৯০ টাকার নিরাপত্তা চাই না

0

ফাহমি ইলা:

পথেঘাটে যেসকল নারীর নিয়মিত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে হয়, তাদের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া রীতিমতো দুষ্কর যিনি এই জীবনে কখনো হ্যারাজমেন্টের শিকার হননি। এরপরেও যেসব পুরুষ কথায় কথায় তুলনা দেয় যে, ‘পুরুষরাও তো নির্যাতনের শিকার’, তারা আসলে ভেবে বলেন, নাকি গায়ের জোরে বলেন, বুঝি না।

অবশ্য যে সমাজে শুধুমাত্র গায়ে হাত দেয়া থেকে ধর্ষণ যা দেখা যায় বা প্রমাণ করা যায় তাতেই নির্যাতনের সংজ্ঞার ফ্রেমিং করে রেখেছে, সে সমাজে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা, শরীর পর্যবেক্ষণ করা, কৌশলে ছুঁয়ে যাওয়াকে কিছুই মনে করে না। তাদের ভাষ্যমতে – ‘এটা নারীপুরুষ একসাথে চললে একটু-আধটু হতেই পারে!’

আমার জীবনে পাবলিক প্লেসে সহিংসতার ঘটনা প্রচুর ঘটেছে। কখনো না বুঝে লজ্জায় চেপে গেছি, কখনো বুঝে ভয়ে চুপ থেকেছি, কখনো প্রতিবাদ করেছি, কখনো প্রতিবাদ করতে গিয়ে পাল্টা বাক্যবাণে জর্জরিত হয়েছি। আবার হাস্যকর হলেও সত্য প্রমাণ করতে পারবো না বলেও চুপ থেকেছি।

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা, গাবতলি থেকে রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি। লোকাল বাসের সিটগুলো এতো সংকুচিত যে দুজন বসতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। একজন নারী বসেছিলেন পাশে, সমস্যা হয়নি। এরপর একজন পুরুষ বসলেন, তাতেও সমস্যা হলো না। তিনি নেমে যেতে আরেক পুরুষ বসলেন এবং কিছুক্ষণ সমস্যা না হলেও আস্তে আস্তে সমস্যা শুরু হলো।
‘বসা যায় না’ ‘এতো ছোটো সিট’ ইত্যাদি বলতে বলতে চাপতে থাকলেন। ঠিকভাবে বসতে বলার পর বসলেন ঠিকই, কিন্তু যথারীতি আবার শুরু করলেন। আবার যখন বললাম, তিনি উঠে পাশের সিটে গিয়ে বসলেন এবং দুনিয়ার মেয়েদের নষ্টামি নিয়ে গল্প জুড়লেন জোরে জোরে। তার দিকে তাকানোর সাথে সাথে বললেন-‘মেমসাহেব, আপনাকে বলিনি।’ গাড়ির সবাই তাকে তাল দিতে থাকলেন কিভাবে নারী এ দুনিয়াকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাত সাড়ে আটটা বাজে তখন। ইদানিং আবার রাত হলেই রূপা, তনুরা এসে সামনে দাঁড়ায় তাদের মৃতমুখ নিয়ে। চুপচাপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেদিন ফিরতে হলো।

গতকাল যখন একটি গাড়িতে উঠতে গিয়েছি, তখন ৯০ টাকা করে দুটো টিকেট কাটলাম। একসিটে আমি বসেছি, অন্য সিটে আমার ব্যাগ। গাড়ির সুপারভাইজারকে বললাম ‘আমি দুটো টিকেট কিনেছি।’ সে বললো-‘ঠিক আছে আপা।’

গাড়ি ছাড়ার পর দেখলাম পেছনে সামনে সিট খালি থাকা সত্ত্বেও বার বার পুরুষযাত্রীরা এসে জিজ্ঞেস করছেন -‘খালি আছে?’ একজন তো ব্যাগ ঠেলে বসে পড়লেন বিশাল ধাক্কা দিয়ে। ওনাকে বলবার পর উঠতে উঠতে বললেন-‘তা বুঝলাম দুটো সিট নিয়েছেন, কিন্তু যাবেন কই? বাড়ি কোথায়?’ দুটো সিট নেবার কারণে কেনো আমার বাড়ি কোথায় বলতে হবে বুঝতে পারলাম না! কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সুপারভাইজার দৌড়ে এসে বললো-‘ভাই, আপনেরে তো সামনেই সিট দেখাইলাম। এইখানে আপা দুইটা সিট নিছেন।’

ভদ্রলোক সুপারভাইজারের কান ফাটিয়ে দেবার হুমকি দিয়ে সামনে গিয়ে বসলেন। আরিচা ঘাট আসতে আসতে অন্তত দুশো বার পেছন ফিরে দেখেছেন, আমি বেঁচে আছি কী মরে গেছি! কী বলবো একে! এ ধরনের সহিংসতাকে কী বলবেন আপনারা? বরং এটুকু বলতে পারি, মাঝে মাঝে উপায় না পেয়ে আমি বাড়তি ৯০ টাকা দিয়ে নিরাপত্তা কিনি, যে নিরাপত্তা আমাকে দেয়ার কথা ছিলো রাষ্ট্রের।

আইন দিয়ে কী হবে যদি না পঁচে যাওয়া মগজের ভেতর থেকে পরিষ্কার না করা হয়? আইন দেখে ভয় পাবে ঠিকই, কিন্তু যেখানে আইন ধরতে পারবে না, সেখানে সেরকমই ছুতো তৈরি করে নেবে নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

আইন অবশ্যই দরকার আছে, সাথে দরকার উপযুক্ত উপলব্ধি তৈরিকরণ। এ সমাজ যদি উপলব্ধি করতে না পারে নারীর মর্যাদা, নারীর অবস্থান, নারীর মুক্তি কোথায় তাহলে তাকে আইন দিয়ে রুখবে কতক্ষণ? সেক্ষেত্রে আইনের পাশাপাশি এই পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি যে এদের যথাযথ উপলব্ধি তৈরি হবে।

এ সমাজ নারীকে একা পথ চলতে দেখলেই প্রলুব্ধ হবে না, হামলে পড়বে না, কামনা বাসনা মেটাবার ছুতা খুঁজবে না, মানুষ হিসেবে যোগ্য মর্যাদা দেবে। আর এরসাথে নারী এবং সচেতন পুরুষদেরও প্রতিবাদে মুখর হওয়া জরুরি।

৯০ টাকা দিয়ে নিরাপত্তা কিনতে চাই না, নিরাপত্তা আমার অধিকার।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 166
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    166
    Shares

লেখাটি ৫২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.