‘আজকাল আমার খুব ক্লান্ত লাগে’

0

প্রমা ইসরাত:

আমার ভালো লাগছে না। কেমন যেন অস্থিরতায় মন ছটফট করছে,বিষাদ লাগছে। ভাবছি এইতো আর কয়েকটা দিন পরই বই মেলা শেষ হয়ে যাবে। কেমন যেন স্কুলের ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি। এটা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা পুরো গল্প লিখতে পারছি না। যে জীবন চাকরের, মজুরের লেখালেখির সাথে তার হয় নাকো দেখা।

বইমেলায় গিয়ে একটা দুটো সেলফি তুলছি, আড্ডা দিচ্ছি মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্যান্টিনে ১৫ টাকা দিয়ে ছোট একটা কাপের অর্ধেক কফি খাচ্ছি, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, বইমেলায় বই কিনতে আসা নোংরা মানুষ গুলোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখা ওয়ান টাইম কাপ গুলোকে। হাহা হিহি, শাড়ি পাঞ্জাবী, সুগন্ধী, হাতের চুড়ি,কপালের টিপ, সেলফি, ন্যাকা কপট সংলাপ আমার ভালো লাগছে না। কিছু ঢেঁকি-মানুষ ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে একটানা ধান ভেঙে চলে, নানান হিসেবি, বৈষয়িক আলাপে। কার লেখা বই মুড়ি মুড়কির মতো বিক্রি হয়, কাদের আলাপে রমরমা সব কিছু, কোন টা বাজারে বেস্ট সেলার ,এইসব ধান ভাঙ্গানি আলাপ শেষে ঢেঁকি রা মেলা ছাড়ে, কিংবা আমি সরে আসি । আমার তখন নিঃশ্বাস নিতে ভালো লাগে।

মাঝে মাঝে হঠাৎ করে আমার কিছু মানুষের কথা মনে হয়, তারপর আরো অনেক কিছু মনে হয়।

এই যেমন স্কুলের প্রীতিকণা ম্যাডাম। আমাকে ছোট বেলায় নাম দিয়েছিল “ভাবুক”, আমি ক্লাসে টিচার পড়ানোর সময় কি জানি ভাবতাম আপন মনে, সেই ম্যাডাম আজ আর নেই। কোন কারণ ছাড়াই মনে পড়ে গৌতম চাচ্চুর কথা। গৌতম ব্রহ্ম, বাইক দুর্ঘটনায় তার যদি মৃত্যু না হতো, তবে আজ যারা আমার বই নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, তিনিও কি থাকতেন না সেই দলে?

মনে পড়ে ময়মনসিংহে আমাদের বাসার পেছনে থাকতো রুকিয়া আপারা। আমি প্রায় দুপুরে সেখানে যেতাম, ভাতের মাড় খেতাম লবণ দিয়ে, তাদের চকির উপর বিছানো পাতলা একটা তোষকে, তেল চিটচিটে বালিশে, বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢোকা রোদের আলো আঁধার ম্যাটিনি শো দেখতে দেখতে আমি ঘুমিয়ে যেতাম। কি নিশ্চিন্ত ছিল আমার জীবন। সেই রুকিয়া আপা, বহুদিন আগে ফোন করেছিল মরিশাস থেকে, সে কাজ করে ওখানে, আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, তুমার লাইজ্ঞা আমার প্যাট কিন্তু পুড়ে, আমি তুমারে মায়া করি। আমিও বলতে চেয়েছিলাম, রুকিয়া আপা, আমিও তোমাকে মায়া করি। আমি বলতে পারিনি।

মাঝে মাঝে ত্রিশিলার কথা মনে পড়ে। ত্রিশিলাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার অনেক প্ল্যানিং করেছি, কিন্তু কখনোই যাওয়া হয় নি। ত্রিশিলা আমার বই কিনতে এসেছিল, বই কেমন লেগেছে সেটা তাকে জানাতে বলেছিলাম, সে জানিয়েছে। আমি কোনদিন রাঙ্গামাটি যাই নি। এখন রাঙ্গামাটি গিয়ে বেড়াতে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে আমার লজ্জা লাগে। আমার লজ্জা লাগে ত্রিশিলা চাকমার সামনে দাঁড়াতে। যে ত্রিশিলা চাকমা প্রতি বই মেলায়, এই যে এই অমর একুশে বই মেলা, বাংলার বাঙালির প্রাণের বইমেলায় বই কিনতে আসে, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে আমার লজ্জা লাগে।

লজ্জা লাগে কারণ, এই বাঙালিয়ানার একটা অংশ অস্বীকার করে যে, আমাদের দেশে আদিবাসী রাও আছে। তারা দশকের পর দশক ধরে সমতা, স্বীকৃতি আর অধিকারের দাবী নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। আদিবাসীদেরকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সেই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের একটা অংশ হচ্ছে, আদিবাসী নারী দের উপর যৌন সহিংসতা চালানো। ভূমি ছাড়া আদিবাসীদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও নিজস্ব জীবনপ্রণালী বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু দিনের পর দিন, তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে চলেছে।

হামলা করা হয়েছে চাকমা রাণী ইয়ান ইয়ান এর উপর। আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার তো নেই ই বরংচ , নানান ভাবে বৈষম্য, নিপীড়ন আর অরাজক সেনা শাসনের আওতায় থেকে তাদের কে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। নাহ ভুল বললাম, জীবন তারা যাপন করছে না, তারা শুধু টিকে আছে। তাদের রাষ্ট্র রেখেছে, সাফ গেইমস এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ডিসপ্লে করার জন্য। ছোট বাচ্চারা অতিথি আসলে যেমন তার নানান খেলনা বের করে করে দেখায়, ওই রকম আর কি।

আমার মনটা খারাপ লাগে, ইচ্ছে করে সেগুনবাগিচার বারো তলা বিল্ডিং থেকে আমার প্রেমের গল্প গুলো কে ধাক্কা মেরে ফেলে দেই। নিজেকে খুব খুব ক্ষুদ্র মনে হয়। মনে হয়, এই ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে, লেখালেখি করতে পারা ছাড়া আর কিছুই তো পারি না। ব্যার্থ জীবনের গ্লানি নিয়ে আরো কিছু বিষাদ গিলে খাই। আমার মনের নীল বিষাদ বলে ওঠে-
​​
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—

আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে

ক্লান্ত—ক্লান্ত করে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 269
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    269
    Shares

লেখাটি ১,৯৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.