্কুলে বাংলা বলা নিষেধ ওদের, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সারাজীবন ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর বিরোধিতা করেও নিজের সন্তানদের শেষপর্যন্ত ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করেছি। অপরাধবোধ হয় নাকি কখনো? হয়। তবু কেন করেছি? ছেলেদের ভালো ইংরেজি শেখানোর জন্য? চাকরির বাজারে ভালো দাম পাওয়ার জন্য? সমাজের চোখে জাতে ওঠার জন্য?

না, এর কোনটাই নয়। বরং ছাপোষা চাকুরীজীবী আমাদের উচ্চমূল্যের এই ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানদের পড়াতে কষ্ট হয়। এই উচ্চমূল্যের বিনিময়ে ভালো শিক্ষা, উন্নত মূল্যবোধ কতটা পাচ্ছে তা ঠাহর করতে পারি না। তবুও ওরা ইংরেজী মাধ্যমেই পড়ে। বাংলা মাধ্যমে ওদের ভর্তি করতে পারিনি আমরা।

পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পাঠ্যবইয়ে অসংখ্য ভুল, বছরের পর বছর লাগাতার প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন বাংলা মাধ্যম স্কুলের স্বল্পতা আমাকে বাধ্য করেছে, প্ররোচিত করেছে ইংরেজdd মাধ্যমের দ্বারস্থ হতে।

হাতে গোনা যে কয়টা বাংলা ভালো স্কুল আছে সেগুলোতে সন্তানদের ভর্তি করতে পারা রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার। চেষ্টা করেছিলাম, সফল হইনি। ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে জিততে গিয়ে ছেলে এবং আমি অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের ভিতর দিয়ে গেছি। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। কারণটা খুবই সোজা। গুটিকয়েক ভালো স্কুলের সীমিত আসনসংখ্যা। এর সাথে আমার সন্তান বা অন্য কোন শিশুর মেধার কোন সম্পর্ক নেই।

আমার দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমার মতো অসংখ্য অভিভাবকদের এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে, আয় যেমনই হোক না কেন, খেয়ে না খেয়ে সবাই ছুটছি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দিকে। আর সেই সুযোগে বেশ ব্যবসা জমিয়ে বসেছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো। বছর বছর বেতন বাড়ানো থেকে শুরু করে নানা অজুহাতে চলছে টাকা বাগিয়ে নেয়ার আয়োজন। তার বিনিময়ে প্রকৃত শিক্ষা কতটা পাচ্ছে বলা মুুুশকিল। তবে বাংলা থেকে দুরে সরে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে।

২১শে ফেব্রুয়ারীর বা ৮ই ফাল্গুনের কাছে আমার, আমাদের অপরাধের সীমা নেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 136
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    136
    Shares

লেখাটি ২৬৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.