কেন জেন্ডার বিশ্বকোষ?

কেন জেন্ডার বিশ্বকোষ? ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে মধ্য-ইংরেজি (মিডল ইংলিশ) ‘জেনড্রে’ এবং লাতিন ‘জেনাস’ থেকে জেন্ডার পরিভাষাটি সৃষ্টি হয়। এর অর্থ ‘ধরন’ প্রকার’ ইত্যাদি। ফরাসী ভাষাতেও ‘জ্যঁর’ বলে একটি শব্দ আছে, যার মূল উৎস হচ্ছে গ্রিক জেন, অর্থ হচ্ছে সৃষ্টি করা। বাইবেলেও এরকম অর্থই পাওয়া যায়। অ্যারিস্টটলের মতে, গ্রিক দার্শনিক প্রোটাগোরাস নামপদের শ্রেণীকরণ করার জন্য পুরুষালি, মেয়েলি এবং ক্লিব এই তিনটি শব্দি ব্যবহার করে ব্যাকরণে জেন্ডার শব্দ ব্যবহারের সূত্রপাত করেন। চৌদ্দশ শতকেও জৈবিক পার্থক্য বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। গত শতকের মূলত মাঝামাঝি থেকে জেন্ডার শব্দটি নারী-পুরুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। এই ব্যবহার শুরু করেন মূলত নারীবাদীরাই। ফরাসি কথা সাহিত্যিক সিমোঁ দ্য বোভেয়ারের ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ (১৯৪৯) গ্রন্থে ‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং হয়ে উঠে’ এই শব্দগুচ্ছ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে জেন্ডার বিষয়টি ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। তবে তিনি নিজে কোনদিন লিঙ্গ বা জেন্ডার শব্দটি ব্যবহার করেননি। বোভেয়ার, যাকে নারীবাদের তাত্ত্বিক প্রবক্তা বলে মনে করা হয়, তিনিই প্রথম নারীর স্বাধীনতা যে কতটা সীমাবদ্ধ তা তুলে ধরেছিলেন এবং এ থেকে কিভাবে মুক্ত হওয়া যাবে তার দিকনির্দেশনা দেন। তিনি লিখেন, ‘জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক অথবা অর্থনৈতিক কারণে নারীত্বের সৃষ্টি হয়নি, নারী আসলে সামাজিকভাবে অন্য (আদার) বলে নির্মিত হয়েছে’। বোভেয়ারের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসারে নারী নিজের স্বাভাবিক প্রবণতা অনুসারে নিকৃষ্টভাবে বেড়ে ওঠেনি। পুরুষতন্ত্রই পুরুষের আধিপত্যবাদী মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। ‘ফলে মানবিকতা হলো পুরুষ, আর এই পুরুষই ব্যাখ্যা করে বলে যে, নারীর নিজের কোন সত্ত্বা নেই, নারী পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। পুরুষই বিষয় (সাবজেক্ট), সেই পরম (অ্যাবসোলিউট), নারী হলো অন্য’। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ নারীকে ভেবেছিলেন অর্ধেক মানবী ও অর্ধেক কল্পনা বলে, কেননা তাঁর বিবেচনায় নারী কেবল বিধাতার সৃষ্ট নয়, পুরুষের আপন অন্তর-নি:সৃত সৌন্দর্যে গড়া। সাহিত্য-শিল্পে নারী বন্দনার যেমন শেষ নেই, তেমনি সংসারে-সমাজে তার দুর্গতিরও কমতি নেই। কিন্তু এর মধ্যেই নারী মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, অধিকার আদায়ে সংগ্রাম-লড়াই করে যাচ্ছে। নারীর লক্ষ্য পুরুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার নয়, বরং সমাজে নিজের স্থান করে নেওয়া, আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠা করা, প্রাপ্য বুঝে নেওয়া। এই সংগ্রামের মর্ম যারা বুঝেছেন, তারাই জানেন যে, সমাজে নারী কেমন আসন লাভ করে, তা দিয়ে সভ্যতার স্তর বিচার করা যায়। আরেক কবি বলেছেন, নারীর পক্ষে দাঁড়ানো মানে পুরুষের নিজের পক্ষেই দাঁড়ানো, কেননা তারা একইসঙ্গে মাথা তুলে ওঠে, নয়তো ডুবে যায়। নারীর সংগ্রাম তাই আজ আর নারীর একার নয়, একটা সমতাভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামকে বুঝতে হলে, আয়ত্ত করতে হলে নারী সম্পর্কে জানা দরকার। নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক হচ্ছে জেন্ডার। শারীরিক পার্থক্য নিয়ে নারী ও পুরুষ জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতি যখন এই পার্থক্য এবং অন্যান্য নানা কারণে তাদের ওপর সামাজিক নানা অর্থ আরোপ করে পৃথক করে ফেলে, তখনি তা হয়ে ওঠে জেন্ডার। জেন্ডার তাই এক ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক নির্মাণ, শারীরিক পার্থক্য জৈবিক বলে দূর করা যায় না, কিন্তু সামাজিক নির্মাণ বলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্য সহজেই দূর করে জেন্ডারবান্ধব সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা যায়। বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচনা করলে জেন্ডার তাই প্রকৃতপক্ষে পুরুষালি, মেয়েলি ইত্যাদি শব্দ, ব্যক্তি, বৈশিষ্ট্য অথবা নানা অবস্তুগত পরিবেশ-পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে, যা মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ ছাড়া কিছুই নয়। এই অর্থে বাংলা ভাষায় ‘জেন্ডার’ একটি নতুন শব্দ। তাই ‘জেন্ডার বিশ্বকোষ’ বিষয়টিও ততোধিক নতুন। শুধু বাংলা ভাষায়ই নয়, অন্য কোনো ভাষাতেও এখন পর্যন্ত জেন্ডার বিশ্বকোষ প্রকাশিত হয়নি। নারীবাদ নিয়ে বিশ্বকোষ বা অভিধান থাকলেও এই জেন্ডার বিশ্বকোষে আন্তর্জাতিক বৃহত্তর পটভূমিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে অনুধারন করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে উপমহাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বা জেন্ডারের স্বরূপ বোঝার জন্যে এটি একটি অবশ্যপাঠ্য আকরগ্রন্থ। উপমহাদেশ ও বিশ্ব পর্যায়ে জেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য সমস্ত ভুক্তি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব ভুক্তির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ছয়শ। নারী-ভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারী-পুরুষের যেকোনো উদ্যোগ, তৎপরতাকে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি, জেন্ডার বিশ্বকোষ উইমেন চ্যাপ্টারের সেই প্রয়াসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। এখানে জেন্ডার বিশ্বকোষের লিংক দেওয়া হলো:

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.