সমান হইয়াও হইলো না সমান

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

রোমান্টিক হিরো হিসেবে জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেতা অপূর্ব এবং আয়নাবাজি সিনেমাখ্যাত অভিনেত্রী নাবিলা অভিনীত ভালবাসা দিবসের নাটক ‘সংসার’ দেখলাম, মন্দ লাগলো না… নাটকটিতে equality দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভালো লেগেছে যখন দেখানো হলো নতুন বিয়ে হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ঘরের দুটি ছেলে মেয়ে নিজেদের সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিলো, বিপদের সময় ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচিউরিটির সাথে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলো।

আরও ভালো লাগলো দিনশেষে দু’জন কাজ থেকে একইসাথে ফিরে আসার পর যেভাবে ছেলেটি মেয়েটিকে রান্নায় সাহায্য করলো… এটাই তো আদর্শ চিত্র… বাইরে কাজ যখন দুজনই করছে তখন বাড়ি ফিরে কিচেন শুধু মেয়েরা কেন সামালবে? বাস্তব ঘেঁষে বানানো এই নাটকটির তিনটি কথা বেশ পছন্দ হয়েছে।

1. মেয়েটি যখন ছেলেটিকে বললো, বিয়ের সময় মেয়েটির মা তাদের ঘর আসবাব পত্র দিয়ে সাজিয়ে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু ছেলেটি সেটা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজের জমানো টাকা দিয়ে ঘরের জিনিষ কিনেছে এই ব্যাপারটি মেয়েটির ভীষণ ভালো লেগেছে… (I wish সব ছেলেরা এই মানসিকতা পোষণ করতো, তাহলে সমাজের চিত্র অনেকখানি বদলে যেতো)

2. ছেলেটি যখন বললো তার উপার্জন ঘর চালানোর জন্য আর মেয়েটির আয়ের টাকা জমানোর জন্য এবং মেয়েটির নিজের শখের টুকিটাকি কেনার জন্যে, তখন মেয়েটির প্রতিবাদ করে বলা যে সংসার দুজনের তাই খরচও দুজন সমান করবে।

3. মাসের নির্দিষ্ট 7 দিন প্রাকৃতিক কারণে মেয়েদের মেজাজ একটু খিটখিটে থাকে এই ব্যাপারটির সাথে যেরকম ধৈর্যের সাথে ছেলেটি ডিল করলো সেটি।

এরকম বেশ মিষ্টি কিছু মুহূর্ত দর্শক হিসেবে উপহার পাওয়ার পর হঠাৎ একটি জায়গায় এসে মনক্ষুন্ন হতে হল… আর সেটি হল, টাকার সমস্যা হওয়ার পর মেয়েটি যখন তার মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সংসারে কাজে লাগালো আর ছেলেটি তার মা বাবাকে নিজের দুরবস্থার কথা কিছুই জানালো না, উল্টো ফোনে বললো সে হাতে একটু টাকা পেলেই তাদেরকে আবার পাঠানো শুরু করবে।

এই ব্যাপারটিতে আমার ব্যক্তিগতভাবে ভয়ঙ্কর আপত্তি আছে… বিপদের সময় বেশিরভাগ মেয়েই দেখা যায় নিজের বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনে অথচ ছেলেরা তাদের মা বাবাকে কিছু জানতেও দেয়না, সাহায্য চাওয়া তো দূরের কথা… এটা কি ঠিক? বাবা মা কি দুই পক্ষেই সমান নয়? একটি ছেলেকে পালতে মা বাবাদের যতো খরচ হয় মেয়ে পালতেও ততখানিই খরচ হয়…. তাহলে কেন শুধু ছেলেরাই ফেরত দিবে? আর মেয়েরা বিয়ের পরও চাইবে? মা বাবাদের দেয়ার সময় যদি ছেলে মেয়ে সমান হয় তাহলে চাওয়ার অধিকারও ছেলে মেয়ে সবার থাকা উচিত… মেয়ের বিপদ বা অপারগতার কথা যদি তার বাবা-মা বুঝতে পারেন, তাহলে ছেলের বাবা-মায়েরও বোঝা উচিত।

একটি বিবাহিত মেয়ে যদি ছোট হয়ে নিজের বাবা-মায়ের কাছে সাহায্য চাইতে পারে, তাহলে একটি ছেলেরও চাওয়া উচিত… বাবা-মায়ের স্নেহ তো নিখাদ হওয়ার কথা, তাহলে দূরদিনে কেন তারা ছেলের পাশে দাঁড়াবেন না? কেন এই শিক্ষা দেয়া হয় যে ছেলে সন্তান একটা সময়ের পরে মা বাবাকে শুধু দিবে কিন্তু চাইতে পারবে না… অপরদিকে মেয়েদের মা বাবাদের সারাজীবন মেয়েদের দিয়েই যেতে হবে?

এখন হয়তো অনেকে বলবেন সামান্য নাটক নিয়ে এতো তেনা-প্যাচানোর কী আছে? উত্তরটা খুব সোজা….আমরা এমন এক দেশের মানুষ যেখানে নাটক সিনেমা খুব সিরিয়াসলি নেয়া হয়, মানুষ এগুলা দেখে বেশ ভালোভাবেই প্রভাবিত হয়, যেহেতু আমাদের সমাজে অলরেডি ছেলের বাড়ি/মেয়ের বাড়ি এই বৈষম্যটা আছে তাই সেটাকে টিভির মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমে prominently ফুটিয়ে তোলা বা প্রমোট করা ঠিক নয় বলেই আমি মনে করি।

এসব দেখে কিছু লোকের ধারণা আরো বদ্ধমূল হবে আর তারা গালভরে গল্প করে বলবে আরে এটাই তো নিয়ম, মেয়ের বাবা-মা বিয়ের আগে ও পরে সারা জীবনই মেয়ের পাশে থাকবে, সে টাকা পয়সার সাহায্য করা হোক কি দামী উপহার দেয়া হোক, বিপদ থেকে উদ্ধার করা হোক কি নাতি-নাতনি পালা হোক সব কিছুই শুধু মেয়ের মা-বাবার দায়িত্ব… আর ছেলের মা-বাবারা নিশ্চিন্তে বসে দূর থেকে দোয়া করেই জীবন কাটিয়ে দিবেন… ছেলেপিলে বড় করে দিয়েছেন, এরপর আবার কিসের দায়িত্ব? এখন সব দায়িত্ব ছেলের… তাই ছেলেরা চরম দু:সময়েও নিজের মা বাবাকে কিছুই বলে না, বলবেও না, এটাই আমাদের বাস্তব চিত্র … এরকম ঘটনা আশেপাশে প্রচুর দেখেছি, এখনো দেখি… প্রতিবারই ভাবি কবে যে এই নিয়মটি পরিবর্তিত হবে… কবে যে আমরা ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবার মা-বাবাকে আমাদের জীবনে সমান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখতে পাবো!

ঠিক একারণেই নাটকটি যখন ইকুয়ালিটি দিয়ে শুরু হয়েছিলো, তখন আশা করেছিলাম পুরোটাই এমন সুন্দর হবে এবং আমাদের কিছু পুরোনো ও এক চোখা ধ্যান ধারণাগুলো ভেঙে একটি পরিবর্তনশীল সমাজের আদর্শ ছবি ফুটিয়ে তুলবেG সেটি হতে গিয়েও হলো না দেখেই এই লেখাটির অবতারণা।

Sara Bushra Dooty
Bedfordshire, United Kingdom

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ২,৮৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.