ধর্ষকামী সমাজের আরেকটি নমুনা চলছে অনলাইনে

যেকোনো যুদ্ধে, যেকোনো কলহে-বিতণ্ডায় সবচেয়ে কুৎসিত দিক হলো আমাদের মতন ধর্ষকামী সমাজের নানা ধরনের ধর্ষণ। কেউ সত্যিকার অর্থেই ধর্ষণ করে শারীরিকভাবে, একেবারেই তা অসম্ভব হলে অনলাইনের যুগে এখন মৌখিকভাবে ধর্ষণ খুবই মামুলী হয়ে গেছে।

গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোন একটি বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থীরা একটি ঘটনার জের ধরে যেভাবে একজন নারী চিকিৎসককে হেনস্তা করছেন অনলাইনে, যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তাতে এটাকে কোনো সভ্য প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতেও রুচিতে বাদছে। আমরা নিজেদের কোথায় নামিয়ে এনেছি দু’একটা উদাহরণ দিলেই তা পরিস্কার হবে।

ঘটনাটি কী ঘটেছিল সেই রাতে – গত ১৪ তারিখ তার সাড়ে দশটার সময় আইন বিভাগের শিক্ষক এটিএম এনামুল জহির তার অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই একজন কর্তব্যরত ইন্টার্ন ডাক্তারের সাথে ধাক্কা খান।। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করলে উনি প্রথমে ননসেন্স বলেন। এরপর কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মেয়েটিকে অশালীন কিছু কথা বলে বসেন (ফাক ইউ ফাকিং গার্ল)। এতে সবাই উত্তেজিত হয়ে তাকে মারধোর শুরু করলে এক পর্যায়ে তাঁর পরিচয় পেয়ে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। এর জের ধরে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের সঠিক বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। অল্প কথায় এই হলো ঘটনা। কিন্তু আন্দোলন চলাকালে অনলাইনে যে ভাষায় আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাতে করে আন্দোলনের ভাবমূর্তিই এখন প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে সঠিক তদন্তই বা কীভাবে হবে, ন্যায়বিচারই বা কীভাবে হবে!

যতোদূর শুনেছি, মানে খবরেই পড়েছি যে, এই শিক্ষকের হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে যাওয়া বা এই ধরনের ভাষা ব্যবহার নতুন কিছু না। এখন মানছি, তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা এরকম ‘ফাকিং’ শব্দের সাথে পরিচিত, তাই বলে যেখানে-সেখানে বলে বসলে তো বিপদ থাকেই! আর সেটাই তো হয়েছে আদতে!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (একজন শিক্ষকের) গায়ে হাত তোলার মতো গুরুতর অপরাধ এসব ভাষার বদৌলতে তাই ৩০ ফিট নোংরামির নিচে চাপা পড়ে গেছে (অন্তত আমার চোখে)। ধরে নিলাম স্যার তাকে কিছুই বলেননি, মেয়েটা “নারী ক্ষমতায়নে”র “অপব্যবহার” করে স্যারকে অপবাদ দিচ্ছে। তাতেই কি মেয়েটাকে যতভাবে সম্ভব কুড়ে খাওয়ার অধিকার কেউ রাখে? “আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না” মানুষজনগুলো এখন কোথায়? এখন তারা নীরব কেনো? যেই স্যার ক্লাসে রেপ কেস পড়াতে যেয়ে কেঁদে ফেলেন, তার দেয়া শিক্ষাকে দেখি ভালোই সম্মান দেখাচ্ছেন আপনারা!

আমি জানি না কথিত সেই ‘বিখ্যাত’ স্যার “ফাক ইউ ফাকিং গার্ল” বলেছেন কি না। তিনি এমন বলতে পারেন কিনা, সেটা তার ছাত্রছাত্রীরা ভালো বুঝবেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে, অনেকে এই জায়গাটাও “ন্যায়সঙ্গত” প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন! সেটা করতে গিয়ে মেয়েটার পোশাক, গায়ের রঙ কিছুই বাদ দিচ্ছেন না এসব ন্যায়বান, ন্যায়কামী মানুষেরা।

একটি মেয়ে আরো কয়েক ডিগ্রী সরেস হয়ে বলে বসে থাকলেন যে, ওয়েস্টার্ন পোশাক পরে ওয়েস্টার্ন জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখলে ওয়েস্টার্ন গালি খাওয়াও হজম করতে পারতে হবে! আমার চোখে সবচেয়ে লজ্জার এটাই যে একটা মেয়ে একথা বললো আর দশজন তালি দিতে লাগলো।

ছিঃ! তারা আসলে কি মনে করেন পাশ্চাত্যে fuck you= love you = I complement you? তারা নিজেরা কি পশ্চিমা পোশাক পরেন না? সেই পোশাক পরেই কি পশ্চিমা গালি হজম করতে প্রস্তুত হয়ে যান? নাকি উনারা এটা বুঝেন না গালি হচ্ছে গালিই। নাকি গালি দেয়া এক বিশেষ মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায় এটা মানুষের অজানা? “তোকে চুদে দিবো” আর “ফাক ইউ” একই কথা। নাকি গালিও ইংরেজীতে দিলে গ্রহণযোগ্যতা বেশি পায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজে, রাষ্ট্রে তাঁর একটা ইমেজ আছে। মান আছে, মর্যাদা আছে। একটা অপরাধের বিচার চাইতে গিয়ে যে পরিমাণ নিচে আবেগী মানুষেরা নেমে গেলেন, এবং সেই অন্যায়গুলোর প্রতিবাদ যেই শিক্ষক করলেন না, তাতে শুধু গুণী মানুষের নামটাই খারাপ হলো।

পরশু রাত থেকে অনলাইনে ঘুরে বেড়ানো কিছু স্ক্রিনশট দিলাম। আমি লজ্জিত। শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা নিয়ে। আমি লজ্জিত তার দেয়া শিক্ষার এমন প্রয়োগ দেখে।

নিচে কয়েকটি স্ক্রিনশটের বিবরণ তুলে ধরা হলো:

“খুব আজব লাগে তোদের মত পতিতাদের দেখে। তোর নাহয় কোনো মান সম্মান নাই। খানকি মাগী পোসড় শেয়ার করছিস তো কমেন্ট অপশন বন্ধ করে রেখেছিস কেনো” – আরিফুল ইসলাম আরিফ

রাফসান জানি নামের একজন লিখেছে, “আফারে দেইখা আমারো ইভ টিজিং করবার মুন চায়”।

“ঐ হারামজাদী তোর চেহারায় প্রমাণ করে তুই কোন চরিত্রের মেয়ে। নইলে একজন বাপ বয়সী, স্বনামধন্য শিক্ষক সম্পর্কে এমন মিথ্যা ছড়াতে পারতিস না। তোকে যেনো আল্লাহ তা আলা কোনো অভাগা ছেলের কপালেও না লিখে” – সানতাজ আলী।

“যে না চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা। বানিয়ে বানিয়ে কথা বলার জন্য আল্লাহ যেনো অরে বান্দর বানিয়ে দেয়! অবশ্য বান্দর হতে গেলে তার বেশি বিবর্তনের দরকার হবে না..” – মোহাম্মদ নাঈম হোসেইন।

“ওই হিজড়া বেটি, স্ট্যাটাসটা পাবলিক কর একটু কমেন্টাই” – মেহেন্দী ফাইয়াজ

ইন্টার্নি ডাক্তার মেয়েটির ইনবক্স সয়লাব হয়ে গেছে গালিগালাজে। একটি নমুনা দিলাম: “ছোটোলোক তোর মায়ের কাছে একটি প্রশ্ন ছিলো, তোর বীর্যটা কার ছিলো” -তারিক লিটু।

এরকম হাজার হাজার মন্তব্য এখন ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে সায় দিচ্ছে আরও হাজারো মানুষ। আশ্চর্য লাগছে, খুবই আশ্চর্য। এর মধ্য দিয়ে যে মানসিকতার পরিচয় আপনারা দিলেন/দিচ্ছেন, এরপর যদি কেউ আপনাদের শিক্ষাকে, শিক্ষার উৎসকে প্রশ্ন করে বসে, তাহলে মনে হয় কিছু আর বলার থাকবে না।

শেয়ার করুন:
  • 359
  •  
  •  
  •  
  •  
    359
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.