গ্লাসটা ইরেশ যাকেরের হাতে থাকলেই ঘটনাটা অন্যরকম হতো

0

কামরুন নাহার রুমা:

মীম রশিদ আর ইরেশ যাকেরের গায়ে হলুদের একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে কদিন আগে। আমি যদি ভুল না দেখে থাকি তাহলে মীমের এক হাতে একটা পানীয়ের গ্লাস, আর অন্যহাতে একটা সিগারেট ধরা আছে এবং সে বসে আছে ইরেশের কোলে। এই ছবিটা ভাইরাল হয়েছে, কারণ সব মিলিয়ে ছবিটা বেশ লোভনীয়। চায়ের কাপে অথবা হুইস্কির গ্লাসে ঝড় তোলার মতো আলোচ্য ছবি তো বটেই । একে তো সেলিব্রিটি, তার উপর বিবাহপূর্ব এমন ছবি! অনেকের চেতনায় খুব লেগেছে এবং তারা বেশ চেতে গেছেন।

ইরেশ যাকের খুব নামী দুই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সন্তান হওয়ায় চেতনার বিষয়টি এতো তীব্রভাবে উঠে এসেছে। আর সার্বিকভাবে ছবিটা এতো সমালোচিত হবার কারণ হলো প্রথমতঃ তারা নিজেরা সেলিব্রিটি (যারা হাঁচি দিলেও সংবাদ হয়) দ্বিতীয়তঃ পানীয়ের গ্লাসটি ইরেশ জাকেরের হাতে নয়, মীমের হাতে (ইরেশের হাতে হলে চিত্রটা অন্যরকম হতে পারতো) এবং তৃতীয়তঃ ইরেশ জাকের এমন দুজন মানুষের সন্তান, যারা নিজেরাই শুধু স্ব-মহিমায় ভাস্বর, তা নয়, তাঁরা যাদের সাথে চলাফেরা করেন, মানে তাঁদের যারা বন্ধু তাঁরাও সমাজের বিশিষ্টজন। হলুদের অনুষ্ঠান পারিবারিকভাবে হয়েছে ঘরের সব মুরুব্বীদের উপস্থিতিতে। যে ছবিটা ভাইরাল হলো সেটা দেখে যে কারো বুঝতে পারার কথা এটা ইরেশের কিংবা মীমের মা বাবা তথা মুরুব্বীদের উপস্থিতিতে তোলা ছবি নয়।

আসুন একটা দৃশ্য আমরা কল্পনা করি। ধরে নেই আমাদের আম জনতার কারো একজনের গায়ে হলুদ। সেখানে সব আচার -অনুষ্ঠান শেষে ছেলের বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে আলাদাভাবে একটু আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা রাখলো (সবাই করে তা নয়)। আর অবধারিতভাবেই সেই আনন্দ ফুর্তির প্রধান অনুষঙ্গ নাচ – গান এবং মদ-সিগারেট। কেউ যদি এখন বলেন, আমরা মদ, সিগারেট দিয়ে বন্ধু বা বান্ধবীর বিয়েতে আনন্দ ফূর্তি করি না (খুব রেয়ার কেস ছাড়া), তাহলে আমি শাড়ি পরা ছেড়ে দেব। এইটুকু আনন্দ খুব স্বাভাবিক একজন ছেলের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে, আবার বলছি ছেলের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে, মেয়েদের নয় (একেবারেই নয় সেটা বলছি না)।

এখন এই আমরা আম জনতা যারা বন্ধুর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মদ সিগারেট খেয়ে ধুন্ধুমার মাস্তি করলাম, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করি না? আমরা কি সংস্কৃতিমনা নই? আমরা কি দেশকে ভালোবাসি না? আমরা কি সন্তানদের উপদেশ বাণী শোনাই না? নীতিকথা শিখাই না? শিখাই তো! যদি তাই হয় তাহলে ইরেশ-মীম বা তাদের মা-বাবাদের আমরা কেন একটা ছবির কারণে এমনভাবে গালমন্দ করছি! বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মাস্তি করা পর্বের এই ছবিটা কেউ হয়তো বেখেয়ালে বা ভুল করে পোস্ট করে ফেলেছে, যার কারণে আমরা গল্প করার একটা টপিক পেয়ে গেছি।

কিন্তু একবার ভাবুন তো, আমাদের এই জাতীয় কোন ছবি কি থাকে না, বা আমরাও কি তুলি না? কিন্তু কোনো ছবি আমরা কি সচেতনভাবে আপলোড দেই; কখনওই দেই না। এই জাতীয় ছবি কেউ তুললে আমরা আগেই হুমকি ধামকি দিয়ে ডিলিট করাবো, নয়তো বলবো, “দোস্ত দেখিস ওই ছবিগুলো আপলোড করিস না তবে ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে” । আমরা আম জনতা বেছে বেছে ভালো ছবিগুলোই আপলোড দেই; ইরেশরাও তাই দিয়েছেন, আমরা দেখেছিও।

ইরেশের নিজের ওয়াল থেকে নেয়া সেলফিও অনেকে ব্যবহার করে নিউজ করেছেন। ওই ছবিটা কেউ একজন হয়তো ফান করে বা অবচেতনে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই পোস্ট করে দিয়েছে। আর যেহেতু তারা সেলিব্রিটি, আমরা চেপে ধরার একটা সুযোগ পেয়ে যাই।

মিডিয়ার মানুষের জীবন যাপন, চলাফেরা আমাদের আম জনতার তুলনায় একটু ভিন্ন। মদ-সিগারেট আমাদের আম জনতার অনেকের কাছেই হারাম টাইপ বিষয় (তলে তলে পান করতে এক্কেবারেই ছাড়ি না অনেকে) কিন্তু ওদের কাছে ‘হয়তো’ সাধারণ। ‘হয়তো’ বললাম এই কারণে যে, একেবারেই এসবের ধারে কাছে যান না এমন দুই একজনের কথা আমি জানি। প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন আছে। সেই জীবনে সে মদ খেল, না জামা খুলে নাচলো, না ঘরে স্পাউজ রেখে একাধিক জনের সাথে শুয়ে বেড়ালো, সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই ব্যক্তিগত জীবন মিডিয়ার মানুষেরও আছে, আমার-আপনার মতো আম জনতারও আছে । মিডিয়ার মানুষের পান থেকে চুন খসলেও সেটা দ্রুত চাউর হয়, আমাদের হয় না – পার্থক্য এটুকুই ।

এখন আসি এই ছবিটার মূল জায়গায় অর্থাৎ দুই নম্বর কারণে। পানীয়ের গ্লাসটি ইরেশ যাকেরের হাতে নয়, মীমের হাতে – হ্যাঁ মীমের হাতে আর সেটাই যতো নষ্টের কারণ। ইরেশের হাতে ওই গ্লাস আর সিগারেট থাকলে এবং সে মীমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকলে এই ছবিটাই হতো ‘আহা কী কিউট একটা ছবি’ টাইপ ছবি। ছেলেগুলো তাদের বান্ধবীদের দেখিয়ে বলতো ‘দেখেছো কী লক্ষ্মী মেয়ে; জামাইয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে’।

চিত্রটা উল্টো হওয়াতে ছিঃ ছিঃ রব উঠলো। মেয়ের হাতে মদের গ্লাস (আমরা আদৌ জানিনা সেটা কীসের গ্লাস তাই ধরে নিলাম), সিগারেট আবার জামাইয়ের কোলে উঠে বসে আছে বিয়ের আগেই! কী বেহায়া মেয়ে, তওবা তওবা! মেয়েদের হাতে মদের গ্লাস ওপেনলি দেখে আমরা অভ্যস্ত না, সিগারেট দেখে অভ্যস্ত না, ওসব মেয়েদের জন্য নিষেধ! মেয়েদের জন্য এসব নিষেধ করলো কে? এই সংক্রান্ত কোনো আইন কী আছে যে মেয়েরা মদ খাবে না, ধূমপান করবে না? আছে কী? নেই।

পুরুষের দ্বারা মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেয়া অলিখিত একটা নিয়ম এটা – যেটা আমরা মেয়েরা মেনে নিয়ে মাথার তাজ করে পরে আছি। পুরুষরা ঠিক করলো মদ সিগারেট শুধু তাদের জন্য, তাই তারাই পান করবে, নারীরা নয়; আমরা নারীরাও মেনে নিলাম; ইনফ্যাক্ট আমাদের মাথার মধ্যে এটাই আইন ধর্ম হয়ে বসে গেলো যে মেয়েদের মদ সিগারেট মানা। আর তাই পুরুষরা শুধু নয় অনেক নারীও নারীদের মদ খেতে দেখলে বা সিগারেট খেতে দেখলে তওবা তওবা বলে ইয়া লম্বা ঘোমটা টানে।

এখন আমরা ইসলামের দোহাই দেবো, সামাজিক ব্যবস্থার কথা বলবো ! আল্লাহ তাআলা মদ ও জুয়া হারাম করতে গিয়ে পবিত্র কোরানে বলেছেন, “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর তার মধ্যে মানুষের জন্য উপকারিতাও আছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে বড়।” (সূরা আল-বাকারা:২১৯)। এখানে মানুষ বলতে নারী পুরুষ উভয়ের কথা বলা হয়েছে আশা করি এটুকু আমরা সবাই বুঝি।

যে জিনিস পুরো মানব জাতির জন্যই খারাপ, সেটা আলাদা করে পুরুষের জন্য ভালো হতে যাবে কেন, আর নারীর জন্যই বা নিষিদ্ধ হতে যাবে কেন! মদের উপকারিতা তাদের জন্য, যারা রাশিয়ার মতো দেশে মাইনাস টেম্পারেচারে বাস করেন। আমাদের জন্য নয়, যেখানে মদ পান করে মাতাল হয়ে লোকজন ড্রেনকে নাফাকুম ঝরণার পানি মনে করে রাত বিরেতে গোসল করা শুরু করে! আমরা এখানে মদ আর সিগারেটকে নারীর জন্য নিষিদ্ধ করে সেটা পুরো সমাজের মাথায় সেট করে দিয়েছি, যার কারণে ইরেশ-মীমের ছবিটা নিয়ে এতো সমালোচনা হলো। মিডিয়ার মানুষের একটা ব্যাপার ভালো আর তা হলো তাদের মধ্যে অনেক ব্যাপারেই রাখঢাক কম হিপোক্রেসি কম (একেবারে নেই বলছি না)!

আমাদের মতো তলে তলে টেম্পু চালানো মানুষ নয় যে কেউ দেখলেই বলে হরতাল। তারা আমাদের অনেকের অনুকরণের মানুষ হলেও আমরা যাতে ভুলে না যাই তাদেরও একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে । সেই জীবনের খারাপ কোন কিছুকে আমরা ফলো না করলেইতো হলো । ইরেশ-মীমের ছবি নিয়ে সমালোচনার আগে একবার নিজের অন্তরমহলে উঁকি দেন – উত্তর পেয়ে যাবেন আশা করি।
(গালমন্দ করার আমন্ত্রণ রইলো)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 743
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    743
    Shares

লেখাটি ৬,৩২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.