“একুশে ফেব্রুয়ারি ভাবনা”

0

সালমা লুনা:

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?
– না পারি না।
কেন পারি না?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ, আবার সহজও না। আমি বা আমার প্রজন্ম একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ একুশ চিনেছিলাম কীভাবে?

অন্যের কথা জানি না। আমার একুশ চেনার গল্প একদমই সহজ। স্বাধীনতা যুদ্ধের মতোই একুশের গল্পও প্রথম শোনা মায়ের মুখে। তাঁর কাছেই প্রথম শোনা সালাম, বরকত, রফিক জব্বারের নাম, আর তাদের রক্ত ঝরার গল্পটা।

এরপর বাবাকে দেখেছি ভোরের আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে যাচ্ছেন প্রভাতফেরিতে যোগ দিতে। হোক না জেলা শহরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দাায়িত্ব পালন করতেই সেই যাওয়া। তবুও যাওয়াটায় একটা কিছু ছিলো। যা আমাকে শৈশবেই একুশকে চিনিয়েছে। একটা মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

আমি বায়না ধরতাম, আমিও যাবো। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভেঙে উঠে বসতাম। কিন্তু যাওয়া বারণ ছিলো ছোটদের। আমার মাও কখনো বাবার সঙ্গী হননি। সরকারি আবাসনে থাকা অন্য কোনো নারীদেরও দেখিনি তাদের স্বামীদের সঙ্গিনী হতে। এমন ছিলো না যে নারীরা কেউ প্রভাতফেরিতে যেতেন না। অবশ্যই যেতেন। কিন্তু সেইসব সরকারি অফিসারের শুধুই গৃহিনী নারীদের দেখিনি স্বামীর সাথে পা মিলিয়ে প্রভাতফেরিতে যেতে। এতোকিছু অবশ্য তখন হতো না। কেন হতো না সেটি এই লেখার বিষয় নয় আপাতত।

আমার দেখা মফস্বলগুলোতে এসময়টাতে হালকা শীতের আমেজ তখনও থাকতো – মনে পড়ে।
পোশাকের কোন ধরাবাঁধা নিয়ম দেখিনি। আব্বা প্যান্টশার্ট পরেই বেরিয়ে যেতেন, তবে আব্বা বেরিয়ে যাবার সময় আম্মা চটি স্যান্ডেল পরে নিতে মনে করিয়ে দিতো। কারণ ওখানে গিয়েই খালি পা হতে হবে।
শহীদ মিনারে জুতো পায়ে যাওয়া বারণ – সেই যে ভেতরে ঢুকে গেলো! নিজে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যাইনি কখনো, তবুও এখনো অন্য কাউকে এর ব্যতিক্রম করতে দেখলেও উসখুস করি।

এরপর একুশ জানার পালা পাঠ্যপুস্তকে। এবং ধীরে ধীরে কবিতা গল্প উপন্যাস সিনেমার হাত ধরে।
মনে আছে, সম্ভবত জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন ছিলো সেটি। প্রথমবার পড়তে পড়তে মনে হয়েছিলো আমি যেন সেই সময়েই জন্মেছিলাম! “আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হবো “- সে যে কী অদ্ভুত রোমাঞ্চ লাইনটিতে!
রক্ত যেন টগবগ করে উঠলো।

আমি অনেকবারই নিজে শহীদ মিনার বানিয়েছি। ইট, বাঁশ কাঠি এসব দিয়ে। শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পাড়ার খেলার সহযোগীদের নিয়ে। তাতে ফুল দিয়েছি যথাসম্ভব ভাবগাম্ভীর্যের সাথে। গান গাইতে গাইতে, ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি ……

আমাদের সেই সময়ে স্কুলগুলো বন্ধ থাকতো। স্কুলে অনুষ্ঠান হতো না, প্রভাতফেরিও না। এমনকি সেখানে কোনো শহীদ মিনারও ছিলো না। স্কুলে স্কুলে শহীদ মিনার তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে অনেক পরে। অনুষ্ঠানও বাধ্যতামূলক হয়েছে, সেও খুব বেশিদিন হয়নি।
এতোসব ব্যবস্থা হলো, ভালোই হলো।
চেতনা জাগ্রত করার কাজ গোঁড়া থেকে শুরু করার এই চেষ্টা খারাপ না। বারবার বলে বা করে একটা জিনিস মগজে মননে গেঁথে দেয়ার এই চেষ্টা খারাপ হবেই বা কেন!

কিন্তু চেতনা কতটুকু জাগ্রত হলো?

কালে কালে আরো অনেককিছুই হলো! এখন আমরা প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন জাতি। ছেচল্লিশ বছর বয়স দেশটার! একুশের চেতনার বয়সও অনেক হলো।
আমাদের একুশের চেতনা জাগ্রত কি হলো ঠিকঠাক?

আমি নিজেকেই বলি, আমি কি আমার মায়ের মতো হতে পেরেছি?
একাডেমিক দিক দিয়ে আমি মায়ের চেয়ে একটা সার্টিফিকেট বেশি পকেটে পুরেছি। আমি আমার মায়ের চেয়ে বেশি পড়াশোনা করেছি, সপ্রতিভ চটপটে। আমার মা ঘর সামলেছেন শুধু। আর আমি? ঘর বার সব সামলাই সমান দক্ষতায়।

কিন্তু আমি কি আমার ছেলেমেয়ের মননে একুশকে গেঁথে দিতে পেরেছি? আমি কি একুশের ভাব,তার গাম্ভীর্য, তার চেতনা চেনাতে পেরেছি ?

প্রজন্মগুলোর আছে শিক্ষিত মা, তাদের আছে শিক্ষার অজস্র উপকরণ। আছে আধুনিক স্কুল, স্কুলে শহীদ মিনার, দিনব্যাপী একুশের অনুষ্ঠান, আবৃত্তি গান। আছে জানার হাজারো মাধ্যম – আঙ্গুলের দুই টোকায় যেখানে খুলে যায় জানার অফুরন্ত ভাণ্ডার।
তবু কি তারা একুশকে ঠিকঠাক চেনে

এইমুহুর্তে আমাদের চেতনায় একুশ কীভাবে আছে এটা একদম প্রকাশ্য। বাণিজ্য হোক বা দেখানেপনা, একুশের মর্যাদা বলে কিছু যে আছে তা বোঝা যাচ্ছে কতটুকু?

এখন পত্রিকার ফিচার পাতা বা ম্যাগাজিনে ছাপা হয় চটকদার রঙচঙে ছবিসহ – একুশের খাবার , একুশের সাজ বা পোশাক, একুশের গহনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
স্কুলের ব্যানারে একুশ ছাপা হয় বাংলা ইংরেজির মিশেলে নয়তো ভুলভাল বানানে। কখনো সেখানে একুশের শহীদদের ছবির বদলে ভুলভালে ছাপা হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি। সাদাকালো পোশাকের দোকানের ভীড় এখন টেলিভিশনের বিশেষ খবর। পাঠ্যপুস্তকে একুশ থাকলেও বাচ্চাদের মনেও পড়ে না ঠিকমতো – একুশটা যেন কী!

তাই বলে তারা কি একুশকে চিনে না একেবারেই!
তারাও চিনে নেয় একুশকে। একুশে ফেব্রুয়ারি- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

আর এছাড়া একুশ আছে এখন পোশাকে। ফ্যাশন হাউজে। একুশ আছে চাকচিক্যে। একুশ আছে আতিশয্যে। একুশ আছে সাজে বাহারে। পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে আর সাহিত্য পাতায়। শহীদ মিনার ধোয়ামোছায়। অসংখ্য টেলিভিশনে চ্যানেলে। একুশ আছে সমালোচনায়। ঘাপটি মেরে বসে খপ’টি করে ধরে খবর বানানোয়। একুশ আছে ঝোঁপে বুঝে কোপে। আছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

কে দায়ী?

আমরা সবাই-ই কি?

আসছে ফাল্গুনে আমরাও কি দ্বিগুণ হবো? এখানে আর রোমাঞ্চ নয়, ভয় হয়।

শেয়ার করুন:
  • 215
  •  
  •  
  •  
  •  
    215
    Shares

লেখাটি ৩৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.