সাগর-রুনি আর মেঘের শত্রু আমরা

0

আলফা আরজু:

এলোমেলো কিছু একটা লিখবো সাগর রুনী’কে নিয়ে। নাহ, আমাকে ওরা কোনো স্বত্ব দিয়ে যায়নি। কিন্তু নিষেধও করেনি। শুধু কিছু অসাধারণ স্মৃতি রেখে গেছে।

ওদের সাথে পরিচয়ের দিন তারিখ ঠিক মনে নেই – প্রথম কবে কার সাথে কথা হয়েছিলো? মনে করতে পারি না। কিন্তু সপ্তাহে এক-দুই দিন দেখা হওয়া কিংবা ফোনে কথা হওয়ার মতো অসাধারণ সম্পর্ক ছিলো – ওদের দুইজনের সাথে। কোনো একটা রিপোর্ট ছাপা হলেই রুনী ফোন দিয়ে বলতো, “ওই হারামী, তোরে না কইছিলাম, আমারে একটা হেলথ রিপোর্টিং এর আইডিয়া দিবি।”

নাহ, ওর সাথে আমার হেলথ বিষয়ক কোনো রিপোর্টিংয়ের আইডিয়া শেয়ার করা হয়নি। আমিও একজন স্বার্থপর রিপোর্টার ছিলাম।

কিন্তু সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া’র হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু এসাইনমেন্ট আমরা একসাথে করেছি। রাতের বেলায় কিবরিয়া সাহেবের ধানমন্ডির বাসায় পরিবারের প্রেস কনফারেন্স শেষ করে রুনী আর আমি একসাথে ফিরতাম। রুনী সব সময় ওর অফিসের গাড়িতে করে আমাকে নিউ এইজ নামিয়ে যেতো। আমি প্রায়ই ওকে বলতাম, দরকার নাই।
আমি কারওয়ান বাজার থেকে হেঁটে চলে যাই। কিন্তু রুনী একজন নাছোড়বান্দা। ড্রাইভারকে বলতো, আপনি আগে নিউ এইজ এর অফিস যান। আবার কখনো যদি সচিৰালয়ে থাকতাম, গাড়ি না থাকলে রুনীরে ফোন দিতাম। আশেপাশে কোথাও থাকলে একসাথে অফিসে যাতায়াত করতাম প্রায়ই।

রুনী, মুন্নী (শাহনাজ) আপা, পুতুল, নাদিরা আপা, রোজিনা, মালা আপু, বহ্নি, সাথীসহ আমরা কয়জন হঠাৎ কখনো পুরনো ঢাকার কোনো হোটেলে, প্রবর্তনার আড্ডা’য় কিংবা রোজিনার দাওয়াতে – রমনা রেস্তোরাঁ আমাদের নিত্য যাওয়া আসা ছিলো। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ক্যান্টিন আমাদের দিনে একবার হলেও যাওয়া আসার জায়গা ছিলো। DRU এর বাৎসরিক বনভোজন কিংবা সাধারণ সভা, বৈশাখী আয়োজন – সবখানেই আমাদের একসাথে হওয়া চাই।

ওদের হত্যাকাণ্ডের খবরটা আমি পেয়েছিলাম – উদিসা’র কাছ থেকে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি – আমি হিয়া’কে (আমার কন্যা) স্কুলে দিয়ে বাসায় মাত্র ঢুকেছি – সকালের নাস্তা করবো বলে। হঠাৎ উদিসার ফোন।

“তুমি কই? তাড়াতাড়ি টিভি দেখো” – টিভি খুলে – ৩০ সেকেন্ডের স্ক্রল দেখেই ছুটে গেলাম – রুনীর বাসায়। সেই শোয়ার ঘর – যেখানে রুনী-সাগর মৃতদেহ পড়ে ছিলো। কী ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য! এখনও প্রায় রাতে আঁতকে উঠি। আহা, আমাদের বন্ধু রুনী। ওইদিন সারাদিন ওদের সাথে সাথে ছিলাম।
সেই তো শেষ – ওদের সাথে থাকা।

সাগর ভাইয়ের স্মৃতি:
২০০৭ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে- সাগর ভাই, মালা আপু, সেলিম জাহিদ ভাই, এলিটা, সুমন ও আমি – পার্শ্ববর্তী এক দেশে গিয়েছিলাম অফিসের ট্যুরে। সেই এক সপ্তাহের ট্যুরে আমরা সাগর ভাইকে একজন অসাধারণ বন্ধু-ভাই হিসেবে পেয়েছিলাম – যা জীবনে কোনদিন ভুলতে পারবো না।

সাগর ভাই ছিলেন আমাদের সেই ট্যুরের অলিখিত ট্যুর লিডার। উনি সবার থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে গাড়ির চালকদের সাথে – “ইংরেজী-বাংলা-হিন্দি-উর্দু” মিশিয়ে যোগাযোগ করে – সবকিছু ঠিক করতেন আমাদের যাতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয়। আমাদের খাবার জন্য – ঠিক কোন খাবারের দোকান কিংবা শপিংয়ের জন্য ঠিক কোন শপে যেতে হবে – সব খোঁজ খবর নিয়ে – আমাদের সাথে সদা হাস্যোজ্জল সাগর ভাই থাকতেন। সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সাগর ভাই খাবার টেবিলে চলে যেতেন – সারাদিনের পরিকল্পনা করতে।

একটা ঘটনা বলি – সেই ট্যুরে সাগর ভাই দুইটা luggage নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা কৌতূহল বশতঃ যখন জানতে চাইলাম কারণ কি। সাগর ভাই বলেছিলেন – একটা ব্যাগে উনি রুনী ও মেঘের জন্য গিফট আনবেন। আমরা যেখানেই যেতাম – সাগর ভাই আগে থেকেই বলে – রাখতেন – দেইখো – রুনীর জন্য কিছু পাওয়া যায় কিনা? জামা-জুতা-jewellery সব কিছু।

সাগর ভাই কি এখনও রুনী’কে সেইরকম করে ভালোবাসেন? গিফট কিনে দেন? মেঘের জন্য কি আপনার মন কাঁদে? মেঘকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে? মেঘের সাথে খেলতে ইচ্ছে করে আপনার?
রুনী কি এখনো সেইরকম আকাশপাতাল এক করে হাহা করে হাসে? – খুব জানতে ইচ্ছে করে।

কাল আবার ১১ February, প্রতিবছর – এই দিন আসে ও আসবে। এই সেই দিন – যেদিন “মেঘ” তার বাবা-মা’কে হারিয়েছে।

ওপারে ভালো থাকুন সাগর ভাই ও রুনী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 321
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    322
    Shares

লেখাটি ১,৩০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.