“স্বপ্নেরা এমনও হয়”

0

সালমা লুনা:

আমি ঘুরতে পছন্দ করি বলেই স্বপ্নেও ব্যাপক ঘুরাঘুরি করি। কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম একই সাথে স্থলে, জলে, বনে পাহাড়ে ঘুরছি।
আমার মতো এলেবেলে একজন মানুষের কোনো স্বপ্নেরই কোনো বিশেষত্ব থাকার কথা না। তবুও আমাকে ভাবনায় ফেলেছে সদ্যই দেখা স্বপ্নের শেষটা।
স্বপ্নের মানে দেখার বইটই তো আর আধুকায়ন হয়নি বোধহয়, নইলে একটা খোয়াবনামা কিনে মানে দেখা যেতো স্বপ্নটার।

স্বপ্নের শেষটা না হয় পরে বলি?!

মনটা কদিন থেকেই খারাপ। পাহাড়ের মারমা মেয়েদুটিকে থেকে থেকে মনে পড়ে। একটা ছবিও ঘুরেফিরে দেখি খুব। দুজন নারীর মাঝে একজন যার নিম্নাঙ্গ রক্তেভেজা। আমি বুঝতে চাই এই ছবিটা আসলে কাদের। আমার মাথায় যন্ত্রণা হয়।
একজন রাণী অথবা নারীর সাহসের কথা পড়ি। আমার পাহাড়ে যেতে ইচ্ছা করে। ওই ধর্ষিত আর নিপীড়িত মেয়েদুটিকে খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করে। নয়তো ওই সাহসী নারীর পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছা করে। আমার সাহস নাই তো, তাই হয়তো এমন ইচ্ছা। আমি সেসব না করতে পেরে গান শুনি, ইউটিউবে ভিডিও দেখি। ইমন চক্রবর্তী ভীষণ আবিষ্ট হয়ে নেচে নেচে গাইছেন, তু লাল পাহাড়ির দেশে যা রাঙামাটির দেশে যা হিঁথায় তুরে মানাইছে না রে, ইক্কেবারে মানাইছেনাক রে…

আমিও জানি তো, আমাকে পাহাড়ে মানাবে না। আমি সমতলের মানুষ। পাহাড়ের মানুষদের কাছে যাওয়া তাদের দুঃখের সাথী হওয়া তো দূর, সমতলেও আমি বেমানান!
সেই যে বাবাটি কোলে ছোট্ট বাচ্চাটিকে নিয়ে কেঁদে কেঁদে তাঁর ওইটুকু বাচ্চার ধর্ষণের বিচার চাইলো আমি তো তাঁর পাশেই যেতে পারিনাই। আমারও তো তখন ইচ্ছে করেছিলো চেঁচিয়ে আকাশ মাটি কাঁপিয়ে বলি, এক্ষুনি বিচার কর হে অক্ষম রাষ্ট্র! বিচার কর, নয়তো নরকে যাবি। তোর মুখে পেচ্ছাব করে দেবে একাত্তরের পাকবাহিনী আর তাদের দোসরেরা। সইতে পারবি সেই জাহান্নামের আগুন?
করতে পারি নাই । পারি না।
যেমন পারি নাই তনুর বেলায়। ধর্ষকেরা যে একই বনের ভালুক।

যাকগে যা বলছিলাম।
হ্যা, সেই স্বপ্ন!

স্বপ্ন দেখলাম সবকিছু ঘুরে এক বিশাল হলরুমে ঢুকে পড়েছি। সেখানে কেউ বক্তৃতা করছেন। বক্তৃতাই শোনা যাচ্ছে শুধু, কারো মুখ দেখতে পাইনি। এত এত লোকজনের ভীড়। সবাই আনন্দিত- উৎফুল্ল, হৈচৈ চেঁচামেচি সত্বেও সেই অদ্ভুত বক্তৃতা এখনো কানে বাজছে স্পষ্ট, আমরা আপনাদের সুখ দিয়েছি – সুখী হোন। একটা আনন্দের জীবন দিয়েছি – তাই নিয়ে আনন্দে থাকুন। প্রতিবাদ ভুলে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি করেছি- ভুলে যান সব।

হাততালির শব্দে ফেটে পড়লো চারদিক। অট্টহাসি প্রতিধ্বনিত হলো চারিদিকে।
এরই মাঝে মূর্খ কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠলো, মানবো না ! আমার প্রতিবাদের ভাষা ফিরিয়ে দাও, দিতে হবে।
আমার কী হলো, আমিও অর্বাচীনের মতো গর্জে উঠলাম দাও দাও দাও।

স্বপ্ন তো, তাই কোন ধারাবাহিকতা নেই। এরপরে হঠাতই নিজেকে দেখলাম একটি দ্রুতগামী নৌকায়। সেই নৌকা দ্রুতবেগে পেরিয়ে যাচ্ছে পদ্মা মেঘনা যমুনা ব্রহ্মপূত্র ….
হঠাতই দেখি নদীর ঘোলা জলে রক্তের ঘূর্ণি।
নৌকার ভেতরে আমি ছাড়াও আরো অনেকেই ছিলো। একজন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন, ওমা আমি নয়ন জলে ভাসি ….
নৌকায় একজন মাঝি ধমকে উঠলো, কান্দন থামান! ঢঙ কইরেন না। আল্লা আল্লা করেন।

আমরা চুপ। নৌকা চলতে চলতে ভরা নদী থেকে একলাফে তীরে উঠে এলো। সবাই অবাক হয়ে বলাবলি করছে, এটা কী হলো ! কীভাবে সম্ভব ?

নৌকার কালোকেলো মাঝিটা দাঁত বের করে বললো, এইটা আজব নাও। পানিতে চলে, ডাঙায় চলে চাইলে আসমানেও উড়তে পারবো। দ্যাকবেন ?

কেউ কোন উত্তর দেবার আগেই আমার ঘুম ভেঙে গেলো।
স্বপ্নও এমন হয়!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 168
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    168
    Shares

লেখাটি ৫৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.