পবিত্রতা আর আপনার ‘কিন্তু’

[মুখবন্ধ: এই লেখাটি ২০১৫ সালে লিখেছিলাম, এখন সামান্য পরিমার্জন করেছি। কিছুদিন ধরে দেখছি হ্বজের সময়ে মেয়েদের শরীরে অশ্লীল স্পর্শ নিয়ে যারা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছে, তাদেরকে অনেকেই অবিশ্বাস করছে, কিংবা ‘ভুল’ করে ভীড়ের মধ্যে ছোঁয়া লেগে গেছে বলে উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাই মনে হলো, এই পুরোনো লেখাটি প্রাসঙ্গিক। আপনি বিশ্বাসী ধার্মিক বলেই আরেকজন যে একই ধর্মের বর্ম গায়ে লাগিয়ে যে অন্যের ক্ষতি করছে না, এমনটা ভাববেন না। বরং কেউ নির্যাতনের শিকার হলে তাকে বিশ্বাস করতে শিখুন, তাকে ভরসাটুকু দিন যে আপনি তার পাশে আছেন; – ধর্মের বর্ম পরা ভণ্ডদের মুখোশ তা না হলে খুলবে কীভাবে, বলুন?]

রনিয়া রহিম:

একবার আমাকে এক বান্ধবী বলেছিলো তার বাবা মা’র সাথে সে যখন ওমরাহ হ্বজে গিয়েছিলো, তখন তাকে কেউ এসে অশ্লীলভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিলো। আমারই ম্যাচুরিটির অভাব হবে, আমি শুনে একদম আকাশ থেকে পড়েছিলাম। “তুমি শিওর?? ভুল করে লেগে যায়নি তো কারো হাত?” আমার বান্ধবী আমার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বলেছিলো, ‘ভুল’ আর ‘ইচ্ছে করে’ করার মাঝে তফাৎ আমি বুঝতে পারি না মনে করো!!??

সে বান্ধবী আমাকে খুব ভালো মতোই চেনে, আমাকে ভুল বোঝার অবকাশ তার নেই। আমি যে হঠাৎ সত্যিই ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, ও সেটা বুঝেছিলো। আমি নিজে এখনো হ্বজে যাইনি, ওমরাহ করতেও না, ভবিষ্যতে যাবো কখনো, সে স্বপ্ন আমার আছে। আমি বেশ কিছু মানুষের অভিজ্ঞতা পড়েছি, শুনেছি; বিশেষ করে এক আমেরিকান মুসলিম ডাক্তারের স্পিরিচুয়াল এক্সপেরিয়েন্সের গল্প পড়ে তো আমি নিজেই ঘোরের মধ্যে ছিলাম কিছুক্ষণ! নিজের জন্য সেই একই রকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের প্রচণ্ড একটা ইচ্ছে আমার আছে, হবে নিশ্চয়ই কোনো একদিন ইনশাল্লাহ।

সেই আমি আজীবন সে পবিত্র স্থানটির সাথে যা কিছু নির্মল, যা কিছু পবিত্র, তারই সংযোগ করে এসেছি, আর তাই আচমকা ভুলে গিয়েছিলাম পবিত্র স্থানেও মানুষ অপবিত্র হতেই পারে, তাতে মন খারাপ করা যায় বড়জোর, কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এক বৈশাখে খুব কদর্য কিছু আক্রমণ হয়ে গেলো কিছু নিরীহ মানুষের উপর; খুবই সংঘবদ্ধ আক্রমণ, ভাবতেই গা শিউরে ওঠার মতো। একটা স্বাধীন, সভ্য দেশে এটা কিছুতেই কাম্য না, উৎসবমুখর পরিবেশে একেবারেই না – কোথাওই না আসলে, কোনভাবেই না। প্রায় সবারই এতে খুব মন খারাপ, আর এই সুযোগে বেশ অনেক মানুষ ধর্মের প্রতি ভালবাসা থেকে হোক, বা মানুষের প্রতি মমতা থেকেই হোক (- উল্লেখ্য, আমি কদর্য মনোভাবের মানুষগুলোকে এর আওতায় ফেলছি না, কোনো লেখনীর শক্তি মনে হয় নাই তাদের মনে আলো জ্বালাতে!-) পোশাকের শালীনতার একটা প্রশ্ন তুলছেন।

“মানুষের প্রতি মমতা” বললাম, কারণ তাদের কারো কারো মনে এ’ই আসছে, তাদের প্রিয় বোন বা বান্ধবীকে তারা বলছে, “শোন, সাবধানে পথ চলিস, যত পারিস গা বাঁচিয়ে, গা ঢেকে চলিস, তাহলে নেকড়েরা তোর উপর চড়াও হবে না!” অথবা, বদলে যাওয়া দেশ বা সমাজের অনেকরকম অবক্ষয়ের মাঝে পোশাককেও রেখেছে তারা; তারা মন খারাপ করে ভেবেছে, “বৈশাখের আক্রমণের শিকার হওয়া মেয়েগুলোর দোষ কতটুকু আছে জানিনা, কিন্তু আজকাল পথে বেরুলেই মেয়েদের যে পোশাক দেখি, ছি ছি, তাদের কি সামান্যতম লোকলজ্জাও নেই? তারা কি ইচ্ছে করেই নিজেদের উপর পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি ডেকে আনছে না? যে পুরুষরা বিশ্রী ভাবে দেখছে, তাদের যেমন নিয়ত খারাপ – যে নারীরা [তাঁদের মতে] বিশ্রীভাবে সে পুরুষদের সামনে যাচ্ছে, তাদের কি কোনোই দোষ নেই?”

আমি কি এই প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প বলতে পারি? আমার পরিচিত একজন একবার এক ক্যান্সার রোগীর খুব বড় অংকের টাকা মেরে দিয়েছিল, তার অনেকদিনের সঞ্চয় সে এক নিমিষে হারিয়ে ফেলেছিলো সেই লোকটির কারণে। আমরা অনেকেই তারপর সেই ধূর্ত লোকটিকে একযোগে বয়কট করেছিলাম – মামলা করার/ টাকা উদ্ধারের একটা ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছিলো – কিন্তু, সেই লোকটার আচরণের থেকে আরো বেশি কষ্ট পেলাম যখন দেখলাম আমাদের এক প্রিয়জন সেই লোকটারই পক্ষ নিলো। তার যুক্তি ছিলো, সেই মহিলা তাকে বিশ্বাস করলো কেন, তার মাথায় কি ঘিলু নেই? আমরা খুব অবাক হয়ে বললাম, তুমি কী বলছো, যে খুবই সচেতনভাবে ওই নারীর টাকা মেরে দিলো, তার থেকে বড় দোষ করেছে সেই নারী, তাকে সরলভাবে বিশ্বাস করেছিলো দেখে? “প্রিয়জন” খুবই কনফিডেন্সের সাথে বললো, ঠিক তাই!

– এই গল্পটা রূপক হলে খুবই ভালো হতো, আমার নিজেরই লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে রূপকথা লিখছি, কিন্তু এটা আসলেই সত্যি একটা গল্প। আপনারা যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে তথাকথিত ‘ভুল’গুলোর দিকে আঙ্গুল তুলে থাকেন, আমাদের বাকি সবার তখন হঠাৎ মনে হয় কী অদ্ভুত এক দুঃস্বপ্নে বাস করছি আমরা, এমনটা হওয়ার বোধহয় কখনোই কথা ছিলো না!

কেউ যখন নৃশংসভাবে খুন হয়ে যায়, তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস এমনকি বিদ্বেষের দিকে শুরুতে আঙ্গুল না তুলে দৃঢ়কন্ঠে সে অন্যায়টার প্রতিবাদ করুন সবার আগে; প্রত্যক্ষভাবে তো না’ই, পরোক্ষভাবেও যেন সে অন্যায়টা জায়েজ না হয়ে যায় সে দিকে দৃষ্টি রাখুন প্লিজ! সেবারের বৈশাখে যা হলো, বা, হ্বজে যাদের সাথে নোংরা আচরণ হলো, সেগুলো সুনিপুণ কুটিল, কুৎসিত সব আক্রমণ , – আপনি সেটাই বলুন, সেটাই লিখুন, আশপাশের মানুষকে সচেতন করুন, আর আপনার আশপাশে এমন মানুষরূপী পশু যারা তা ঘটায় বা পাশবিক আনন্দ পায় এমনসব ঘটনায়, তাদের মুখোশ খুলে দেন যতদূর পারেন! যারা ‘পোশাকের দোষ, পুরোটা বা আংশিক’ বলে যারা দাবি করে; বা যারা কেবল মাত্র ধর্মীয় সংযোগের দোহাই দিয়ে অত্যাচারীদের পাপগুলো উড়িয়ে দেয়, তাদের পারলে বোঝান, আর বুঝতে না চাইলে তাদের সংস্পর্শ থেকে সরে আসুন। একদমই প্রশ্রয় দেবেন না তাদের, ভুল করেও না!

মনে রাখুন: কোনো কোনো মেয়ে পর্দায় নিজেকে আবৃত করে, কিছু মেয়ে সেটিকে জরুরি মনে করে না, কিন্তু কোনো মেয়েই চায় না কারো কদর্য, অশ্লীল হাত এসে পড়ুক তার শরীরে! আপনার যে কোনো পরামর্শের চাইতে একজন মেয়ের নিজস্ব ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী এসব ব্যাপারে, কোথায় কেমন ভাবে চলতে হবে তাকে, সে নিজেই ভালো বোঝে, আপনার ‘ভালোমানুষী উপদেশের’ তার খুব বেশি প্রয়োজন নেই কিন্তু! অবিশ্বাস নয়, আপনার কথা ও কাজে আপনি তার পাশে আস্থা হয়ে দাঁড়ান, – আপনার ধর্মবোধ ও মানবিকতার এর চাইতে বড় প্রকাশ আর কি হতে পারে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.