হজের সময় যৌন নিপীড়নের ঘটনা অস্বীকার করছেন কেন?

0

মুশফিকুল ইসলাম:

গত সপ্তাহে Sabica Khan নামের এক পাকিস্তানী নারী হজ করার সময় কাবাঘরে তাওয়াফ করতে গিয়ে তার উপর ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির কথা ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন। তার এই পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সের নারীরা সহমত পোষণ করে মক্কায় এবং সৌদি আরবে গিয়ে তাদের উপরে ঘটা যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানায়। অথচ এই পোস্ট প্রকাশের আগে এই নারীরা বলতে গেলে অধিকাংশই Sabica‘ র পূর্বপরিচিত ছিলনা। কিন্তু বাজে অভিজ্ঞতার শিকার বলতে গেলে অনেকেই।

কয়েক হাজার কমেন্ট পড়ার ধৈর্য্য হয়নি, তবে বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৫ জন হাজী মুসলিম নারীর মন্তব্য পড়েছি যাদের প্রত্যেকেই হয় নিজেরা, অথবা তাদের বোন কিংবা মা এই বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। সবগুলো পড়লে নিশ্চিত আরো অনেক নারী পাওয়া যাবে, যারা পবিত্র কাবাঘরের সামনে কিংবা মক্কা-মদিনায় এই কুৎসিত আচরণের শিকার হয়েছে।

শুধু নারীরাই নয়, অনেক পুরুষ স্বীকার করেছে যে তাদের সামনে নারীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে, এমনকি একটা কমেন্টে দেখলাম যে এক পুরুষ বলেছে যে যখন সে ছোটবেলায় হজ করতে গিয়েছিল, তখন সেও নাকি কোনো এক পার্ভার্টের বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয়েছিল। তার মানে পবিত্র স্থানগুলোও না নারী, না পুরুষ-শিশু, কারও জন্যেই নিরাপদ নয়।

যথারীতি এই পোস্টে কিংবা এই ঘটনা নিয়ে লেখা পোস্টগুলোতে আমাদের অনেক বাংলাদেশী গালাগালির বন্যা বয়ে দিয়েছে। পুরুষেরা তো বটেই, অনেক বাংলাদেশী নারীরাও এটা বিশ্বাস করতে চায় না যে সেখানে এমন কিছু হতে পারে। তাদের যুক্তি, পবিত্র ঘরের সামনে কারো এমন আচরণ করার চিন্তা মাথায়ও আসতে পারে না, কাবা ঘরের সামনে এসব সম্ভব নয়, কোন হাজী এমন কাজ করতে পারে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু সত্যিই কি এরকম কিছু ঘটা অসম্ভব কিছু? আচ্ছা, তাহলে একটা সত্য ঘটনা শোনা যাকঃ

ছবির এই কিশোরী মেয়েটির নাম হাজেরা বেগম। সম্ভবত সিলেট বা আশেপাশের এলাকায় বাড়ি। পাশের দাঁড়ি-টুপি পড়া সত্তর বছরোর্দ্ধ এই লোকটি হচ্ছে তার বাবা ইলিয়াস মিয়া। খুব সম্ভবত সে মাওলানা (পোষ্টের শেষের দিকে ইউটিউবের একটা ভিডিও লিংক আছে, সেখানে ক্যাপশনে মাওলানা লেখা আছে)। এই লোক মোট ৫ টি বিয়ে করেছে। তিনজন স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, অথবা পালিয়ে গেছে। হাজেরা হচ্ছে তার ছোট স্ত্রীর মেয়ে।
তো, এই পার্ভার্ট নিজের আপন মেয়েকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বোর্ডিংয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে, এমনকি বাসা ভাড়াও নিয়েছিল স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে। অনেকদিন ধরেই মেয়ের সাথে সঙ্গম করতে চাইলেও মেয়ে বাধা দিয়ে এসেছিল, কিন্তু শেষবেলায় আর নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। নিজের আপন বাবার কামনার কাছে তাকে হার মানতে হলো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উপরের এই বাবা-মেয়ের ঘটনা কি অবিশ্বাস্য? না, অবিশ্বাস্য নয়। নিচে ইউটিউবের ভিডিও লিংক আছে, যেখানে বাবা নিজেই স্বীকার করেছে যে, এই মেয়ে তার নিজের মেয়ে, সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাসা নিয়েছিল, সে এই মেয়ের সাথে সেক্স করেছে। তার মানে মেয়ের অভিযোগ বাবা স্বীকার করে নিয়েছে।

এই ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে কাবা শরীফের সামনে কোন নারী অপরিচিত পুরুষের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়নি বা হতে পারে না, এটা ভাবার কারণটা কী? নিজের ঔরসজাত সন্তানকে নিয়ে যদি কেউ কামচিন্তা করতে পারে, তাহলে তার কাছে পৃথিবীর কোনো নারী পৃথিবীর কোন জায়গায় (স্থানে) নিরাপদ?

এই ইলিয়াস মিয়ার মতো পার্ভার্ট যে কিনা নিজ ঔরসজাত সন্তানের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না, সে যদি হজেও যায়, তাহলে তার দ্বারা সেখানে নারীদের ওপর যৌন হয়রানি হবে না, এটা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে? হজ বলে এই ইলিয়াস মিয়ার মতো পার্ভার্ট নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারবে, এটা আশা করাটা কি বোকামি নয়? কোন হজ, ওমরাহ কি ইলিয়াস মিয়ার মতো কিংবা ইলিয়াস মিয়ার চেয়েও বিকৃত পার্ভার্টদের নিবৃত্ত করতে পারবে?

সভ্য মানুষ যেখানে সেখানে ইতরামি করে বেড়ায় না, আর অসভ্য মানুষ ইতরামি করার জন্য কোন জায়গাই বাদ রাখেনা।

আমাদের দেশের প্রচুর মানুষ আছে যারা এতটা ধর্মভীরু, এতোটা অন্ধ যে তাদেরকে হাজারটা যুক্তি, হাজারটা প্রমাণ দেখালেও তারা বিশ্বাস করবে না যে হজে এমন কিছু হতে পারে। তাদের ধারণা, হজে এমন কিছু হতেই পারে না, যে বলছে সে হয় মিথ্যেবাদী, না হয় ইসলামবিরোধী।

আবার অনেকে আছে যারা বলে হজে এমন কিছু ঘটলেও সেটা প্রকাশ করা উচিত নয়, এতে করে নাকি পবিত্র মক্কা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে খারাপ ধারণা জন্মায়। পার্ভার্টদের সুযোগটা এখানে। পার্ভার্টরা জানে যে, তারা যতই অপকর্ম করুক না কেন, একপাল মানুষ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যাবে, যারা পার্ভার্টদের পক্ষ নিয়ে বলবে যে পোশাক ঠিক ছিল না কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটেছে, কিংবা অভিযোগকারী মিথ্যে বলেছে।

পার্ভার্টেরা এটার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন হয়রানি করে বেড়ায়। হজে এমন কিছু হয়েছে কোনো নারীর সাথে কিংবা এমন কিছু হতে পারে, এটা মানুষ সহজে বিশ্বাস করতে চায় না বলে ভুক্তভোগীরাও সহজে অভিযোগ করে না। আর যখন একবার একজন সাহস করে লিখেই ফেলেছে তার বাজে অভিজ্ঞতার ঘটনা, তখন অনেক নারীও সামনে এসে সহমত পোষণ করে তাদের উপরেও ঘটা যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করেছে।

হজের সময় প্রতিবছরই অনেক চুরির ঘটনা ঘটে। মানুষের মানিব্যাগ, মোবাইল, কাপড়চোপড়, স্যান্ডেল থেকে শুরু করে অনেক কিছুই চুরি যায়। এরকম একটা সময়ে চুরি-চামারি করার মতো লোক যদি থাকতে পারে, তাহলে ভীড়ের মধ্যে নারী শরীর স্পর্শ করার, নারীদেরকে যৌন হয়রানি করার মতো লোক আছে, এটা বিশ্বাস করতে দোষ কোথায়?

পৃথিবীর কোনো স্থানই নারীর জন্য নিরাপদ নয়, এমনকি পবিত্র স্থানগুলোও নয়। একজন নারী যতোই পর্দা করুক না কেন, পার্ভার্টের কাছে এই পর্দার কোন মূল্য নেই। তার বিকৃত রুচির প্রদর্শন সে করবেই। কাজেই হজে এমন কিছু হতে পারে না, বা এমন কিছু হওয়া অসম্ভব কিংবা হজে যৌন হয়রানি হয় না, এই গোয়ার্তুমি মার্কা বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

মক্কায় প্রতিবছর ঘটা এই যৌন নিপীড়নকে লুকিয়ে রাখায় কিংবা অস্বীকার করায় কোন মহাত্ত্ব নেই, বরং পার্ভার্টদের ঘৃণ্য রুচির বিরোধিতা করাটাই হচ্ছে সত্যিকার মহত্ত্ব। একজন মুসলমান সে যদি তার ধর্মকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস করে, তবে তার উচিত তার ধর্মের পবিত্র স্থানে সংগঠিত অপরাধকে স্বীকার করে নেয়া এবং অপরাধীকে না বাঁচিয়ে এবং অপরাধীর পাশে না দাঁড়িয়ে এই ঘৃণ্য কর্মের বিরোধিতা করা। নাহলে সেও ঐ পার্ভার্টের তালিকায় নিজের নাম লেখায়, সেও অপরাধী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করে।

পার্ভার্ট পিতার নিজ সন্তানকে ধর্ষণ করার স্বীকারোক্তিঃ https://www.youtube.com/watch?v=5a3ecotwhIU&t=2s

 

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৪০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.