লাল গোলাপের আড়ালে রক্তাক্ত রাজপথ

লায়লা আঞ্জুমান ঊর্মি:

হে বালক- বালিকাগণ,
ভালোবাসার রং কী?
তোমরা বললে – ফাগুনের আগুন রাঙা পলাশের রং।
আমি জানলাম – রাজপথ রাঙানো টুকটুকে লাল রক্ত।
কে জানত সেদিন, বসন্তের আগুনরাঙা পলাশের রঙের সাথে মিশে যাবে তাজা প্রাণ গুলোর লাল টুকটুকে রক্ত?
কে জানত সেদিন, রক্তের স্রোত, বুট, টিয়ারশেল আর গুলির তীব্র ঝাঁজালো বারুদের গন্ধ এমনভাবে ভালোবেসে সবাইকে ঋণী করে যাবে?

সেদিন জাফর-জয়নাল-দিপালীদের দিয়ে ইতিহাস শুরু হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সহসা শেষ হয়ে যায়নি। একে একে আসতে থাকে সেলিম-দেলোয়ার-কাঞ্চনদের নাম। আসতে থাকে তিতাস-তাজুল-ময়েজউদ্দিন। কিংবা বসুনিয়া-শাহজাহান। এবং এরই ধারাবাহিকতায় একসময় নূর হোসেন। আমরা কীভাবে এদেরকে ভুলে ভালোবাসা নিয়ে ন্যাকামি করতে পারি?

পাকিস্তান পর্বে পূর্ববাংলার ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল একটি অবৈতনিক একই ধারার বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশের আপামর জনগণের উদ্দেশে ১১ দফা প্রণয়ন করেছিল। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই তাঁর শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই ইসলাম ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। শিক্ষানীতিতেও সে প্রতিফলন ঘটে। একই সঙ্গে শিক্ষার ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়। ছাত্ররা এ শিক্ষানীতির ব্যাপক বিরোধিতা করেন। ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিল করার পক্ষে ছাত্র সংগঠনগুলো একমত হয়।

১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণসাক্ষরতা অভিযান চলে। ছাত্র সংগ্রামের নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মজিদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ছাত্রদের এই সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেপ্তার করলে ছাত্ররা আরো ফুঁসে ওঠেন। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেয়।

মিছিলটি শুরু হয়েছিল কলাভবন থেকে। গন্তব্য তো সেখানেই- শিক্ষাভবন। মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল না করলে যে নিজেদের অস্তিত্ব লুটিয়ে পড়ে! অস্তিত্ব রক্ষায় প্রকম্পিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শহর, বাংলাদেশ। স্বৈরাচার এরশাদের গুলিবাহিনী ট্রাক তুলে দেয় মিছিলের ওপর। গুলি-টিয়ার শেল। গ্রেফতার। হাজার হাজার। ছাত্র। ছাত্রী। জনতা। কৃষক। শ্রমিক। চাকুরে। শিক্ষক। মানুষ। প্রতিবাদে পরদিন হরতাল। আবারো গুলিবাহিনীর সক্রিয়তা। শহীদ হোন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী আইয়ুব-কাঞ্চন। অনেকে বলেন, এই দুই দিনে শহীদ হোন ৫০ জনেরও বেশি। শোনা যায়, চট্টগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন ৪-৫ জন। তাঁদের লাশ নেই। এরশাদের গুলিবাহিনী গুম করে দিয়েছিল। এই উত্তাল কদিনে ক্যাম্পাসে রাজত্ব করতে চেয়েছিল বুটের শব্দ। কার্জন হল-কলাভবন-সায়েন্স অ্যানেক্স-মহসিন হল-জগন্নাথ হল-জহুরুল হক হল। প্রথমবারের মতো আক্রান্ত হয় বুয়েট ক্যাম্পাস। কোথায় ছিল না তারা? ফুলবাড়ির রাস্তা সেদিন খুব তাড়াতাড়ি শুষে নিয়েছিল গ্যালন গ্যালন রক্ত, যাতে বুটের ফণায় লোহিত কণাগুলো অপমানিত না হয়।

১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ – এই দিনটিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবগুলো ছাত্র সংগঠন প্রথম একসঙ্গে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। অনেকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম সংঘবদ্ধ উত্থানের দিন ছিল এই দিনটি।

দেশে যখন জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করেছিল তখন পাকিস্তানি শাসক শ্রেণী জাতির চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর আগ্রাসনসহ তারা চেয়েছিল আমাদের উপর বিজাতীয় ভাষা উর্দু চাপিয়ে দিতে। ঠিক তেমনিই পার্লামেন্টারি স্বৈরশাসকদের আমলে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’-এর চেতনাকে ধ্বংস করতে উদ্যত আজকের শাসক শ্রেণী।

সামরিক স্বৈরাচারের কয়েক বছর না যেতেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসাবে পালনের জন্য এ শ্রেণীর অন্যতম মুখপত্র যায়যায়দিন প্রচার শুরু করে। পাকিস্তানিরা ’৫২তে ব্যর্থ হলেও ক্যাবল আর স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে এবার সফল হয়েছে শাসক শ্রেণী। ‘আমি আর তুমি’র মত চরম স্বার্থপর, সমাজ-বিচ্ছিন্ন চেতনা যুব সমাজের মধ্যে চাপিয়ে দিতে পেরেছে। প্রেম-ভালোবাসার মত স্বাভাবিক সম্পর্ককে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে পরিণত করে আফিম নেশার মত বুঁদ করে ফেলেছে।

শাসক শ্রেণী এ থেকে লাভ তুলে নিচ্ছে দু’ভাবে; সমাজের সবচেয়ে প্রাণবন্ত লড়াকু অংশ যুব সমাজকে মুক্তির লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন ও নির্জীব করে ফেলে এবং দিনটিকে বাণিজ্যের মহোৎসবে পরিণত করে।

ভালোবাসার লাল গোলাপের নিচে কী চাপা পড়ে যাবে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদের রক্তে রাঙানো পিচঢালা রাজপথ?

কর্পোরেট সিল লাগা হলমার্কের সুসজ্জিত ভ্যালেন্টাইন কার্ডের আড়াল থেকে কি সেদিনের সাদাকালো স্লোগানের পোস্টারগুলো একটুও নাড়িয়ে দেবে না আমাদের অন্তরচক্ষু?

ভালোবাসা দিবসের আদিখ্যেতা উল্লাসের নিচে কি চাপা পড়ে যাবে শহীদের আর্তনাদ?

ভালোবাসতে কোনোই সমস্যা নেই, কিন্তু এই দিনটার আসল তাৎপর্য কোথায় সেটা হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতিতে, উপেক্ষায়, অনাগ্রহে, অবহেলায়।

ভালোবাসো বালক-বালিকাগণ, ভালোবাসা দিবস পালন করো, লাল গোলাপ বিনিময় করো আমার আক্ষেপ নেই কিছু; তবুও সেই সাথে, জাফর-জয়নাল-দীপালী সাহাদের ভালোবেসে স্মরণ করুক সকলে, সেটাই চাওয়া।

শেয়ার করুন:
  • 289
  •  
  •  
  •  
  •  
    289
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.