বহুমুখী শিক্ষার কবল থেকে রক্ষা পাক বাংলা ভাষা

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

“ মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে,
কতই শান্তি … ভালোবাসা …..
আ-মরি বাংলা ভাষা।
মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।”

বাংলা ভাষা নিয়ে আমার তেমন কিছু বলার নেই। আমি বাঙালি, বাংলায় কথা বলি। বাংলায় লেখি। বাংলায় ভাবি। আমার স্বপ্নগুলি সবই বাংলায়। বাংলা যে আমার প্রাণের ভাষা।

জানি ইংরেজী ভাষার দরকার আছে। কিন্তু তা কখনোই বাংলা ছাপিয়ে নয়। এই যে এতো এতো ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা, তা কি ঠিক? না মানে এইরুপ বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা কি আমাদের মধ্যে শ্রেণি বিভেদ তৈরি করছে না? যদি বাংলা মাধ্যমেই ভালোভাবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাটা দেয়া যেত, তাহলে অন্তত বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের হীনমন্যতা আর থাকতো না।

না, আমি কোনো শিক্ষা গবেষক নই। আমি বাংলা মাধ্যমে পড়ে আসা এক প্রবাসী নারী। যার সন্তানরা বিদেশি স্কুলে ভিন্ন দেশীয় ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর তাই একজন বাঙালি মা তার সন্তানদের মুখে বাংলার ব্যবহার নিয়ে চিন্তায় থাকে। কারণ শুদ্ধ বাংলা ভাষার ব্যবহার যে খুব জরুরি।

জানেন, আমি যে দেশে থাকি, এই দেশের মানুষেরা তাদের মাতৃভাষাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। হ্যাঁ, আমাদের চাইতেও একটু বেশি! এরা এদের ভাষাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। নিজ দেশে তারা সরকারি অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল সর্বত্র তাদের ফরাসি ভাষা ব্যবহার সুনিশ্চিত করে রেখেছে।

ইংরেজি বলতে না পারা নিয়ে এদের তেমন হীনমন্যতা নেই। আছে অনেক ক্ষেত্রেই দাম্ভিকতা। সমাজে প্রতিষ্ঠিত উঁচুস্তরের অনেকেই ইংরেজি বলেন না। সরকারি চাকুরিতে ইংরেজি জানার বাধ্যবাধকতা নেই। এই দেশে থাকতে হলে আপনাকে ফরাসি বলতে হবে এবং বলতেই হবে। ফরাসি ভাষা শেখার জন্য আছে সরকারি ফ্রি ব্যবস্থা। আছে অজস্র বেসরকারি স্কুল।

এদেশের শিক্ষার মাধ্যম একটি। আর সেটা ফরাসি ভাষা। তাই বলেকি অন্য ভাষার জ্ঞান কিংবা শিক্ষা দেওয়া হয় না? হয়, অন্য ভাষাও তাদের শেখানো হয়। কিন্তু ফরাসি ভাষার আধিপত্য খর্ব না করে।

হ্যাঁ, ফরাসি ভাষা না পারলে এই দেশে আপনি থাকতে পারবেন। পড়াশোনাও করতে পারবেন। কিন্তু এরপর কী? অন্যের সাহায্য নিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম বিশেষ করে অফিসিয়াল কাজগুলি করতে হবে।

আমি যে শহরে থাকি এই শহরে ইংরেজি একেবারেই চলে না। সবাই ফরাসি ভাষায় কথা বলে। অফিসগুলিতে, হাসপাতালে, ডাক্তার, স্কুলের শিক্ষক সবাই। না, আমি তেমন ফরাসি ভাষা পারি না। তবুও যা পারি তাই বলতে হয়। তবুও ইংরেজি চলবে না।

অবশ্য এরা অন্য ভাষার প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করে। শুধু তাই নয়, অন্য ভাষাভাষীরা যেন বাড়িতে চর্চা করে সে ব্যাপারে জোর দেয়। যেমন, স্কুলের শিশুদের ও অভিভাবকদের বলে যে, তারা যেন তাদের ব্যবহার করে। তবুও বাঙালির ইংরেজি প্রীতি এতোই বেশি যে অনেকে তাদের সন্তানদের বাড়িতে ইংরেজি শেখাতেই ব্যস্ত। আর হবে নাই বা কেন? নিজেরাও তো ফরাসি না শিখে ইংরেজী ব্যবহার করাকেই গর্ব মনে করে!

এইদেশে আসার পর থেকেই শুধু মনে হয়েছে, বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসায় কোথায় যেন কমতি রয়ে গেছে। ভাবি, যে ভাষার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা আন্দোলন করেছে, যে ভাষার জন্যে তারা প্রাণ দিয়েছে, আজ আমরা সেই বাংলা ভাষাকে ছোট করি।

এই যে বাংলা ছাপিয়ে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার দুরবস্থা আর ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার জনপ্রিয়তা, ইংরেজী উচ্চারণে বাংলা ভাষার ব্যবহার। ইংরেজি ভাষা জ্ঞানকে স্মার্ট ভাবা। বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীদের ছোট করার প্রবণতাসহ আরো অনেক কিছু।

মজার ব্যাপার হলো যে, ইংরেজী মাধ্যমের মতো মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাও কিন্তু এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিরুপ মনোভাব তৈরি করছে। অযাচিত আরবি ভাষার ব্যবহার, এবং বাংলা ভাষা ও এর নামগুলিকে হিন্দু হিন্দু বলে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতাও কিন্তু ভয়ংকর।

একটি জাতির প্রথম পরিচয়তো তার ভাষা ও সংস্কৃতিতে। হ্যাঁ, ভাষা আর সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটবে, কিন্তু তা কতটুকু?
অবশ্য এইসব নিয়ে বেশি বলা আমার মতো নারীদের জন্যে পাপ। কারণ সুশীল সমাজ তখন ইংরেজি শিক্ষা বিস্তার নিয়ে সাতকাহন শোনাবে। অন্যদিকে কুশীল সমাজ নারীবাদী ট্যাগ দিয়া নাস্তিক ঘোষণা করবে।

আর এই সবের মাঝে হারিয়ে যাবে বাংলা ভাষার সম্মান। বাংলা ভাষা তার অপরূপ সৌন্দর্য আর মাধুর্য হারিয়ে ফেসবুকে ঘুরে বেড়াবে কদর্য রূপ হয়ে। মানে, মনের নোংরামিতে বাংলা ভাষাকে আমরা অপবিত্র করে ফেলবো।

তাই বলি, আসুন না আমরা সবাই আরেকটি বার ভাষার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা প্রকাশ করি। বাংলা ভাষার যত সুন্দর মিষ্টি মাধুর্যতা আছে, তারই ব্যবহার করি।

“আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন
আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে
হেঁটেছি এতটা দূর।

বাংলা আমার জীবনানন্দ
বাংলা প্রাণের সুর
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ। ”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 134
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    134
    Shares

লেখাটি ২৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.