মৃত্যুতেও নেভে না যে শিখা

0

মলি জেনান:

ধর্মীয় অনুশাসন ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার স্রোতবিরুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন এক নারী, তিনি আসমা জাহাঙ্গীর।

যেখানে অনার কিলিং এর নামে নারীদের ধর্মীয় ও পুরুষতান্ত্রিক কূপমণ্ডুকতার শিকার হবার খবর প্রায়শ:ই পাওয়া যায়, সেখানে আসমা জাহঙ্গীর এক দুর্বার দৃঢ়তার নাম। শত বাধা বিপত্তি, মৃত্যু ও দেশছাড়ার হুমকির মধ্যেও তিনি সত্য থেকে পিছপা হননি কখনো।

তিনি বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে সংঘটিত বর্বরতার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ক্ষমা চাওয়ানোর দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ঢাকায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলি আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পাকিস্তান এর পররাষ্ট্র দপ্তর “উদ্বেগ ও বেদনা” প্রকাশ করে বিবৃতি দিলে তিনি পাকিস্তান সরকারের এই ‘উতলা’ আচরণকে ‘দ্বৈতনীতি’ বলে কঠোর সমালোচনা করেন। দেশটির ইংরেজি দৈনিক ডন তাকে উদ্ধৃতি করে লেখে “সরকার এই বিবৃতির মাধ্যমে শুধু এটাই প্রমান করল যে, বাংলাদেশে যাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছে তারা আসলে ছিল রাজনৈতি চর, তারা কাজ করছিল পাকিস্তানের স্বার্থের জন্য।”

তিনি নিজের দেশের সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “ইসলাবাদের আচরণে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে নিজেদের নাগরিকের চেয়ে বাংলাদেশের বিরোধী দলের সদস্যদের জন্য তাদের ভালোবাসা অনেক বেশি।” এই সাহসী সত্য উচ্চারণের জন্য তাকে দেশত্যাগের ও হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে বারবার।

শুধুমাত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই নয় তিনি তার সারা জীবন সত্যের পক্ষে লড়েছেন। তিনি হুদুদ অধ্যাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলামিকরনের বিষয়ের অংশ হিসেবে জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল -হকের ব্লাসফেমি আইনের কড়া সমালোচক ছিলেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৮৩ সালে তিনি কারাবন্দী হোন। ২০০৭ সালে আইনজীাবিদের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং গৃহবন্দী হোন।

২৭ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে লাহোরে জন্মগ্রহণকারী আসমা জাহাঙ্গীর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি নেন। ১৯৮০ সালে লাহোর হাইকোর্টে এবং ১৯৮২ সালে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভূক্ত হন। পরে তিনি সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশন এর প্রথম নারী হিসেবে নিযুক্ত হোন। তিনি হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান এবং উইমেন’স অ্যাকশন ফোরাম প্রতিষ্ঠায় যৌথ অংশিদার
ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশনের সহ-সভাপতির পালন করেন।

মানুষের অধিকারের দাবিতে লড়াই করতে গিয়ে তিনি ইসলামের শত্রু, রাষ্ট্রদ্রোহী বলে বার বার বিবেচিত হয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি অভিযোগ আনা হয়েছে, বেশ অনেকবার তিনি ক্ষুব্ধ মানুষের রোষানলের শিকার হয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন শারীরিকভাবে। মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে কাজ করতে গিয়ে বার বার যেমন তার জীবন বিপন্ন হয়েছে, তেমন তিনি কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। এর মধ্যে লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড, ফ্রিডম পুরস্কার, হিলাল-ই-ইমতিয়াজ, সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া উইমেন ফর পিস পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ২০০৫ শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

বিশাল বর্ণাঢ্য এক সংগ্রামী জীবন পেরিয়ে তিনি গত ১১ ফেব্রুয়ারি রোববার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসন এ নারী যখন কোণঠাসা এক ভোগ্য পণ্য, যেখানে প্রতি পদে পদে নারীকে পেরুতে হয় নিকষ আধাঁর পথ পায়ে হেঁটে, রক্তাক্ত হয়ে, সেখানে আসমা জাহাঙ্গীর এক উজ্জ্বল দীপশিখা; মৃত্যুতে একটুও ম্লান হয় না যার আলো। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাতিঘর হয়ে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 204
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    204
    Shares

লেখাটি ৪৫৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.