একুশ আমার ভালবাসা

0

লুৎফুন ভুঁইয়া হেনা:

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।

আজ মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভেঙে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বলা হয় ঊর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করা হবে। এর বিরুদ্ধে বাঙ্গালী প্রতিবাদ জানায়। সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা কমিটি করা হয়। ছাত্র পরিষদ থেকে বলা হয়,

“রাষ্ট্র ভাষা হবে বাংলা”

আইয়ুব খান এর বিপক্ষে মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করলেন। আমতলার ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ থেকে সেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এগিয়ে যায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিল, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। এরপর এক নতুন ইতিহাস। হানাদার বাহিনী ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলি ছুঁড়লো ৩ঃ২০ মিনিটে সেই মিছিলে। ৩ঃ৫০ এ নিহত হলেন সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারমহ মোট ১২ জন। মাত্র ৩০ মিনিটে জেগে উঠলো বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ। সূচিত হলো লাল-সবুজ পতাকার স্বপ্নবুননের কাজ। সালাম, রফিক, বরকতের শ্লোগান ছড়িয়ে পড়লো মুখরিত হয়ে সবার মুখে মুখে,

“রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”।

বাংলা আমার ভাষা। আমি এই ভাষায় মা ডাকতে শিখেছি। বাংলা আমার হ্রদয়মথিত শব্দ, আমার চেতনায় বেড়ে উঠার দীক্ষা। আমার এই ভাষার জন্য সালাম, রফিক, বরকত হয়েছেন যুথিবদ্ধ, হয়েছেন রক্তাক্ত। এমন ত্যাগ বুঝি আর কোথাও নাই। এমন ইতিহাস আর কোথাও নাই, ভাষার জন্য জীবন দান। ভাষার জন্য জীবন দান এই স্রোত প্রবাহিত হয়ে ৭১ এ গিয়ে মিললো। অর্জিত হলো ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে প্রিয় সবাধীনতা।

এমন প্রেরণা, দোল শুধু বাঙালীই অনুভব করতে পারে, তাই মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা বিজয় পেয়েছি, একটি দেশ পেয়েছি। আমার তাই প্রথম আবেগ আমার ২১, আমার এক রক্তঝরা মহাগাঁথা। আমার রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার তাই আজ আমার সব শিমুল ফুল।

২১ শে ফেব্রুয়ারি একাধারে শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর প্যারিস অধিবেশনে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। জাতিসঙ্ঘ তার ৬৫তম অধিবেশনে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে।
এই অর্জন আমাদের সবার। এই অর্জন শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এই দিবস দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বে আমাদের পরিচিতি এক ত্যাগ আর এক প্রাপ্তির।

মোদের গরব মোদের আশা
আ-মরি বাংলা ভাষা।

সেদিন আমরা অধিকার আদায়ে একত্রিত ছিলাম, তাই আমাদের সবার একত্রিত সুর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে প্রতি বছর বেজে উঠে একইভাবে সারা বিশ্বে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি!

না, আমরা তোমাদের ভুলি নাই। অনেকে বলে আমাদের দেশে কবে একজন কেজরিওয়ালের (দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী) জন্ম হবে? আমার তো মনে হয় সেই ৫২ তেই আমাদের কেজরিওয়ালের জন্ম হয়েছে। আমার ভাই, সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার ওরাই তো আমাদের কেজরিওয়াল। ওরা ছাড়া আর কে পারে মাকে এমন করে ভালবাসতে?

আমি স্বপ্ন দেখি
স্বপ্নে বাঁধি ঘর
২১ থেকে একাত্তরে
স্বপ্নে তাই আমি বিভোর।

আমি ২১ কে নিয়ে তাই কাঁদতে আসিনি। আমি স্বপ্নকে সত্যি করতে এসেছি। কৃষ্ণচূড়ার তলে যারা প্রাণ দিয়েছে আমি তাদের কথা বলতে এসেছি। আমি হৃদয়ের কথাকে বোধে জাগাতে এসেছি। আমার ভাইরা যেখানে প্রাণ দিয়েছে, আমি হাজার বছর পরেও সেখানে ফিরে আসবো, গাইবো, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনের কাছে বাঙালী চীর ঋণী
২১ তোমাকে আমরা আজো ভুলিনি।

প্রায় ৬২ বছর পরে আমার দুঃখিনী ভাষা আজ আমার কাছে মনে হয় এক অবহেলিত, রুগ্ন এক ভাষা। সোশ্যাল মিডিয়াতে যেনতেন ভাবে ভাষাকে মর্যাদাহীন করা হচ্ছে। এর যেন কোনx মান নেই, ব্যাকরণ নেই। স্কুলগুলোতে ভাষার কোনো মর্যাদা নেই। মনে হচ্ছে বাংলায় একটু কথা বলতে পারলেই এর দায় শেষ। এরকম কেন হবে? ভাষার তো একটা কাঠামো আছে, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কার? অবশ্যই আমার/আপনার। ভাষাকে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হবে। প্রমিত ভাষায় কথা বলা, লেখা, চর্চা করতে হবে।

আমরা যারা দেশের বাইরে আছি তারা ভাষার জন্য নিজেকে কিছুটা নিয়োগ করতে পারি। বাংলা স্কুল, পাঠাগার , কালচারাল প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়াতে পারি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলায় শুধু কথা বলবে না, বাংলা লিখবে, শিখবে, বাংলাকে হ্রদয়ে ধারণ করবে অভিভাবকগণ, এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিবেন, আমার বিনীত অনুরোধ রইলো।
ভাষাকে মর্যাদার সাথে, মায়ের মতো করে ভালবাসবেন সবাই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.