একচোখা আমরা!

0

রীতা রায় মিঠু:

প্রতিটি জিনিসেরই কমপক্ষে দুটো পিঠ থাকে। মুদ্রার যেমনি দু্টো পিঠ থাকে, কাজের ভাল-মন্দ দুদিক থাকে, ঘটনার আগে-পরে থাকে, জীবনের বাঁচা-মরা থাকে। বেশির ভাগ সময়েই আমরা কোন ঘটনা বা বিষয়ের দুপিঠ দেখার চেষ্টা করি না। একমাত্র টাকা অচল কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য টাকার দুই পিঠ ঘষে দেখে নেই। পথের ধারে বসা অন্ধ ভিখিরি যেমনি ভিক্ষে নেয়ার সময় কয়েন বা টাকার নোট অচল কিনা তা হাতড়ে পরখ করে নেয়।

আমাদের মধ্যে টাকা বাদ দিয়ে জীবনের বাকি বিষয়গুলো এক চোখে দেখার প্রবণতা বেশি। আমরা দেখি, কে আমার চেয়ে বেশি ভালো আছে! আমরা দেখি, কার ছেলে লেখাপড়া, চাকরি, ব্যবসায় সাঁই সাঁই করে উন্নতি করে ফেলেছে। আমরা দেখি, মেধা ছাড়াই টাকার জোরে কার ছেলেমেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেলো, কার ছেলেমেয়ে আমেরিকা চলে গেলো!

আমরা দেখি, কোন দম্পতি একেবারে প্রেমে হাবুডুবু, লাবুডুবু ভাব করে সুখি সুখি চেহারায় আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

আমরা দেখি,কে আমাদের চোখের সামনে সাত তলা দালানের মালিক হয়ে গেল, কার ছেলে রাজনীতি করে কোটি টাকার বাড়ি বানালো, কোন বাড়ির ছেলে আরব দেশে চলে গেলো! আমরা দেখি, কার কালো মেয়ের বিয়ে হলো বিশাল বড়লোক বাড়িতে, কার ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে টকাটক ইংলিশ শিখে ফেললো, কার মেয়ে মন্ত্রীর সাথে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলে, কোন অজ পাড়াগাঁয়ের সখিনার বিয়ে হয়ে গেলো মন্ত্রীর সাথে, সাধারণ এক মানুষ কিভাবে ফেসবুকে সেলিব্রেটি হয়ে গেলো, বইমেলায় কোন পুচকি লেখকের বইয়ের কাটতি বেশি —

এমনি কতকি দেখি আর নিজের ভাগ্যে জুটলো না বলে হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার না হোক, ঈর্ষার তুষানলে ধিকি ধিকি তাপে দগ্ধ হই।

আমরা দেখি না, অসুস্থ বাচ্চার বাবা-মায়ের দিন কিভাবে কাটে, জানি না ক্যান্সার আক্রান্ত আর্যর বাবা মায়ের বুকে কী তোলপাড় চলে, জানি না হসপিটালে মৃত্যুশয্যায় থাকা রোগীদের পরিবারের দুর্দশা বা ভোগান্তির পরিমাণ, জানতে চাই না রাজনৈতিক ডামাডোলে নিহত নিরপরাধ পথচারীর পরিবারে কী মাতম চলে! জানতেও চাই না, পেট্রোল বোমা সন্ত্রাসে পুড়ে মরে যাওয়া মানুষগুলোর সংসার কীভাবে চলছে!

আমরা দেখি না সহায় সম্বলহীন বিধবার অসহায় চোখের চাহনি, দেখি না অটিস্টিক শিশুদের বাপ মায়ের স্বাদ বর্ণহীন দাম্পত্য জীবনের ছবি, দেখি না ধর্ষণের শিকার কন্যার বেদনার্ত মুখচ্ছবি, দেখি না শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত কন্যার বাবা মায়ের নিদারুণ অপমান, ভাবনাতেই আনি না অভাবের তাড়নায় দালালের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া কিশোরীর ভয়ার্ত দিশেহারা মুখ, ভাবি না আরব দেশে যাওয়া মানুষগুলোর মানবেতর জীবনযাপনের করুণ চিত্র!

আমরা দেখি না ড্রাগ এডিক্টেড ছেলেমেয়ের মায়েদের অসহায়ত্ব, দেখি না ফ্যানের আংটায় ফাঁস লাগিয়ে মরে যাওয়া টিনএজ ছেলেমেয়ের বাবার আহাজারির দৃশ্য, দেখি না জঙ্গি ছেলের মরদেহ গ্রহণ করতে অস্বীকার করা বাপ-মায়ের বুকের ব্যথা, দেখি না চাপাতির আঘাতে খুন হয়ে যাওয়া অভিজিত নিলয় ওয়াশিকুর জুলহাস তন্ময়দের বাবা মায়ের স্তব্ধ চাহনি, বুকে চাপ ধরে থাকা শোকের যন্ত্রণা।

দেখতে পাই না ধর্ষণের শিকার মেয়েগুলোর পরিবারে লেপ্টে থাকা কষ্ট, অপমানের মর্মবেদনা। শুনতে চাই না যৌনকর্মীর দেহে লেগে থাকা বিষাক্ত কামড়ের যন্ত্রণা ও দহনের নীরব আর্তনাদ, দেখতে চাই না রাস্তার ধারে বসা বিকলাঙ্গ ভিখিরির ভিক্ষে চাওয়ার দৃশ্য, দেখি না বানভাসি মানুষের আহাজারি, দেখি না সংখ্যালঘুদের ‘ভয়ে আধমরা’ জীবন যাপন চিত্র—এমনি আরও কত কিছুই দেখি না!

জীবনের অপর পিঠ দেখলে বুঝতে পারতাম, ঐ পিঠে থাকা অল্প কিছু সৌভাগ্যবানের তুলনায় কম ভাগ্যবান হলেও, এই পিঠে থাকা অনেক বেশি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভাগ্যের তুলনায় অনেক বেশি সৌভাগ্যবান আমরা। ডালভাত খেয়ে পরিবারের সকলকে নিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে যে সুখ, যে নিশ্চিন্ততা, অন্যের সুখ দেখে হাহাকার করা হৃদয় কি তা বুঝে!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 157
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    157
    Shares

লেখাটি ৪৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.