উপার্জনে আসে না স্বাধীনতা

0

ফারজানা নীলা:

বহুদিনের লালিত বিশ্বাস, যে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে সে নারী আসলেই স্বাধীন। নিজের আয়-উপার্জন আছে মানে তোমাকে অন্য কারও অত্যাচার-নির্যাতন পরাধীনতা-অবহেলা মেনে নিতে হবে না। চাইলেই তুমি প্রতিবাদ করতে পারো।

কিন্তু না, চারপাশ আমাকে আমার এই বিশ্বাস থেকে সরিয়ে দিয়েছে। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তার প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা আসে মনোবল আর সাহস থেকে। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানার মাধ্যমেই। এমন অনেক নারী আছে যাদের নিজস্ব অর্থের অভাব নেই। কিন্তু তবু অন্যায় সয়ে যায় মুখ বুঁজে। প্রতিষ্ঠিত, তবু স্বামীর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া, ঘর সংসারের প্রতি দায়সারা ভাব সয়ে যায় নীরবে। কেন? সন্তানের জন্য? আর যদি সন্তান না থাকে? সেখানেও এক তরফা সয়ে যাওয়া। কীসের লাগি?

আবেগের লাগি। নারী মাত্রই আবেগে টইটুম্বুর। প্রকৃতিগতভাবেই হয়তো নারীমাত্রই অতিরিক্ত ভালোবাসে। নারীমাত্রই মাত্রাতিরিক্ত ত্যাগ করে। নারী মাত্রই সহ্যের বাইরে গিয়ে সহ্য করে। প্রিয়জনের জন্য করতে করতে নিজের সব স্বপ্ন সুখ বিসর্জন দেয়।

এই যে নারীদের সয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, প্রিয় মানুষদের ভাল রাখার অফুরনত ইচ্ছে এসব কোথা থেকে আসে? সমাজ সংসার মাথায় ঢুকিয়ে দেয়? নাকি তাদের রক্তে এই ত্যাগের অণু জন্ম থেকে ঠেলাঠেলি করে? যে নারীর শিক্ষা আছে, উন্নত আয় আছে সে কী শুধু সমাজের দোহাই দিয়ে নীরবে একাকী কাঁদে অবহেলায় আর অপমানে জর্জরিত হলে? না , আমার মনে হয় না।

অবহেলা বঞ্চনা সয়ে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলাই অধিকাংশ নারীর জন্মগত দুর্বলতা। সুখে থাকার জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল হওয়া নারীর চরম দুর্বলতা এবং ভুল। তার যতো অর্জনই থাকুক না কেন, দিনশেষে প্রিয় মানুষটি যদি অবহেলায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাতেই যদি জীবনের ইতি টানতে ইচ্ছে করে তবে অবশ্যই সেই নারী মারাত্মকভাবে দুর্বল মনের অধিকারী। সেই নারীকে স্বাধীন বলা যায় না মোটেও। হোক না তার একটি ভালো আয় আছে। দিন শেষে সে সুখের জন্য অন্যের কাছে হাত পাতে ভিখিরির মত। নির্লজ্জের মত।

নিজেকে উৎসর্গ করে ভালবেসে যাওয়ার চিন্তাই নারীকে পরাধীন করে রাখে। এখন কেউ তেড়ে আসবেন না এটা মনে করে যে আমি নারীদের ভালবাসতে মানা করছি! ভালবাসাতে কোনো পাপ নেই, কোনো অন্যায় নেই। কিন্তু সেই ভালোবাসার সম্মান যদি শুধু এক পক্ষই রেখে যায় তবে স্বাভাবিক ভাবেই একজন কর্তা অন্যজন পরাধীন হয়ে যায়। এবং হাস্যকর হল এমন পরাধীন হতে কিন্তু কাউকে জোর করা হয় না। নারী স্বেচ্ছায় এমন নির্বাসন বেঁচে নেয়। সম্ভবত নারী ত্যাগ করতে ভালোবাসে। মহান হতে ভালোবাসে। এরা ভালোবাসার জন্য স্বাধীনতাকে পায়ে ঠেলে দেয়। ঠেলে যে দিচ্ছে সেটাও বুঝে না।

অর্থ নয়, সাহস আর শক্ত মনোবল নারীকে স্বাধীনতার স্বাদ দেয়। এক মেয়ে, যার ছিল না কোনো আয়, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির উপর যে ছিল সর্বাথক নির্ভরশীল, একরাতে স্বামী তাঁকে খাওয়ার খোঁটা দিলে সেই রাতেই সে বের হয়ে আসে শ্বশুরালয় থেকে। এই জীবনে দ্বিতীয়বার সে ফিরে যায়নি। কীসের জোরে মেয়েটি এমন করতে পারলো? আত্মবিশ্বাস আর নিজের প্রতি সম্মানের জোরে। সেই মেয়ে কি তার আপনজনদের ভালোবাসেনি? বেসেছে। তবে নিজের চেয়ে বেশি নয়।

আমাদের সমস্যা আমরা অন্যদের নিজের চেয়ে বেশি ভালোবেসে ফেলি। আর ভুলে যাই নিজের জন্যও বাঁচা যায়। নিজেকেও ভালোবসা যায়। অন্যদের থেকে যে সম্মান আর ভালোবাসা আশা করি, প্রথমে আগে নিজেকে সেটা দিতে হয়। তবেই বাঁচাটা বাঁচার মতো হয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ২,৬০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.