বেলুচিস্তানি নারী বনাম বাঙালি নারী

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

সেদিন বিকেলে কন্যার নাচের রিহার্স্যালে যেতে ‘উবার’ কল করেছি| খুব তাড়াহুড়া; তাই আসা মাত্রই, ‘হাই-হ্যালো’ কিছু না বলেই গাড়িতে উঠে বসি| কিন্তু ভদ্রলোক (বয়স আনুমানিক ৪০/৪৫) অমায়িক হেসে আমার অভদ্রতা পুষিয়ে দিলেন| হেসে জিজ্ঞেস করলেন, মা-মেয়ের দিন কেমন গেল?
আমি উত্তর দিয়ে, পাল্টা কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম তাঁকেও| তিনিও জানালেন তাঁর ব্যস্ত দিনটি সম্পর্কে|

তারপর এ কথা, সে কথায় অনেক কথাই শুরু হয়ে গেল| হঠাৎ ভাবলাম তাঁর দেশ কোথায় জিজ্ঞেস করি| দেখে মনে হচ্ছিলো, মালয়েশিয়ান বা ইন্দোনেশিয়ান হবেন|
কিন্তু উত্তর শুনে থান্ডার্ড হয়ে গেলাম! বলেন কিনা তিনি পাকিস্তানী! বললাম-

– তোমাকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না! আমাদের সাবকন্টিনেন্টে মানুষের চেহারায় যে একটা কমন ধাঁচ আছে, তা তোমার মাঝে নেই! ইন্টারেস্টিং!

— হুম ঠিক| আসলে আমি পাহাড়ি| তাই একটা ট্রাইবাল লুক আছে আমার চোখে-মুখে| …. ইন ফ্যাক্ট, আমি বেলুচ| এবং এটাই আমার আসল পরিচয়| কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মানুষ এ পরিচয় শুনে আমায় আইডেন্টিফাই করতে পারে না! তাই ‘পাকিস্তান’ বলতে হয়| এত কথা যে বলছি; আচ্ছা তুমি নাম শুনেছ তো, বেলুচিস্তানের?

– শুনবো না মানে? বেলুচিস্তান পাকিস্তানের একটা প্রভিন্স| কিন্তু তোমরা এখন একটি স্বাধীন দেশ চাও! তোমরা সম্ভবত অনেকখানি ডেপ্রাইভড পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে…; তাই না?

–ওহ মাই গুডনেস! তুমি দেখি, ভালোই জানো আমাদের সম্পর্কে| বাই দ্য ওয়ে, তুমি কি বাংলাদেশী?

-হ্যাঁ, ঠিক ধরেছো! কিন্তু কীভাবে বুঝলে বলো দেখি?

–জানি না, কীভাবে বুঝলাম| তবে হঠাৎ মনে হলো| …হতে পারে, আমি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কথাই ভাবছিলাম, তাই! তাই-ই হয়তো ভেবে নিতে ইচ্ছে হলো- তুমি বাংলাদেশের!

-স্ট্রেঞ্জ! তুমি হঠাৎ বাংলাদেশের কথা ভাবছিলে?…কেন?!

–হঠাৎ নয়| বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমরা বেলুচিস্তানের অনেকেই প্রায়ই বাংলাদেশের কথা ভাবি… |

–ওহ রিয়েলি?!

— হ্যাঁ রিয়েলি ভাবি| বাংলাদেশের কথা ভেবেই যে আমরা আমাদের নিরাশার দিনগুলোতে আশাবাদী হয়ে উঠি| বাংলাদেশের জয়ের গল্পটিকে যে আমরা আমাদেরও ভবিষ্যৎ জয়ের গল্প ভাবি! …তুমি তো বোধহয় তোমাদের ৭১ এর যুদ্ধ দেখোনি, যুদ্ধের আগের পাকিস্তানী শোষণও নিশ্চয়ই তেমন করে জানোনি! কিন্তু তুমি ওদের সব লোমহর্ষক বর্বরতা জানতে পারবে, যদি আমার কাছে আমাদের স্রেফ যেকোনো একটি দিনের বেলুচিস্তানি দিনের রুটিনটুকু শোনো…! সকালে উঠেই মেয়েরা….. … না থাক, বাদ দাও!!

-কেন? বাদ দেব কেন! বলো…

–না থাক, আবার শেষে খুব হতাশ হয়ে পড়তে পারি!

-কিছুই বুঝতে পারছি না! হঠাৎ কী এমন হলো যে মনে হচ্ছে হতাশ হয়ে পড়বে?

–জানো, মাস দুয়েক আগে একজনকে পিক করেছি, বেশ একটু দূরের যাত্রী তিনি| তোমার মতোই হবে তার বয়স| তাঁর সাথেও ছিল তাঁর সন্তান| গ্রিটিংস বিনিময়ের পরেই তিনি জানতে চাইলেন, আমি কোন দেশের? ‘পাকিস্তান’ শুনেই তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন| ভাবলাম তার দেশ পাকিস্তান নিশ্চয়ই| কিন্তু অবাক হয়ে শুনলাম তিনি বাংলাদেশের নাগরিক| বছর তিন হয়েছে এখানকার রেসিডেন্সি পেয়েছেন| তিনি আমাকে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে জানালেন, তাঁর ফেভারিট ক্রিকেট টিম পাকিস্তান!
বিশ্বাস করলাম না প্রথমে| অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সত্যি??’ তিনি বললেন ‘নিশ্চয়ই’! তাও বিশ্বাস করতে পাচ্ছিলাম না পুরোপুরি| কিন্তু বিশ্বাস শেষে করতেই হলো যখন অতি একসাইটেড হয়ে জানালেন তার বিয়ের ল্যাহেঙ্গাটিও ছিল পাকিস্তানী! শখ করে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছিলো নাকি তার পরিবার!

-পাকিস্তানী ড্রেস -এ আগ্রহ শুনেই তাহলে বিশ্বাস করলে যে তিনি পাকি টিম এর ভক্ত?

–হ্যাঁ করলাম| কারণ আমি মানে আমরা বেলুচরা কখনোই ভাবতে পারি না~ বাংলাদেশের কোনো নারীর পক্ষে ৭১ এর পরে আর কখনো পাকিস্তানী কাপড় গায়ে ওঠানো সম্ভব! কারণ আমরা জানি ওরা কিভাবে মা-বোনেদের কাপড় ছিঁড়েছে বা ছিঁড়তে পারে! নিজের জাতির এহেন (সর্বোচ্চ) অপমান ভুলে গিয়ে, যে ওই শত্রু দেশেরই তৈরি কাপড় পরে গর্ব বোধ করতে পারে, সে সেদেশের ক্রিকেট টিমের ফ্যান হতেই পারে! হতেই পারে!!

ওহ স্যরি… আমি তো জানিই না, হয়তো তুমিও অমন! কিন্তু বিশ্বাস করো, আমাদের বেলুচ নারীর সাথে ওরা দিনের পর দিন যা করেছে এবং এখনো করে চলেছে, তার অর্ধেকও যদি ৭১-এ তোমাদের সাথে করে থাকে তো, পাকিস্তানী ড্রেস কেন, পাকিস্তানে তৈরি সুতো দেখলেও তোমাদের মন ঘৃণায় ভরে ওঠার কথা!
স্যরি এগেইন তোমাকে আহত করে থাকলে! আসলে কী জানো, খুব কষ্ট পেয়েছি সেদিন| তুমি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছো! কিন্তু বিশ্বাস করো, যাদেরকে ‘আলো’ ভেবে স্বপ্ন দেখে খুব কঠিন একটা পথ আমরা অতিক্রম করছি- সেই তাদেরকেই অন্ধকারে দেখলে দিশেহারা লাগে|

-হুম … বুঝতে পারছি| স্যরি! কিন্তু সত্যি কথা কী জানো, সবাই এমন নয়! হতে পারে, আমরা লাকিলি অতি দ্রুত জয়ী হয়ে যাওয়ায় খুব দ্রুত ভুলে গিয়েছি কষ্টের অতীত! কিন্তু প্লিজ তোমরা হতাশ হবে না! হওয়া উচিত না|

–আসলেই হওয়া উচিত না! আমাদের কেউ দেশে অবস্থান করে অসম এক সম্মুখ যুদ্ধ করছে, কেউ বা করছে গোপনে, আবার কেউ বা আমার মতো দূর দেশে থেকে তিল তিল করে ডলার উপার্জন করছে দেশের মানুষকে মাসে মাসে পাঠাবে বলে …| আমাদের এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধটা নয় মাস নয়, নয় বছরেরও নয়| আরও অনেক অনেক বেশি!

…. ওঃ তোমার ডেস্টিনেশনে পৌঁছে গিয়েছি| ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা হয়ে| কী জানি কেন, আজ সকাল থেকেই দেশের কথা মনে হচ্ছে খুব! আর সেজন্যই হয়তো ইমোশনাল হয়ে গিয়েছি এমন! তুমি কিছু মনে কোরো না; আর প্লিজ দোআ করো আমাদের বেলুচিস্তানের জন্য!

-হ্যাঁ, অবশ্যই করবো…তোমরাও জয়ী হও …আর ভালো থেকো!

বিদায় জানিয়ে মনে মনে বললাম ‘আরো একটু দোয়া করছি হৃদয় দিয়ে- জয়ী হয়ে, তোমরা যেন ভুলে না যাও, তোমাদের এ কষ্টের অতীতটাকে’।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৩,১০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.