আমার অনাগত সন্তানকে (পর্ব – এক)

0

সুচিত্রা সরকার:

কথা শুরুর আগে তো আমাদের পরিচয় হওয়াটা চাই। তাই না? নইলে তুমি কেমন করে বুঝবে কার সঙ্গে কথা বলছো?

আমি তোমার মা। সেই মা, যে খুবই নিষ্ঠুর তোমার ব্যাপারে। সেই মা, যে চায় না তুমি স্কুলে যাও। সেই মা, যে চায় না তুমি শহরজুড়ে টই টই করো! সেই মা, যে চায় না, তুমি জন্মে আবার দিকশূন্যপুরে মিলিয়ে যাও!

আর তুমি? তুমি কে, তার পরিচয় নিজেই আবিষ্কার করবে ধীরে ধীরে।
আজ হঠাৎ করেই মনে হলো তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার! নইলে তোমার ভুল ধারণা কাটবে না।

তুমি বারবার প্রশ্ন করো আমাকে। একই প্রশ্ন-একবার, দু’বার, অজস্র্রবার। তোমাকে উত্তর দিতে পারি না। কখনো বড্ড ব্যস্ত থাকি। ভিড় বাসে চড়ে তোমার মাকে দৌড়াতে হয়! কখনো রান্নাঘরে। নুন, তেল, আদা বাটা, মাংস ভুনা, কষ্টের বাষ্প-বসতি! কখনো ক্লান্ত, অবসন্ন! এরকম হুড়াতাড়ায় কথা বলার পরিবেশ থাকে না!

তুমি অভিমান করো! বুঝতে চাও না! তুমি কাঁদো। তুমি চিৎকার করো! আমার ক্লান্তি আরো বেড়ে যায়!

যাই হোক! গতকালের কথা, পরশু বলবো। আজ, আজকের কথা হোক। জরুরি কয়টি কথা! মন দিয়ে শোনো!

কাল তোমার দিদিমা টিভি দেখেনি। দেখলে, ঘুমুতে ঘুমুতে তেরোটা, মানে একটা বেজে যেতো! তাতে ভোরে ওঠায় অসুবিধা! তাই সক্কাল সক্কাল তিনি ঘুমিয়েছিলেন। সকালে হাঁটতে যাননি। সময়ের আগে বাক্স-প্যাঁটরা বা অফিসের ঝোলা- যাই বলো, তাই নিয়ে আজিমপুর চললেন।
কারণ? তাঁর অফিসের স্টাফ বাস আজ সময়ের আগে আসবে। সেটা মিস করা যাবে না। আজ শহরজুড়ে আততায়ী!

তোমার মা ভিতু নয়! তবু যেনও তার মনের কোথায় ‘ভয়’টা ঘাপটি মেরে ছিল। গলি থেকে বেরোতেই বিজিবির দেয়ালের কাঁটাতারে দেখলো, একটা তার ছিঁড়ে পড়ে আছে। দৃশ্যটা অন্যদিন হলে সাধারণই হতো!

সোনা, তুমি তো জানো না, এ শহরে কতো বৈদ্যুতিক তার, জড়িয়ে, পেঁচিয়ে সকলের সঙ্গে আপন হয়ে থাকে। সেগুলোর থেকে একটি নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক তার খুঁজে বের করে যে মিস্ত্রি (ইংরেজিটা যদি শিখতে, তবে বলতাম ইলেকট্রিশিয়ান), তাকে তোমার মা স্যালুট জানায়। এমনই রাশি রাশি, ভারা ভারা তারের প্যাঁচ পড়েছে আমাদের শহুরে জীবনে।

সেই প্রতিদিনের দৃশ্যে, আজকের ছেঁড়া তারটা বড্ড বেমানান ঠেকলো। ভাবলাম, হয়তো কিছু…! পরে আবিষ্কার করলাম, ডিশ অ্যান্টেনার সংযোগের তার! হাহ্

রাস্তাটা বড্ড ফাঁকা আজ। দু’ নম্বর গেটের কাছে দুটো টেম্পো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে! যাত্রী নেই আজ। আজ ভিক্ষুকেরও উদ্বেল অবস্থা! জনমানুষশূন্য শহরে, ওরা হাত পাতবে কার কাছে? দিলাম কিছু এক বৃদ্ধাকে!

সোনামনি, খুব চেষ্টা করে এবং ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলে, তোমার মা আশীর্বাদ ‘ছাপ্পর’ লাগা একটি বাসে চড়তে পেরেছে। এবং অবধারিতভাবে বাম দিকের প্রথম সিটটায়। জানলার পাশে। যদি বেঁচে যাই, তবে সহজে ঝঞ্ঝাট ছাড়া নামতে পারবো। আর যদি পেট্রোল বোমায় পুড়ে যাই, তবে প্রথম আগুনটা আমার গায়েই লাগবে।

আজ রাস্তাটা বড্ড ফাঁকা! বড্ড। পথের সব মানুষের আজ বিষন্নতা রোগে পেয়েছে। আতিক মামাকে চেনো তো? ওই যে মনো-বিশেষজ্ঞ? তোমার মামা, কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, বিষন্নতার একটা চিহ্ন- কপালের নিচে ভ্রু এর মাঝে ভাঁজ পরা!

লক্ষ্য করলাম সবগুলো মানুষের কপালের মাঝে ভাজ! শুধু বাসের কনডাকটর ছাড়া! সে সবাইকে বাসে তুললো। শুধু এক মাছওলাকে ছাড়া! মাছওলার ঝুড়িতে মাছ ছিল। পুলিশ নাকি মানা করেছে, বাসে আজ কোনো ঝুড়ি-বস্তা না তুলতে। বোঝো তবে!

আমার বিষন্নতা আরো বাড়লো পাশের সিটের ভদ্রমহিলার কথা শোনে। তিনি তাঁর বরের সঙ্গে কথা বলছেন। ফোনে। কথাগুলো শুনেই মনে হলো, তোমাকে বোঝানোর মতো যুক্তি দেখালেন তিনি।
তিনি বরকে বলছেন ‘কী করবো, অফিসে তো যেতেই হবে! আল্লার নামে পথে বের হইছি। আল্লা যা করার করবে!’
তারপর একটু থেমে ও প্রান্তের কথা শুনলেন। তারপর উত্তর দিলেন, ‘না স্কুলে পাঠাইনি ফাহিমকে! স্কুলের দারোয়ানকে ফোন করেছিলাম। সে-ই বললো, আপা পাঠায়েন না স্কুলে। যারা আসতেছে, সবাইকে ফেরত পাঠাচ্ছে ম্যাডামরা!’

শুনলে? আমার শহরে, তোমার মায়ের শহরে, বাচ্চারা, শিশুরা স্কুলে ভুল করে যদি চলেও যায়, স্কুল কর্তৃপক্ষ ফেরত পাঠায়!

তুমি তো কতোই বলো ‘স্কুলে যাবো, স্কুলে যাবো! আর আমি কী বলি? বলি, ‘তখন দেখা যাবে। হয় তোমাকে ভোরে ঘুম থেকে তুলতে, আমার নিজস্ব কাজের বারোটা বাজবে। নয়তো, স্কুলে যাবে ঠিক-ই। কিন্তু ভুল পাঠ্য বইয়ে ডুবে যাবে তুমি। তারপর পরীক্ষার আগে ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে মনোনিবেশ করবে!

মাগো, তোমাকে তাই আমি স্কুলে পাঠাতে চাই না। চাই না তুমি এই শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হয়ে ওঠো! আমি ভয় পাই-এসব দেখে দেখে, শিখে তুমি পশু হয়ে উঠবে! বড় ভয় পাই মা!

কল্যাণপুরে নামলাম বাস থেকে। কনডাকটর আজ বেশ আর্দ্রমনে রয়েছে। বেশ যত্ন করে তোমার মাকে নামালো। শুনশান পথ। জনপদ, জনহীন। খাঁ খাঁ করছে।

সোনা, আমি আর লিখতে পারছি না তোমাকে। পাশের কোনো ভবনে চিৎকার করছে একটা মাইক। বিরাট তার সাউন্ড বক্স। সবকিছু ছাপিয়ে সেই মাইকের শব্দ আমার ঘরে ঢুকে পড়ছে-ও আলোর পথযাত্রী…এ বালুর চড়ে আশা-খোকা ফিরবে, কবে ফিরবে, নাকি ফিরবে না-দুর্গম গিরি, কান্তার মরু-স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি-মাগো, ভাবনা কেনো, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, ভয় নেই মা। আর জাতীয় সংগীত।

মা, আজ বিজয় দিবস নয়। নয় স্বাধীনতা দিবস। আজ এই গানগুলোর সুর পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ার মতো কিচ্ছু নয়। তবু আজ শহরের অলিতে গলিতে যেমন হয়েছে ‘ইউনিফর্ম পোশাকধারী’র যত্রতত্র বসবাস। তেমনি গানগুলোও রয়েছে। কী কন্ট্রাডিকটরি (রাতে এর অর্থ বলবো) অবস্থা ভাবো!
তাহলে বলো! তুমি কেবলি জোর করছো, দেখবে-দেখবে-দেখবে। দেখবে বইমেলা। দেখবে পথঘাট। দেখবে মানুষ!

সোনা দেখার কিছু নেই এ শহরে। এ শহরের প্রত্যেকটা মানুষ আজ আততায়ী হতে পারে। প্রত্যেক মানুষের মন আজ অবিশ্বাসী। তাই এ শহরে তোমাকে আমি আসতে দেবো না।
ভালো থেকো। কথা হবে। কাল যে বইটা পড়তে দিয়েছিলাম-ঈশপের-সেটা আজকের মধ্যে পড়ে শেষ করো। রাতে কথা হবে!

তোমার বিহ্বল মা
৮.২.২০১৮
দুপুর ১২.০৯ মিনিট
দারুস সালাম, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 224
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    224
    Shares

লেখাটি ১,০৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.