রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা বিপ্লবের নাম আসমা জাহাঙ্গীর

সাদিয়া রহমান:

পাকিস্তানে আসমা জাহাংগীর শুধু একটা নাম না, বরং সামগ্রিক পরিবর্তন বা আন্দোলনের নাম। আসমা জাহাঙ্গীর এমন একটি পরিবর্তন, যা অকুতোভয়ের প্রতীক হয়ে নিজ দেশের মানচিত্র ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছেন সারা বিশ্বে।
মাত্র ৬৬ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে আন্দোলনের মাঠে থাকা সক্রিয় কর্মীরা, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার কর্মীরা মুষড়ে পড়লেও, পরিবর্তনের গতিকে সামান্যতম শ্লথ করতে পারেনি, বরং দিয়েছে নতুন মাত্রা। তাঁর শেষযাত্রায় শামিল হয়েছেন ট্রান্সজেন্ডার থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তিক নারীরাও, যাদের জীবনে ছায়া হয়ে ছিলেন তিনি।

আরও একটি পরিবর্তন চোখে পড়ার মতোন ঘটেছে মহতী এই নারীর মৃত্যুতে। হয়তো বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম এই ব্যক্তির জানাজাতেই সামনের সারিতে অংশ নিয়েছেন নারীরা, তাঁর অনুসারীরা। নারীরা কাঁধে করে বহন করে নিয়েছে প্রিয় নেত্রীর কফিন। পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এই মহীয়সী নারীকে।
মুসলিম সোসাইটিতে যা একেবারেই কল্পনারও অতীত। মৃত্যুতেও তাই তিনি অনন্য হয়েই রইলেন।

লাহোরে জন্ম নেয়া এই আন্দোলন খুব অল্প বয়সেই খুব কাছে থেকে রাজনীতি দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তার বাবা মালিক গুলাম জিলানীও ছিলেন একজন অকুতোভয় কন্ঠ। ১৯৭১ সালে যিনি পাকিস্তানী শাসকদের সমালোচনা করে কারাবরণ করেছিলেন। আসমা তখন নিতান্তই একজন ছাত্রী ছিলেন। কিন্তু সেই বয়স থেকেই তিনি বুঝে নেন তাঁর ভাষা , তাঁর কন্ঠ, তাঁর শব্দগুলো কখন, কীভাবে আর কাদের জন্য উচ্চারিত হবে।
ঐ বয়সে তিনি বাবার জন্য লড়াই করেন এবং একই সাথে নিজের পথটাও বুঝে নেন। অনেক পরে যখন তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন বাবার পথ অনুসরণ করেই কথা বলেছিলেন ১৯৭১ সালের শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

পাকিস্তানের মতো কট্টর মৌলবাদী একটা দেশে তিনি কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরব থাকেননি, নতজানু হোননি। দেশটিতে নারীদের অবস্থান কোথায় তা বিশ্বের সবাই কমবেশি ধারণা রাখে। কিন্তু বৈরী পরিবেশ কেবলই আসমার পথের প্রভাবক হয়েছে। তিনি মনে প্রাণে, আত্মায় এবং বিশ্বাসে ছিলেন একজন নারীবাদী। নারীবিদ্বেষী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলো তাঁর হুংকার। যাবতীয় আইন, নিয়ম যা নারীদের ছোট করে ,তিনি লড়ে গেছেন সেই সবের বিরুদ্ধে। তবে শুধু নারীরাই নয়, যাবতীয় শোষিত শ্রেণির মানুষের অধিকারের পক্ষেই ছিলো তাঁর লড়াই। আর সে লড়াই কতখানি খাঁটি, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই যে খানে সব ধর্মের এবং সব জাতের নারী পুরুষের অংশ গ্রহণ ছিলো ভেদাভেদহীনভাবে।

তিনি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের প্রথম নারী সভাপতি। তার হাত ধরেই পাকিস্তানে মানবাধিকার কমিশনের যাত্রা শুরু। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন আজন্ম।
মানবাধিকার কর্মী হামিদা হোসনের বক্তব্যে উঠে আসে কীভাবে আসমা পাকিস্তানের নারী বিষয়ক বিতর্কিত হাদুদ অর্ডিন্যান্সকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি জেল খেটেছেন, গৃহবন্দী থেকেছেন, রাস্তায় হেঁটেছেন, লাঠিপেটা হয়েছেন, ফতোয়া শুনেছেন, মৃত্যুর হুমকি পেয়েও অবিচলিত ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। বাপ- দাদার ভিটা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ঘোর বিপদ জেনেও।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি সামরিক শাসনকে বিশেষভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের হয়ে কথা বলেছেন। এবং সামরিক শাসক জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে কথা বলায় ১৯৮৩ সালে জেলে যান। ২০০৭ সালে তিনি আবারও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় গৃহবন্দী হোন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি অন্যায়, আইনি ফোকর, জুলুম, ধর্ম পালনের অধিকার, নারীর অধিকার এবং সর্বোপরি সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেলেন তিনি। শেষ দিন পর্যন্ত কর্তব্যরত ছিলেন ইরানের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে।

আসমা জাহাংগীর এমন একটি নাম যাকে, যার অবদানকে, যার কাজকে অস্বীকার করার সামর্থ্য হয়তৌ তার একনিষ্ঠ সমালোচকেরও নেই। এই জন্যই বিশ্ব এবং পাকিস্তানবাসী অবাক হয়ে এই নারীর বিদায়বেলায় মানুষের বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণ দেখে, দেখে আপামার মানুষের তাঁর প্রতি ভালবাসা।

সবচেয়ে উঁচু থেকে একদম সাধারণের সাধারণ, নারী ,পুরুষ, সমপ্রেমী সবাই এক হয়েছিলো তার বিদায় বেলায়। কেউ বা তাকে সরাসরি দেখেছে ,কারো কাছে আসমা জাহাঙ্গীরের উচ্চারিত একটা বাক্যই তার জীবনীশক্তি। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান সবাই এসেছিলো তাকে বিদায় জানাতে। তিনি ঠিক কতোটা করেছেন পাকিস্তানী নারীদের জন্য তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন ইসলামিক দেশের শত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও তার কফিন কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায় তারই অনুসারী নারীরা।

আসমা জাহাঙ্গীর একটি আন্দোলনের নাম, যা একটি নারীবিদ্বেষী সমাজ ব্যবস্থার ঠিক শিকড়ে আঘাত করে তাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু তা উপড়ে ফেলার। এমন প্রভাব যে মানুষ মানুষের মননে,একটা সমাজ ব্যবস্থায় ফেলতে পারে তার শক্তি দিয়ে অবশ্যই সমাজ ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো সম্ভব। যেদিন সাম্যের নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে সেইদিন হবে আসমা জাহাঙ্গীরের আসল সংবর্ধনা।

শেয়ার করুন:
  • 285
  •  
  •  
  •  
  •  
    285
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.