‘হিন্দু’ ভাড়া দেয়া হবে না

0

সুমন্দভাষিণী:

এইদেশে ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি পাওয়া মানুষজনের জন্য বাসা ভাড়া নিতে যাওয়া রীতিমতোন ঠাণ্ডা একধরনের লড়াই বলা চলে। কেমন যেন চোরের মতোন লাগে নিজের নামটা বাড়িওয়ালার কাছে প্রকাশ করতে, এই বুঝি মুখের ওপর ‘না’ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল! এটা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়, হরহামেশাই হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও নিশ্চয়ই জাতিগত ভেদাভেদ, বর্ণভেদ, ধর্মীয় ভেদাভেদ এরকমই চরমে। তবে সেটা ভিন্ন দেশ, আমার বিবেচ্য না। পৃথিবীর সবদেশে আমার প্রতিবাদ খাটবে না। যে দেশে আমার পূর্বপুরুষের জন্ম, যে দেশের জন্মের সাথে আমার পূর্বপুরুষের রক্ত রঞ্জিত হয়ে আছে, সেইদেশে এরকম ধর্মীয় শিষ্টাচারহীন সংস্কৃতি আমি মানতে বাধ্য নই। রাষ্ট্র যতোই তার ধর্ম নির্দ্দিষ্ট করুক না কেন, আমার উপস্থিতি, আমার প্রতিবাদ সবসময় জারি থাকবে এর বিরুদ্ধে।

এইমাত্রই চোখে পড়লো ফেসবুকের একটি পোস্ট। সুদেব বিশ্বাস নামের একজন লিখেছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। হুবহু তুলে ধরলাম –

“আজ সকালে নজরে এলো বাসা ভাড়ার এই বিজ্ঞাপনটি! লালমাটিয়া এলাকায়। একটু থমকে গেলাম।

“হিন্দু ভাড়া দেওয়া হবে না!”

না হয় নাই দিলে ভাই; তাই বলে এরকম নির্লজ্জের মতো বাসার সামনে লিখে ঝুলিয়ে রাখতে হবে?

2006 সালের কথা। তখনও বিয়ে করিনি। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ফ্যামিলি বাসা খুঁজছিলাম। আদাবর এলাকার একটি বাসা দেখে পছন্দ হলো। পাকাপাকি কথা হওয়ার পর অ্যাডভান্স দেওয়ার জন্যে পরদিন গিয়েছি আবার। ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার। শুনতে শুনতে জানা গেল উনার বাড়ি আমাদের কুষ্টিয়াতেই। বেশ খাতির জমে গেল অল্প সময়ের মধ্যেই।

পকেট থেকে টাকাও বের করেছি। হঠাৎ বললেন, ভাই আপনার নামটা তো জানা হলো না!

“সুদেব বিশ্বাস”!

নামটা শুনেই কেমন যেন হয়ে গেলেন। সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। উপরের দিকে তাকিয়ে। তারপর আমার দিকে ঘুরে চোখের দিকে না তাকিয়েই বললেন, না না! এটা হয় না! সরি, আমি আপনাকে ভাড়া দিতে পারব না! আগে বলবেন না, আপনি হিন্দু!

আমি বললাম, দেখুন, আমি কী করে জানব যে আপনি হিন্দু হলে ভাড়া দেবেন না?
উত্তরে বললেন, দেখেন, আমাকে ভুল বুঝবেন না। মানছি আমরা সবাই মানুষ! কিন্তু আমি মাত্রই হজ করে এসেছি! আর সৌদি আরবে ছিলামও অনেকদিন। আপনি অন্য একটা বাসা খুঁজে নেন।

আমি দাঁড়িয়ে পড়েছি। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বাসায় পূজা করবেন? মানে, শঙ্খ বাজাবেন?

মনে মনে বললাম, আমার বাসায় পূজা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবু নিজের সম্প্রদায়কে খাট করি কীভাবে? আর পূজা করব না, এমন মুচলেকা দিয়ে বাসা ভাড়াই বা কেন করতে হবে? উনাকে বললাম, দেখুন, আমি হিন্দু মানুষ! পূজা করব এটাই তো স্বাভাবিক।

এবার ভদ্রলোক একটু ছাড় দিয়ে বললেন, আপনি আমার দেশী মানুষ! যদি বাসায় পূজা না করেন আর শঙ্খ না বাজান, তাহলে দিতে পারি!

খুব অপমানিত বোধ করছি। একটু হাসতে হাসতে বললাম, দেখুন, আমি যদি বাড়িওয়ালা হতাম আর আপনাকে বলতাম, আমার বাসায় নামাজ পড়তে পারবেন না- সেটা কি কোনো ভালো কথা হতো?

আর কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম ভিন্নতর এই অভিজ্ঞতা নিয়ে।

এরপর থেকে যেখানেই বাসা ভাড়া করতে গিয়েছি আগেই জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, হিন্দু হলে ভাড়া দেবেন কি না। আমার প্রশ্ন শুনে প্রায় সবাই লজ্জা পেয়েছেন। তখন এই ভেবে ভীষণ ভালো লেগেছে যে, বেশিরভাগই ভালোর দলে। কিন্তু আজ আবার এই To Let দেখে খুব খারাপ লাগছে। জানি না, কেউ এর প্রতিবাদ করবেন কি না। ওখানে লেখা ফোন নম্বরগুলো সঙ্গত কারণেই ঢেকে দিলাম।”

সুদেব বিশ্বাসের লেখাটা পড়লাম, নিজের কমেন্টগুলোও পড়লাম। বলা বাহুল্য অধিকাংশ কমেন্টই ওই ‘হিন্দু’ সম্প্রদায়ের। এটাই নিয়ম বলে বিস্মিত হই না আর।

মনে পড়ে গেল, আমাদের প্রিয় আবৃত্তিকার ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় দাদা কলাবাগানে একটি বাসা ভাড়া নিতে গিয়েছিলেন। সেই বাসারই দোতলায় তখন কামাল লোহানী কাকা থাকেন সপরিবারে। মূলত তাদের মাধ্যমেই বাসাটি নিতে যাওয়া। তো, কথা মোটামুটি ফাইনাল হয়ে গেলে পর শর্মিলা দিদি (ভাস্বর দা’র স্ত্রী) দেখতে গেলেন বাসাটা। গোলমালটা সেখানেই লাগলো। বাড়িওয়ালা দিদিকে দেখেই বুঝে গেলেন ‘হিন্দু’, কাজেই বেঁকে বসলেন। তিনি কামাল কাকার ছেলে সাগর লোহানী ভাইকে তার আপত্তির কথা জানিয়ে দিতেই সাগর ভাই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা অনড়। শেষপর্যন্ত ভাস্বরদাও নিলেন না বাসাটা। একসময় সাগর ভাইরাও বাসাটা ছেড়ে দিলেন।

কলাবাগানেরই আরেকটি বাসায় আমি অ্যাডভান্স দিয়ে এসেছিলাম। বাড়িওয়ালি নিলেনও টাকাটা। আসার সময় বলেছিলাম, ‘বলতে ভুলে গেছিলাম যে, আমার জন্ম হিন্দু পরিবারে, আর আমি সিঙ্গেল মা, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকি। এ দুটোই আপনাদের আপত্তির কারণ হয় সাধারণত।’ আমার কথা শুনে উনি হতভম্ব এবং অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলেন মুহূর্তের জন্য। তখন কিছু বুঝতে দেননি, কিন্তু রাতে ফোন করে বলেছিলেন, তিনি স্যরি আছেন, তার বাসায় পূজা হবে, ধূপ জ্বলবে, উলুধ্বনি হবে, এটা তিনি মানতে পারবেন না। আমি যেন টাকাটা ফেরত নিয়ে আসি। পরদিন গিয়ে ফেরত নিয়ে এসেছিলাম টাকাটা, আর মুখের ওপর অনেকগুলো কথাও বলে এসেছিলাম। ছাড়বার পাত্রী তো আমি নই।

যদি খুব একটা ভুল না করি, তবে প্রথম আলোর স্পোর্টস এডিটর উৎপল শুভ্রের সাথেও একবার এরকমই কিছু একটা ঘটেছিল বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে।

আমি এখন যে বাসাটাতে থাকি, নয় বছর হয়ে গেল সেখানে। এতো লম্বা সময় ধরে থাকার কারণ একটাই, বাড়িওয়ালা কখনও এসব নিয়ে প্রশ্ন করেননি, তাছাড়া আমার আরেকটা প্রবলেম যেটা আছে যে, সিঙ্গেল মা হয়ে সন্তানসহ থাকি, সেটাও উনি বিবেচনায় আনেননি। এটা একটা বড় রিলিফ আমার জন্য, কলাবাগানেরই আরেকটি বাসায় থেকেছিলাম বছর দুয়েক। মালিক একদিন শুনিয়েছিলেন, ‘হিন্দু’ জানলে আর ‘একা’ জানলে কখনই নাকি ভাড়া দিতেন না আমাকে। তখন আমি বেশ কড়া কথা শুনিয়েছিলাম তাকে, এমন ভয়ও দেখিয়েছিলাম যে, উনার চাকরিস্থলে আমি বিচার দেবো এই কথার জন্য। উনি শেষপর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন আমার কাছে। তারপর বাসাটা ছেড়ে আসি আমি।

আসলে ভালোমন্দ মিলিয়েই সমাজ। এই যে এখন আছি, এখানে ১১টি ফ্যামিলির মধ্যে পাঁচটি ফ্যামিলিই জন্মগতভাবে হিন্দু। যদিও কেউ কোনো রিচুয়াল পালন করে না এখানে, করলেও কেউ আপত্তি করতো কীনা, সন্দেহ আছে।

ওপরে যে ঘটনাগুলোর কথা বললাম, এগুলো হচ্ছে জানা সত্য, সমাজের কিছু পরিচিত মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। কিন্তু এরকম হাজার হাজার গল্প আছে, যা আমরা জানি না, জানবোও না কখনও। যারা পরিচিত নন, তাদের তো ভয়েসও থাকে না উত্তর দেবার মতোন। কিন্তু সাহস করে উত্তরটা দিয়ে দিলে দ্বিতীয়বার ঠিক এইরকম আচরণ করতে গেলে কয়েকবার করে ভাববে।

মুখের ওপর কড়া কথাটা সময়মতো শুনিয়ে দিলেই হলো। নিজেদেরকে দুর্বল ভাবাটা মোটেও কাজের কাজ না। খোদ রাষ্ট্রই যেখানে তার একপ্রস্থ জনগণকে দুর্বল রাখার ব্যবস্থা পোক্ত করেছে, সেখানে নিজেদেরই ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।

আমি পাড়ার যে ফার্মেসি থেকে নিয়মিত ওষুধ কিনি, কালকের পর থেকে আর যাবো না ঠিক করেছি। উনি আমাকে কাল বলেছেন, ‘ফাল্গুনের উৎসব তো আমাদের নিজেদের না, অন্যদের’। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম অবসরে যাওয়া এই সরকারি চাকুরের মুখের দিকে, কতদিন, কত গল্প উনার সাথে করেছি গত কয়েক বছরে। সব ব্যর্থ হয়ে গেল এই এক কথাতেই।

তবে চারদিকে ‘অ-জ্ঞানী’ মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, সেই হারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাঙালী সংস্কৃতিতে আরও বেশি করে আত্মীকরণের সংখ্যাও। আবারও আসি আমার বাসা প্রসঙ্গে। এই বাসারই একটি ফ্ল্যাটে তিন ছেলে নিয়ে এক মা থাকেন। পুরো শীত জুড়ে ছেলেরা বন্ধুদের সাথে মিলে টাকা তুলে শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেছে। গতকাল হাজারও গোলাপ এনে সব ঠিকঠাক করেছে, আজ সকালেই বেরিয়ে গেছে রাস্তার রিকশাওয়ালা, সব্জিওয়ালা, ভিক্ষুক, গরীবদের ফুল দেয়ার জন্য। তাদের কথা হলো, ‘সবাই সবাইকে ফুল দেয়, এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে তো কেউ দেয় না’। মাকে দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করিয়ে প্যাকেটে করে খাবারও নিয়ে গেছে গরীবদের খাওয়াবে বলে।

এ শুনে আমার মনটাই ভালো হয়ে গেছে। হিন্দুদের বাসা ভাড়া দেয়া হয় না শীর্ষক পোস্টারটি মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছে নিমিষেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 595
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    595
    Shares

লেখাটি ২,২৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.