‘খ্যাত বা অখ্যাত’তে কী এসে যায়!

আফরোজা চৈতী:

আজকাল উইমেন চ্যাপ্টারের এডিটোরিয়াল পলিসি নিয়া, লেখকদের লেখক বলবেন না অলেখক বলবেন, এইসব নিয়া প্রাক্তন লেখক-কলামিস্টরা ব্যাপক সরব হয়েছেন। কারা লিখতে পারবেন, আর কারা লিখতে পারবেন না, সেই সব নিয়াও তাদের ব্যাপক মাথাব্যথা। অথচ যে পরিমাণ সময় তারা এই সব নিয়া পইড়া থাকেন, সেই সময়টা তারা তাদের ব্যাপক জ্ঞানচর্চায় কাজে লাগাইতে পারেন।

তাদের কি পোর্টাল এর সম্পাদকীয়র দায়িত্ব দেয়া হয়েছে? নাকি কে লিখতে পারবেন আর কে লিখতে পারবেন না এইসবের ক্লোজআপ তোমাকেই খুঁজছে লেখকের জাজ বানানো হইছে? যাই হোক স্বাধীন দেশ, আমাদের বেকতের স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। তাই তেনারা মত প্রকাশ করতেই পারেন। এতোদিন ভাবতাম অন্তত লেখার জায়গাটা দলীয়করণমুক্ত, কিন্তু এখন দেখছি সেইখানেও ব্যাপক দলবাজি, তেলবাজি, মামদোবাজির রাজনীতি চলছে। একসময় যে পোর্টালে তারাও নবাগত হিসেবে লিখেছেন, আজ সেই পোর্টালকেই তারা নাক সিঁটকাচ্ছেন! সত্যি বিচিত্র ইহাদের নারীবাদী আন্দোলনের রকম সকম।

আবার কে নারীবাদী, কে নারীবাদী নন, এইসব নিয়েও দেখি ব্যাপক বিতর্ক চলতে থাকে। ষাট এর দশকে যে নারীবাদ এর আন্দোলন ইউরোপে দানা বেঁধে ছিলো, সেই আন্দোলন আজ এই মিলেনিয়ামের উত্তর আধুনিক যুগে এসে পরিবর্ধিত পরিমার্জিত হয়েছে। আজকের আধুনিক নারীবাদ অনেক পরিশীলিত, সংযত, উদার, আর তাই এখন যারা নারীবাদ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, লেখায়-টকশোতে তাদেরও উচিৎ এই শব্দগুলো মাথায় রাখা।

আমি উত্তম, তাই তুমি অধম, এই বৃত্ত থেকে তাদের বের হয়ে এসে বরং নতুন কলম ধরতে পারা মেয়েটাকে তাদের সাধুবাদ জানানো উচিৎ, অনুপ্রাণিত করা উচিৎ। কে জানে আপনাদের মতো গুণী লেখকদের অনুপ্রেরণা হয়তো তাকেও উদ্বুদ্ধ করবে আপনাদের মতোই সামনে এগিয়ে যেতে। আমি সুপ্রীতি ধরকে ধন্যবাদ জানাই এই কারণে যে, তিনি এই অসাধ্য কাজটি করেছেন, এবং করে চলেছেন। সকল হুমকি, সকল সমালোচনা নিজের ঘাড়ে নিয়েই একা পথ চলছেন।

যে মেয়েটি একলাইন লিখতে পারে, তাকে আরও ১০ লাইন লেখার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তিনি। কে জানে হয়তো এই সব “অখ্যাত” লেখা থেকেই একদিন তিনি আপনাদের মতনই “খ্যাতনামা” হয়ে উঠবেন! সত্যিকারের নারীবাদ বা নারীবাদী হতে কী কী ব্যকরণ জানা প্রয়োজন আমি বলতে পারবো না, তবে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন নারীবিষয়ক অনুষ্ঠান নির্মাণের অভিজ্ঞতায় এটুকু বলতে পারি, একজন আলোকিত নারী শুধু সেই আলোয় নিজে একা হাঁটেন না, বরং খুব নিরবে তিনি আরও ১০০ জনকে অনুপ্রেরণা যোগান সেই পথে হেঁটে যেতে।

আমি জানি এই লেখাটা যখন প্রকাশ হবে তখন আমাকেও খ্যাত (শব্দান্তরে ক্ষেতমার্কা),অ-কবির তকমা লাগাতে হবে। আমার কোনো আফসোস নেই। কারণ লেখক হওয়ার জন্য বুকে অনেক দম লাগে, মাথায় অনেক টলটলে স্বচ্ছ জলের চিন্তার ঝর্ণাধারা লাগে। আমার ধারণা সেটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। আর তাই যারা যেটুকুই লিখেন, বা লেখার চর্চা করেন তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রাখি। কারণ যেটুকুই তিনি লিখছেন, সেটুকুই তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু দিয়েই লিখেন।

হ্যাঁ হয়তো পোর্টালে তাঁর ছবি বা তাঁর লেখা দিয়ে যখন সম্পাদক তাঁকে ঠাঁই দেন, তখন তাঁর ভেতরের আত্মবিশ্বাসটা আর একটু পোক্ত হয়, ভালো বা খারাপের চেয়েও বড় বিষয় সেই মেয়েটি তার কলমটাকে অনুভূতি প্রকাশের বড় একটি আশ্রয় ভেবে নেয়। তার দ্বিধা ঝেড়ে আরও একটু বড় পরিসরে সে ভাবতে শেখে। তারপর এক-দুই-তিন করে তার লেখক হওয়ার পথে এক পা, দু পা করে সে এগিয়ে যায়। আর এই এগিয়ে যাওয়ার পথে উইমেন চ্যাপ্টার আজ অবধি সব ধরনের, সব পেশার, সব বয়সের নারীদের লেখা যেভাবে পোর্টালে ঠাঁই করে দিয়েছে, সেটার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে সাধুবাদ জানাই বাংলাদেশের নারীবিষয়ক প্রথম পোর্টালটিকে।

শুধু women chapter নয়, নারীবিষয়ক যে কোনো উদ্যোগ, যা কিনা নগর-শহর-ধনী-দরিদ্র, কবি-অকবি-লেখক-অলেখক সকলকে নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয় সকল দল মত রাজনীতি তেল ও দলবাজির ঊর্ধ্বে গিয়ে, সেই সব উদ্যোগকেই ভীষণভাবে সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন বোধ করি। ‘তাহারে আমি ধূলির কণা বলি যদি, তবে সে ধূলাতো আমারও’। আর তাই কে ভালো বা কে মন্দ সে সমালোচনা থাকুক পড়ে, তার চেয়ে একসাথে কদমে কদম ফেলে প্রয়োজনে যে পিছে পড়েছে, তাকে একটু সাথে নিয়ে এগোতে ক্ষতি কী?

সমালোচনাটাও করি, তবে সেটা যেন আক্রমণাত্মক না হয়ে গঠনমূলক হয়, যেন সে কলমটা না ছেড়ে আরো একটু আঁকড়ে ধরে ভুলটা শুধরে নিতে। ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা সকল নারীই যেন সমস্বরে, একসুরে গাইতে পারে জীবনের জয় গান, আর সেই গানই বেগবান করবে এই মিলেনিয়ামের উত্তর আধুনিক নারীবাদ আন্দোলনকে।

পরিশেষে খ্যাত, অখ্যাত, লেখক, অলেখক, লিখতে পারা অথবা না পারা, বই বের হওয়া, অথবা না হওয়া সব নারীকেই এই ভাষার মাসে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। যেমনই লিখেন আপনি, সেটা আপনার অনুভূতির ভাষা। আর অনুভূতির ভাষার চেয়ে শক্তিশালী ভাষা আর কিছুই নয়।

মান্দী ভাষায় – মুই তরে কুছপাং বলে যে অনুভূতি প্রকাশ করে, সেটিই আমরা বাংলায় লিখি, আমি তোমায় ভালোবাসি।
দুই ভাষা দুই ভিন্ন জাতিসত্তা, কিন্তু অনুভুতির জায়গাটা পাহাড় আর সমতলকে এক করে দিয়েছে।

নারীবাদ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে এই ঐক্যটা আমাদের আজ ভীষণ প্রয়োজন। সাধুবাদ জানাই আবারও উইমেন চ্যাপ্টার আর এই পোর্টালের সম্পাদককে। কেননা নারীর এই অনুভূতি প্রকাশের ভাষাকে আপনি ঠাঁই দিয়েছেন, ঐক্যবদ্ধ করেছেন একটি প্ল্যাটফর্মে।

শেয়ার করুন:
  • 102
  •  
  •  
  •  
  •  
    102
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.