পিরিয়ডে ওদের বিনামূল্যে প্যাড দেওয়া হোক!

শেখ তাসলিমা মুন:

একটি বিষয় আমাদের জানা নেই, গ্রামগঞ্জ ও সুবিধাবঞ্চিত আরবান মেয়েদের পিরিয়ডের দিনগুলো কিভাবে কাটে? ওদের নানান রকমের অভাব। ভাত-কাপড়-প্রসাধন কিন্তু তাদের পিরিয়ড কোনো গণনার বিষয় সেটি কেউ মনে করে না। এটি যে তাদের স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সেটি কতো অবহেলিত সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা পর্যন্ত নেই।

মেয়েদের মাসের এ সপ্তাহটি তো রীতিমতো অভিশপ্ত একটি সপ্তাহ। পারলে মেয়েরা এ কটা দিন মাটির নিচে বাস করে। পৃথিবীর কাকপক্ষীও যেন না জানে তাদের মাসের এ কটা দিন। সারা বিশ্বের মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে নিয়ে বেড়ানোর জন্য সৃষ্টি হয়েছে এ কটা দিন।

এ সপ্তাহটি যে স্পেশ্যাল যত্ন পাওয়ার একটি সপ্তাহ, সেটি পরিবারের মানুষই কতটা গুরুত্বের সাথে দেখে? এমন কি মধ্যবিত্ত পরিবারে কিভাবে কাটে মেয়েদের এ কটা দিন? সবকিছু গোপন করে যাওয়ার শিক্ষায় পারদর্শী মেয়েরা তাদের জীবনটিই গোপন করে যাওয়ার শিক্ষায় দক্ষ। এটিও গোপন করে যাওয়ার সুনিপূণ ‘শিক্ষা’ হয়ে ‘মর্যাদাশীল’ হয়ে থেকে যায় পরিবারে।

একটি মেয়ে ঋতুমতী হলে তাকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এ কটা দিন চলতে হবে সে শিক্ষা কজন মেয়ে পায়? কজন মেয়ে জানে কীভাবে নিজেকে শুষ্ক রাখতে হবে, এবং তার প্রক্রিয়া? কতোটা উপকরণ তার কাছে থাকে? নিষিদ্ধ এ কটি দিনের জন্য বাড়ির পুরনো কাপড় ছিঁড়ে ‘ন্যাকড়া’ ব্যবহারের পদ্ধতি শিখিয়ে দেয় বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো আত্মীয়। কখনও মা কখনও দাদী বা ফুপু। কয়বার চেঞ্জ করতে হবে সে বিষয়েও নেই কোনো স্বাস্থ্যসম্মত নির্দেশনা।

অপর্যাপ্ত ‘ছেঁড়া কাপড়ের’ ভেতর তাকে এ দিনগুলোর কাজ সারতে হয় তাকে। যে কাপড়গুলো ব্যবহার করে সেগুলোই পরিষ্কার করে শুকিয়ে রাখতে হবে পরের বেলার জন্য। সেগুলো পরিষ্কার করা এক ভয়ঙ্কর গোপন কাজ। পুকুরে ধোওয়া যাবে না। অশুচি নাপাক হবে পানি। ওজু হবে না। কলপাড়ে ধোয়া চলবে না, সেখানে ঘরের শুচিসম্মত কাজ চলে। পানি তুলতে হয়। থালাবাসন হাঁড়িকুড়ি ধুতে হয়। অন্য কাপড় ধোয়ার সময় এগুলো মিশিয়ে ফেলা চলবে না। খুব গোপনে বাথরুমের অস্বাস্থ্যকর মেঝেতে স্বল্প পানিতে দ্রুত ধুয়ে গোপন কোন জায়গায় মেলে দিতে হবে। চোখে রেখে শুকিয়ে নিয়ে গোপনে ভাঁজ করে রাখতে হবে। কাপড়ে রক্তের দাগগুলো বসে যায়। সেগুলো থেকে যায়। জমাট রক্তের সাথে স্লাইম পদার্থগুলো পরিষ্কার হয় না। কাপড়ে থেকে যায়। সেগুলো ভালো করে শুকায়ও না। আধা শুকানো কাপড়ের টুকরোগুলো তাকে আবারও ব্যবহার করতে হয়। ব্যবহারের প্রণালীও সহজ নয়। কোমরে একটি দড়ি বেঁধে কাপড়গুলো দুদিক থেকে বেঁধে রাখতে হয়। মুহূর্তে সেটি ভিজে ওঠে। ন্যাকড়া কাপড়গুলোর ধারণ ক্ষমতা কম। পরনের পেটিকোট শাড়ী উপচে বেরিয়ে আসে। সালোয়ার-কামিজ ভেদ করে উঠে আসে। কতবার চেঞ্জ করার সামর্থ্য এ মেয়েদের আছে? ঐ অবস্থায়ই তাকে থাকতে হয়। পুরোপুরি শুষ্কতা একটি মুহূর্তও তাকে দেয় না।

বর্ষাকাল তো মহামারী হয়ে আসে। নাই পর্যাপ্ত ‘ছেঁড়া কাপড়’। নাই রোদ, যাতে শুকাবে তার ছেঁড়া কাপড়ের প্যাড। প্রতিবার ব্যবহার করে ফেলে দেবে সে সামর্থ্য তাদের নেই। ব্যবহার করতে হয় নোংরা ময়লা ভেজা কাপড়। এভাবে কাটে তার সাতটি দিন। মাসের পর মাস। নিজের শরীরের এ অঞ্চলটি যে তার তাকে ভুলে যেতে হয়। স্যাঁতসেঁতে এ অবস্থার জন্য মেয়েদের নানান ধরনের অসুখের শিকার হতে হয়। ‘ফিমেল ডিজিজ’ নামক একটা বিষয়ে নারীর ‘মাসিক নামক অসুখ’ প্রকাশ করা হয়। কী কী অসুখ তার ভেতর গণ্য কেউ কোনো কৌতূহল দেখায় না। এটি একটি নিষিদ্ধ ও ট্যাবু ভারাক্রান্ত শব্দ।

দেশ-বিদেশ থেকে নারীর স্বাস্থ্যের অনেক প্রকল্প নেওয়া হলেও নারীর স্যানেটারি প্যাডে এখনও কোনো অধিকার জন্মেনি। অসুস্থ জরায়ু যে একটি রুগ্ন ভবিষ্যৎ সেটি এখনও গণনায় আসেনি। একটি সুস্থ জরায়ু একটি সুস্থ সন্তানের জন্য দরকারি। একটি সুস্থ সন্তানের জন্য একটি সুস্থ মা দরকার।

গ্রাম পর্যায়ে মেয়েদের বিনামূল্যে প্যাড বিতরণ করা খুব দরকার। স্কুলে বই বিতরণের সাথে, রেশনে চাল গম শিশুর দুধের সাথে কিশোরী মেয়ে থেকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য বিনামূল্যে প্যাড বিতরণ নিশ্চিত করা হোক।

আর সবার আগে শুরু হোক এটা নিয়ে কথা বলা। এটিকে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে তুলে আনা হোক! ছেলে-মেয়ে কিশোর-কিশোরী, প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত সকলের ভেতর এ বিষয়টি সহজ করে তোলা হোক।

শেয়ার করুন:
  • 145
  •  
  •  
  •  
  •  
    145
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.