রাণী য়েন য়েন যেভাবে বাঁচলেন

উইমেন চ্যাপ্টার:

“জুম পাহাড় এমনই এক রাণী চেয়েছিল যে শুধু রাণী হবে না, মা হবে। পাহাড়ের বৃক্ষ লতাগুল্ম, নদী, ঝরণা, জলস্রোত, জলা জঙ্গল, প্রাণবৈচিত্র এমনই এক মাকে চেয়েছিল যে সবাইকে পরম মমতায় বুকে আগলে রাখবে। প্রজাদের সকল দুঃখ দুর্দশাকে নিজের করে নেবে। দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবে মাতৃসুলভ মমতায়।

পাহাড় সেই মা’কে খুঁজে পেয়েছে। তার বীরত্ব, অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া তার কন্ঠ, প্রজাদের কাতারে নেমে এসে বুটের নীচে পিষ্ট হতে পারার দুঃসাহস দেখে বিস্মিত হতে হয়। জুম পাহাড়ের প্রতি এমন বিশ্বস্ত গভীর ভালবাসায় শতবর্ষ বেঁচে থাকুক, প্রিয় রাণীমাতা য়েন য়েন”। চাকমা সার্কেলের রাণীমা য়েন য়েন সম্পর্কে এমনই মন্তব্য করেছেন বন্ধুবর কুঙ্গ থাঙ।

সেই রানী মা ও তার সমমনারা গত প্রায় এক মাস ধরে রাঙামাটির বিলাইছড়িতে দুই মারমা কিশোরীকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তাদের আন্দোলনের মুখে মারমা মেয়ে দুটি এখনও অপসৃত হয়ে যেতে পারেনি। এখনও জানে বেঁচে আছে। কিন্তু সেই মেয়ে দুটিকে নিয়ে নোংরা খেলা চলছে। আর যারা আন্দোলন করছেন মেয়ে দুটিকে মুক্তির দাবিতে, তাদের ওপরও হামলা চলছে।

আন্দোলনরত চাকমা সার্কেলের উপদেষ্টা রাণী য়েন য়েনের ওপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শারীরিক হামলা চালানো হয়।
ওইদিনের হামলার ঘটনায় চাকমা চিফ রাজা দেবাশিষ রাষ এবং রাণী য়েন য়েন একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। নিচে তা হুবহু তুলে ধরা হলো:

রাজবাড়ি, রাঙ্গামাটি
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

গত বৃহস্পতিবার ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আনুমানিক ৭-৮ টার দিকে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায়ের সহধর্মিণী রাণী য়েন য়েন শারীরিকভাবে হামলার শিকার হন যখন তিনি বিগত ২২ জানুয়ারি তারিখে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া মারমা সম্প্রদায়ের দুইটি মেয়ের সাথে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন। নিচে রাণী য়েন য়েন ও তাঁর সাথে হামলায় আক্রান্ত একজন ভলান্টিয়ারের বর্ণনা অনুসারে লেখা হলো।

১৫ তারিখে দুপুর ১২টার দিকে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ ও প্রায় ১০ জন সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি ভিক্টিম মেয়েদের পিতা-মাতাকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়ে আসে যেখানে ভিক্টিমদের গত ২৪ জানুয়ারি থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছিল। পুলিশ হাইকোর্ট থেকে একটি অর্ডার নিয়ে আসে এবং ভিক্টিমদের পিতা-মাতাকে তাদের মেয়েদের নিয়ে যেতে বলে। ভিক্টিম দুইজনই তাদের মা-বাবার সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশ বারবার মা-বাবাকে তাদের মেয়েদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিল।

এক পর্যায়ে পুলিশ কর্তৃক প্রণোদিত হয়ে বাবা ভিক্টিমের একজনকে এবং মা অন্যজনকে চড় মারে। রাণী ও অন্য ভলান্টিয়াররা এতে হস্তক্ষেপ করে। সহকারি পুলিশ সুপার সিদ্দিকী ভিক্টিমদের ওয়ার্ডের বাইরে সরিয়ে নিতে নারী পুলিশদের আদেশ দেয়। রাণী ও ভলান্টিয়াররা এই বলে হস্তক্ষেপ করে যে, বাবা-মার হেফাজতে রাখার আদেশ কোর্ট দিলেও মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের জোর করে সরিয়ে নেয়ার আদেশ দেয়নি এবং সর্বোপরি ভিক্টিমদের হাসপাতাল থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়ে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

ভিক্টিমরা যখন তাদের আইনজীবীদের সাথে দেখা করতে চায়, যারা পুলিশ ও সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি দ্বারা হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল; শুরুতে ভিক্টিমদের এই দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। রাণী ও ভলান্টিয়ারদের হস্তক্ষেপে ভিক্টিমদের আইনজীবীদের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে দেয়া হয় কিন্তু তা ছিল শুধুমাত্র ১০ মিনিটের জন্য।

বারবার রাণী ও ভলান্টিয়ারদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে, তারা এতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় ৪টার সময় সকল ভলান্টিয়ারদের ওয়ার্ড ত্যাগ করতে বলা হয়। তবে একজন ভলান্টিয়ার (২১ বছর বয়সী) রাণীর সঙ্গ ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সে ঘটনার সর্বশেষ পর্যন্ত রাণীর সাথে ছিল। ৬টার দিকে, পুলিশ ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে দেয়। রাণী ও অন্য মেয়ে ভলান্টিয়ারটি দোতলার জানালা দিয়ে দেখতে পান যে আর্মির সৈনিকরা ও সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিরা হাসপাতালের দুইদিকের প্রবেশদ্বারের সামনের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে তাড়িয়ে দিচ্ছে।

দিকে নিচতলা ও দোতলার করিডোরের ও সাধারণ মানুষের বসার জায়গার বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হয়।
৭.৩০টার দিকে সাদা পোশাকে মাস্ক ও কাপড় প্যাঁচানো ৮-১০ জন নারী এবং মুখে মাস্ক পরিহিত ৬ জন পুরুষ যারা নারীদের দলটিকে আদেশ দিচ্ছিল, রুমে প্রবেশ করে এবং ভিক্টিম, তাদের বাবা-মা ও ১০ বছর বয়সী ছোট ভাইয়ের সামনে রাণী ও মেয়ে ভলান্টিয়ারকে আক্রমণ করে। ধস্তাধস্তির সময় কয়েকজনের মুখের মাস্ক খুলে পড়ে, কিন্তু তাদের সে বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

তারা রাণী য়েন য়েন ও মেয়ে ভলান্টিয়ারকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারে, তাদের মাটিতে ফেলে আরো উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। মেয়ে ভলান্টিয়ারকে শুধুমাত্র পেটানোই হয়নি, তাকে পুরুষরা যৌন হয়রানি করে যখন নারীরা তাকে ধরে রেখেছিল এবং নিচতলায় টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রাণী ও মেয়ে ভলান্টিয়ারকে করিডোর ও পরে নিচতলায় টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। নিচতলায় সাদা পোশাক পরিহিত ৬ জনের একটি দল তাদের সাথে যোগ দেয়।

রাণী ও মেয়ে ভলান্টিয়ারকে নিচতলায় টেনে নিয়ে যাওয়ার পর আক্রমণকারী দলটি দুই ভাগ হয়ে যায়। একটি দল রাণীকে পিছনের দরজার দিকে ও অন্যটি মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে সামনের গেইটের করিডোর দিকে নিয়ে যায়।
যখন রাণীকে মারা হচ্ছিল এবং পিছনের দরজার করিডোরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন রাণী আক্রমণকারীদের কথা শুনতে পান, ‘শেষ করতে হলে এখানে করা যাবে না, করলে হাসপাতালের বাইরে করতে হবে।‘ .
মাথার বাম পাশে একটি ঘুষি মেরে রাণীকে হাসপাতালের বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়, সম্ভবত এটি ছিল তাঁকে অচৈতন্য করার একটি প্রচেষ্টা।

তিনি বাইরে আরো সাদা পোশাকধারী দেখতে পান। যা হোক এটি ছিল আলোকিত একটি প্রাঙ্গন এবং হাসপাতাল আঙিনার মধ্যে বিভিন্ন বিল্ডিং এর সামনে লোকজন জড়ো হয়েছিল, তারা রাণী ও সাদা পোশাক পরিহিতদের দেখতে পাচ্ছিল যারা রাণীর উপর নজর রাখছিল। রাণী এই সুযোগটা কাজে লাগালেন এবং কাছের সীমানা প্রাচীরের দিকে দৌড়ে গিয়ে এটি টপকে যান। অন্ধকারের মধ্যে প্রায় ১০-১৫ মিনিট দৌড়ানোর পর তিনি নিজেকে কাপ্তাই লেকের পাড়ে আবিষ্কার করেন। সে পানিতে তিনি মগ্ন অবস্থায় লুকিয়ে থাকেন এবং প্রায় আধা ঘন্টার মতো সেখানে ছিলেন।

পরবর্তীতে, তিনি কাছাকাছি একটি বাড়িতে যেতে সমর্থ হন এবং আশ্রয় ও সাহায্য খুজেঁন। ওই পরিবারটি রাণীর স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে, তাঁর স্বজনরা সেখানে চলে আসে ও রাণীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
একই সময়ে মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে হাসপাতালের সামনের গেইটে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে একটি সিলভার কালারের ভ্যান জীপগুলোর (SUVs) সাথে দাঁড় করানো ছিল। আক্রমণকারীরা তাকে নিচতলার মেঝেতে ফেলে রাখে, মাঝেমাঝে মারধর করছিল যখন অন্যরা উপরতলা থেকে ভিক্টিম ও তাদের মা-বাবাকে নিয়ে এসে ভ্যানে তুলে দিচ্ছিল। ভিক্টিমদের ভ্যানে তোলার সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগে মেয়ে ভলান্টিয়ারটি উপরতলায় দৌড়ে যায় এবং ওয়ার্ডের স্টোর রুমে লুকিয়ে পড়ে।

সেখান হতে সে চাকমা চিফ রাজা দেবাশীষ রায় সহ অন্যদের ফোন করে কী ঘটনা ঘটেছিল তা জানায় এবং এও জানায় যে, রাণী কোথায় আছেন সে জানে না, যখন রাণীকে টেনে হিঁচড়ে হাসপাতালের পেছনের দরজার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সর্বশেষ দেখতে পায়। সেসময় চাকমা চীফ যিনি হাই কোর্ট ডিভিশনের একজন আইনজীবী এবং তিনি এই বিষয়টি নিয়ে মহামান্য হাই কোর্ট ডিভিশন এবং মহামান্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজকে জানানোর পর তিনি ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রামে ফিরছিলেন।

রাজা দেবাশীষ রায় রাণী য়েন য়েন
চাকমা রাজা চাকমা সার্কেল উপদেষ্টা
রাঙ্গামাটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, তারিখঃ ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

শেয়ার করুন:
  • 3.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.