আয়ের পুরোটা কাউকে নয়

শিল্পী জলি:

ভাইয়ের মেয়ে টিউশনি করে চার হাজার টাকা আয় করেছে। পুরো টাকাই নাকি সে বাবা-মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে। সম্পর্কের এই মিষ্টতায় আপাতত সবাই খুশি। আমিও। তথাপি মন্তব্য করেছি, পুরোটা না দিয়ে অর্ধেকটা নিজের জন্যে রাখা কি উচিত ছিল না? এতে যে আত্মনির্ভরশীলতা এবং ম্যানেজমেন্ট পাওয়ারও বাড়ে। আবার পারস্পরিক সম্পর্কও শোষণহীন, সহজ, এবং মজবুত হয়।

যদিও আমি বড় হবার পর কোনদিনই আমার আয়ের পুরো টাকা মায়ের হাতে তুলে দেইনি, তথাপি আমি আমার আয় নিজের কাছে রাখতে পারতাম না। কেমন যেনো একটি বড় বোঝা মনে হতো। রাখতাম বোন বা ভাইয়ের কাছে যারা মূলতঃ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে। তবে ছোটবেলায় ঈদের সেলামীর টাকা মায়ের কাছে জমা রাখতাম। অতঃপর মনের শখ পূরণের প্রশ্ন এলেই গিয়ে বলতাম, মা ঐ যে সেদিন তোমার কাছে টাকা রেখেছিলাম সেই টাকাটা এখন দাও।
মা বলতেন, তোমার ঐ দুই টাকার এতো হিসেব! আমরা যে এতো খাওয়াই, পড়াই, দিন-রাত তোমাদের পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করি, কই তার তো কোনো হিসেব রাখি না!

ঐ কথার ঝড়ের বিশেষণে বিশেষিত হয়ে শখ পূরণের ইচ্ছে উবে যেতো তৎক্ষণাৎ। বিপদ বুঝে আর কথা বাড়াতাম না। বরং টাকা না নিয়েই চলে আসতাম। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিতাম, এতো যখন কথা, তখন তোমার কাছে যদি আর টাকা রাখি আমার নাম শিল্পী না! টাকা রাখতাম গিয়ে এটা-ওটা বা খাটের নিচে, একেবারে পায়ার তলায়। হারাতোও। পরবর্তীতে ভাইবোনের কাছে টাকা রাখা শুরু করি, যারা কথা বাড়ায় না, আবার চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে প্রস্তুত থাকতো! তথাপি, নিজের টাকা নিজের কাছে রাখতে শিখিনি সহজে। যদিও ছোটবেলায় অহরহ ভাব সম্প্রসারণ লিখেছি, ‘গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন, হলে প্রয়োজন!’

নিজের টাকা নিজের হাতে রেখে ম্যানেজ করতে পারাও একটি আর্ট। এই আর্টটি না শিখলে জীবনে অর্থকষ্ট থেকে যায়, আবার সমৃদ্ধিও আসে না সহজে। আর জীবন হতে চায় ভবঘুরে, সাধু-সন্ন্যাসীর। আয় করলেও পকেট থাকে খালি। এবার এক ভাইকে দেখলাম, সে টাকা রাখে কাজের লোকের কাছে, লাখ লাখ টাকা। মনে মনে হাসি আর ভাবি, শেষ বয়সে গিয়ে তোর কী হবে রে ভাই? আমেরিকায় এসে একবার সে নাকি তার ম্যানেজারের হাতে পাঁচ’শ ডলার দিয়ে বলেছিল, প্লিজ একটু ধরেন তো, আমি একটু গ্লাসে কোক ভরে নিয়ে আসি। কোক ভরে যখন ডলার ফেরত চাইলো, ম্যানেজার বললেন, কই তুমি তো কোনো ডলার আমার হাতে দাওনি! ঐ এক কথাতেই ভাইয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ডলার হারাবার শোকে নয়, একজন ম্যানেজার হয়ে সামান্য ক’টি ডলারের জন্যে কী করে এমন করতে পারলো, সেটিই ছিল প্রধান কারণ!

আমিও ক’দিন কাজের লোকের কাছে টাকা রেখে দেখেছি, এটা-ওটার দায়িত্ব দিয়েছি। ক’দিন যেতেই বিপদ টের পেলাম, সরাসরি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ! কাউকে কিছু দিতে গেলেই বলে, ওদের কী কম আছে যে দেবেন? এই করেছে, সেই করেছে….আর আপনার জন্যে কী করেছে তারা? আরও কত কথা! বুঝলাম, এতেও চাপ কম নেই।
তথাপি, নিজের টাকা নিজের কাছে রাখা অভ্যেস না থাকলে কী সহজে আয়ত্বে আসতে চায়?

যখন আমেরিকায় আসলাম, তখনও নিজের টাকা নিজের কাছে রাখতে শিখিনি। মনে হতো, জীবনের কাছে এসব সামান্য টাকা-পয়সা তুচ্ছ বস্তু, একেবারে হাতের ময়লা। নিজে কাজ করি আর নিজের আয়ের চেক জমা দেই অন্যের এ্যাকাউন্টে। একবার এলো এমন বিপদ যে তৎক্ষণাৎ বাসা থেকে বের না হলে জীবননাশের আশঙ্কাও অমূলক নয়। শুনে বান্ধবী বললো, শুধু সাবওয়ে ধরে আমার বাসায় চলে এসো, এখনই– বাঁকীটা পরে দেখা যাবে। সাবওয়ের ভাড়া চার ডলার, আর আমার কাছে আছে মাত্র তিন ডলার। আবার মনে পড়লো মুখস্ত করা ঐ ভাবসম্প্রসারণটি, গ্রন্হগত বিদ্যা আর পর হস্ত ধন…..নহে বিদ্যা, নহে ধন! বয়স কম থাকায় মনের জোর আর নিজের বাহু আর পদবলের ভরসায় ঐ যাত্রায় রক্ষা পেয়ে গেলাম! তবে, পরের চেকটি দিয়েই নিজের একটি এ্যাকাউন্ট খুলে নিয়েছি।

সাধারণত আমেরিকায় যার যার এ্যকাউন্ট তার তারই থাকে। তবে স্বামী-স্ত্রী বাঙালি, ইন্ডিয়ান, বা পাকিস্তানী হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কন্ট্রোল চলে যায় বরের হাতে। মানুষটি ভালো হলে এতে তেমন ক্ষতিবৃদ্ধিও নেই। তবে ভালো না হলে ইনকাম সওে্বও পরনির্ভরশীলতা চলে আসে জীবনে। স্বামী-স্ত্রীর জীবনেও সম্পর্কটির হিসেব-নিকেষ রাখা জরুরি। বিশেষ করে সম্পর্কটির ধরন বোঝা, যেনো উভয় পক্ষেরই জীবনে নিরাপওা নিশ্চিত থাকার সম্ভাবনা অনুভূত হয়।
আতিকের সাথে বিয়ে হতেই সে বললো, তার ইনকাম সে নিজেই রাখবে নইলে বউয়েরা জ্বালা দেয়। আবার আমিও আমার টাকাপয়সা নিজের এ্যকাউন্টে রাখতে পারবো, ইচ্ছেমত খরচও করতে পারবো।

এই দেশীয় ছেলেরা বউয়ের টাকা নেওয়ার চেয়ে বউয়ের বিলাসী জীবনের খরচ কম বহন করতে হলেই হয়তো খুশি থাকে। আমার অ্যাকাউন্টে তার প্রবেশাধিকার থাকলেও আমার আয়ে সে কখনও হস্তক্ষেপ করে না। এমনকি আমার যখন আয় ছিল না, সেই সময়টিতেও সে আমার মায়ের জন্যে বরাদ্দ বাজেটটির দায়িত্বটি বহন করেছে। সর্বোপরি, আতিকের সাথে থাকার কারণে পড়াটি শেষ করা সম্ভব হয়েছে। যেটা একটি দক্ষতা হিসেবে জুড়ে গিয়েছে জীবনের সাথে। যদিও আমাদের দু’জনার ভালো আয় থাকলেও তেমন জমা নেই, তথাপি, এই ক’বছর একসাথে থেকে দু’জনেই এখন একসাথে অথবা একা একাই সহজে জীবন চালিয়ে নেবার সামর্থ্য অর্জন করেছি (যদি স্বাস্হ্য ভালো থাকে)। আবার একই সাথে মজবুতও হয়েছি দু’জনই। আবার সম্পর্ক থেকে টাকা-পয়সাকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে না ফেললেও টাকা-পয়সাই মূল ভূমিকায় নেই এখন আর। আবার যতটা সময় একসাথে কেঁটেছে বাঁধাবিপত্তি থাকলেও পারস্পরিক অশ্রদ্ধা জন্মায়নি।

যাই হোক, জীবনের বাস্তবতা হলো একটি সময় এলে টাকাপয়সার সম্পর্কে বাবামায়ের সাথেও টান বাঁধে। যেমন দেখা যায়, বিয়ের পরে সন্তান বাবামায়ের হাতে পুরো টাকা দেয়া বন্ধ করলে গোল বাঁধে তেমনি এমনও শুনেছি, পেনশনের টাকা সন্তানের হাতে তুলে না দেয়ায় সন্তানকে আক্ষেপ করতে। আবার তুলে দিলেও শেষ বয়সে গিয়ে পরগাছার জীবন বয়ে বেড়াতে হয়, যখন না থাকে হাঁটার গতি, না থাকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার মতো পোক্ত শরীর। আর ঐ সময়টিতেই হয়তো দায়িত্ব আসে ভালোবেসে নাতি-নাতনিদেরকে মানুষ করে দেবার! ক’জন ভাবে আজ ঐ শরীরটি নিজের দায়িত্বই নিজে বইবার শক্তি হারিয়ে ফেলছে?

যে কোনো সম্পর্কের মাঝেই পরনির্ভরশীলতা এবং টাকাকে বুঝেশুনে প্রবেশাধিকার দেয়া জরুরি। নইলে হয়তো একটি মানবিক সম্পর্কের মাঝে সম্পর্কের চেয়ে টাকার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে ফলপ্রসূ সমাধান হলো, নিজের দায় নিজের হাতে, নিজের আয় নিজের মতে, এবং যোগ্যতাকে শানে রাখা। সেইসাথে প্রতিটি সম্পর্কের মাধূর্য বোঝা, এবং বাস্তবভিত্তিক দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখা।

অবশ্যই সম্পর্কের ভিত্ টাকা নয়, আবার এর প্রয়োজনীয়তাও কম নয়!
অতএব, পুরোটা কাউকে নয়!

শেয়ার করুন:
  • 347
  •  
  •  
  •  
  •  
    347
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.