আমাদের মতোন রেসিস্ট কমই আছে

0

নায়লা জাহিন আনা:

রেসিজমে আমেরিকান, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ানরা সবচেয়ে উপরে থাকলেও এশিয়ানদের মতো রেসিস্ট খুব কমই দেখেছি আমি, বিশেষ করে সাউথ এশিয়ান। পার্থক্য হচ্ছে এখানে যারা রেসিজমের শিকার তারা প্রতিবাদ করে ভাত পায় না। আবার অনেকের ধারণা বাদামী, কালা চামড়ারা রেসিস্ট হতে পারে না। তারা বোঝে না যে কলোনিয়ালিজমের থাবা কত শক্তিশালী হতে পারে!

১-
নিজেরই উদাহরণ দেই- আমি দেখতে কালো, মোটা আর জামাকাপড়-চুল সাধারণ বাঙ্গালি ললনার মতো রাখি না। এ নিয়ে জীবনে যে কতো খোঁটা সহ্য করেছি তা আমার হিসাব নেই। একদম ছোটবেলা থেকেই আমার গায়ের রং, আকার নিয়ে আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে কাপড়ের দোকানদারের চিন্তার শেষ ছিল না, আমার বিয়ে হবে কিভাবে এ আফসোস করতে করতে তাদের জীবন চলে যেত। আমার সুন্দরী বান্ধবী আমাকে নিয়ে সবজায়গায় যেতো, এমনকি তার সাথে ডেটিংএও নিয়ে যেতো। পরে জেনেছি এর কারণ ছিল যে, আমি সাথে থাকলে নাকি তাকে আরো সুন্দরী দেখায়। ৮-১০ বছর বয়সে একবার কলেজে পড়া পাড়ার বড় ভাই আমার সাথে খেলতে থাকা ফর্সা সুন্দরী বান্ধবীকে কাঁচা আমের আচার দিয়েছিলো, আমি নিতে গেলে আমাকে বলেছিল, ‘তোকে দিবো না, তুই সুন্দর না।’ এই একটি ঘটনা এখনো আমার মাথায় কাঁটার মত বিঁধে আছে।

এইরকম আচরণ, কথাবার্তার কারণে নিজের শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে যে হীনমন্বতা তৈরি হয়েছে তা এখনো আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আমি এখনো কোন প্রশংসা নিতে পারি না। সাদা চকলেট আমাকে সুন্দর বললে ওকে গালি দেই, এখানকার মানুষগুলো যখন কোন কারণে প্রশংসা করে তখন মেজাজ খারাপ হয়। কারণ আমি তো সারাজীবন জেনে আসছি আমি সুন্দর না। তার মানে এরা নিশ্চয়ই মিথ্যা করে বলছে।

২-
ঢাকা ভার্সিটির একটা ছেলে নাকি গায়ের রঙয়ের জন্য বুলিং এর শিকার হয়ে, সাথে অন্যান্য হতাশায় আত্মহত্যা করেছে। ছেলে কালো, গাইয়া খ্যাত ছিল, এজন্য তার সহপাঠীরা তো বটেই, তার শিক্ষকরাও নাকি তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো। এই মৃত্যুর দায় আমাদের সাদা চামড়া পূজাকারী সবার। আমাদের মিডিয়াতে কোন কালো রঙয়ের মানুষ নেই, কালো মোটা কেউ থাকলে তাকে কমিক বানিয়ে তার শরীর নিয়ে মজা করা হয়। নায়িকাদের কথা তো বাদই দিলাম, কালো মেয়েটাকে কাজের বুয়ার পার্ট দেয়া হয়। সিনেমায় ভিলেন হয় কালো, মোটা তেলতেলে লোকটা। উপন্যাসে, ছোটগল্পের নায়িকারা হয় দুধের মত সাদা; কালো মেয়েটা হয় বেশ্যা, নাহয় কাজের মেয়ে যে ড্রাইভারের সাথে পেট বাধায়। আমরা হিরো আলমকে পচানোর সময় তার গায়ের রঙকে আগে টেনে আনি, সাহারা খাতুনকে নিয়ে কথা বলার সময় তাকে কালো, কুৎসিত বলে গালি দিয়ে নেই আগে। সন্তান কালো হলে নতুন বাবা মায়ের সামনেই সবাই হায় হুতাশ করে, যৌতুকের জন্য জমানোর উপদেশ দেয়। আমরা সেই দেশ যেখানে কিছুদিন আগেই কালো হওয়ার জন্য নবজাতক কন্যাকে বাবা-দাদী মিলে খুন করেছে। এই দেশে কালো কুৎসিত কারো বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই।

৩-
জাতিগত রেজিসমে আমরা আমেরিকানদেরকেও ছাড়িয়ে যাই। আমরা পৃথিবীর প্রথম জাতি যারা ভাষার জন্য, নিজের মৌলিকত্ব রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলাম। আর এখন আমরাই আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা পাহাড়িদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় আছি। পাহাড়ে সেনাবাহিনী ধর্ষন, দখল, খুন, অশান্তি, অরাজকতা সৃষ্টি করে কত জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখছে তা নিয়ে কারো খেয়াল নেই। সেনাসদস্যের হাতে দুজন মেয়ের যৌন নির্যাতনের বিচার তো দূরের কথা, তাদের হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। জীবনের নিরাপত্তাটুকুও নেই মেয়েগুলোর আর। প্রতিবাদ করায় রানী ইয়েন ইয়েনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সাহস করে তারা। আর এদিকে আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি; তাদের চিংকু, নাক চেপটা, জংলী বলে গালি দেই। ভালো না লাগলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলি। যেন তাদের কোন অধিকার নেই এই ভূমিতে।

পাকিস্তানিদের তেইশ বছরের অত্যাচারের জবাবে আমরা নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। আমাদেরও প্রায় পঞ্চাশ বছরের অবিচারের জবাব পাহাড়িরা একদিন দেবে। সেদিন আমি তাদের সাথে দাঁড়াবো। সবসময় ন্যায়ের সাথে ছিলাম, তখনো থাকবো। সেদিন ইতিহাস আমাদের সাথে দয়া দেখাবে না। অত্যাচারী হানাদাররা কখনোই দয়া পায় নি, পাবেও না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ২,৩১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.