আমার বেপরোয়া মন

0

ফড়িং ক্যামেলিয়া:

একটা সময় মনে হতো হৃদয় শুধু একজনের জন্য বরাদ্দ বলে অন্য কারও সেখানে স্থান হতেই পারে না। শুধু নায়ক, গায়কদের বিষয়ে ক্রাশ শব্দটা উচ্চারণ করলে, নিয়ম খানিকটা শিথিলযোগ্য, তবে সেটাও প্রেমিকের অনুমতি সাপেক্ষে। অন্তত ষোড়শীকালে তাই ভাবতাম। তাই প্রথম বিরহটার রেষ কাটতে বহুদিন লেগেছে।

এরপর আবার প্রেমে পড়লাম, তখন মনে হলো, যাক, আগেরটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, এবার সত্যি সত্যি বুঝি রূপকথার রাজপুত্র তার পঙ্খিরাজে উড়য়ে নেবে। কিন্তু সে আশা মরীচিকা হলো, সেই সাথে ‘আমার হৃদয় শুধু তার’ এই বিশ্বাসে ফাটল ধরা শুরু করলো। এরপর সময় গড়ালো আর পুরাতন বিশ্বাস ভেঙে জন্ম নিতে থাকলো নতুন নতুন উপলব্ধি। একদিন হুট করেই বুঝে গেলাম, প্রেম খুব স্বাভাবিক বিষয়। মন ভাঙলে জোড়া লাগে না, এসব ফালতু কথা। মন ঠিকঠিক তার অভাব পূরণ করে নেয়, শুধু জমে থাকে স্মৃতি।

আমার প্রিয় স্বামী প্রবরটি ছাড়া যে কখনো কাউকে ভালবাসিনি, সে কথা তো সত্যি না। শুধু কি পুরুষ? আমি তো নারীর প্রেমেও পড়ি। এই লাইনটা লিখেই মনে হলো ব্যাখ্যা না করলে কাল কেউ কেউ ঠিকঠিক লিখে দেবে, আগেই বলছিলাম ক্যামেলিয়া উভয়কামী!

অবশ্য সমকামীদের প্রতি আমার কোনো ধরনের এক্সট্রা অনুভূতি নেই, তারা আমার আপনার মতো দোষগুণেরই মানুষ। তাই অন্য কোনো বিচার বিশ্লেষণের মধ্যেই আমি নেই। আমি পুরোপুরি স্ট্রেইট। তবে নারীর প্রেম বলতে, কোনো নারীর কথার প্রেমে পড়েছি, কারও লেখা, কারও বা ব্যক্তিত্বের।

এক সুইডিশ লেখিকা আমার চিঠি পড়ে প্রতি উত্তর করেছিলেন, তুমি আমার জন্য একগুচ্ছ কবিতা পাঠিয়েছো। আমি আনন্দিত। তোমার ভালবাসা গ্রহণ করলাম। সেই চিঠি পড়ে আমার ভেতরে ওলট-পালট হয়ে একাকার হলো।

অবশ্য পুরুষের প্রেমে পড়েছি শুধু তার গুণে না, খানিকটা রেইসিস্ট শোনালেও কোনো কোনো পুরুষের রূপে মুগ্ধ হয়ে যে হার্টবিট মিস হয়নি, তা কিন্তু না। আমার হাসির প্রতি দুর্বলতা আছে। যে ছেলের হাসি সুন্দর তার প্রেমে পড়ার বিশেষ কোনো কারণ লাগে না। এই তো একবার এক সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে বারে গিয়েছিলাম আড্ডা দিতে। সেখানে হঠাৎ এক ছেলের দিকে চোখ আটকে গেল। ছেলের হাসিতে অদ্ভুত মায়া ছিল। প্রথমে ভাবলাম বাদ দেই, কিন্তু মন বেচারা কোনো মতেই মানলো না, তাই মস্তিষ্ক পরাজিত হয়ে হৃদয় জিতে গেল। ছেলেটার সামনে গিয়ে বললাম, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, যদি আপত্তি না থাকে।

ছেলে অবাক দৃষ্টিতে বললো, বলো।

আমি লজ্জিত কণ্ঠে বলে ফেললাম, তোমার হাসি খুব সুন্দর। তোমাকে না বলে থাকতে পারলাম না, তাই বলতে এলাম। ছেলে হেসে ফেললো, ওর সাথে থাকা মেয়েটাও হাসলো। সম্ভবত ওর গার্লফ্রেন্ড। আধ ঘণ্টা পরে ঐ ছেলের টেবিল থেকে একটা ড্রিঙ্ক এলো আমার টেবিলে, ওটা ওর ধন্যবাদ গিফট ছিল।

এমন পাগলামি যে আমি কম করি, তা কিন্তু না। কদিন আগে এক লেখকের লেখা পড়ে তাকে ইনবক্স করলাম, আপনাকে অভিনন্দন, খানিকটা সময় হলেও আমাকে বিপদে ফেলার জন্য।

ভদ্রলোক ভয় পেয়ে উত্তর দিলেন, কী বিপদ?

বললাম, আপনার লেখাটা একজন ব্যক্তিত্ববান সুদর্শন পুরুষের মতো আকর্ষণীয়। আমি লেখাটার প্রেমে পড়েছি। ভদ্রলোক যথেষ্ট সেন্সেবল মানুষ, তিনি চমৎকার একটা প্রতি উত্তর করেছিলেন। যেহেতু ওনার অনুমতি নেইনি, তাই উত্তরটা এখানে লিখলাম না।

মন এমনিতেই বহুগামী হয়। এই কারণে মনের স্বাধীনতার পরিধি এতো বেশি। আমি আমার বেশ্যা মনের কাছে খানিকটা ঋণী। ওর কারণে হার্টবিট মিস হবার অনুভূতি কখনো কমে না। একদিন বুড়ো হবো, মনও ক্লান্ত হবে, তখন আর প্রেমে পড়ার অবকাশ হয়তো নাও পেতে পারি।

আমি নিয়মিত প্রেমে পড়ি। বয়স, জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ কিছুই আমাকে প্রভাবিত করে না। ঠিক যৌন আকর্ষণ নয়, স্রেফ তীব্র থেকে তীব্র ভালবাসা বোধ করি। কখনো সাময়িক, কখনো সেটা দীর্ঘ হয়। কখনো এই দীর্ঘ সময় উপভোগ করি, কখনো কষ্টও হয়। ভালবাসা যেখানে আছে সেখানে বিরহ থাকবে না, সে কী করে হয়! আমার ভালবাসারা বেশির ভাগ সময় এক তরফা। কখনো কার ভালবাসা দেখে মুগ্ধ হয়ে থমকে যাই। মাথা নত করে বলি, আমাকে ভালবাসার জন্য ধন্যবাদ। তারপর আপন পথ ধরি।

আমার স্বামীপ্রবর বেশ ভালো করেই জানে আমি কী কী করি। তাই প্রায়ই রসিকতা করে। আমিও মাঝে মাঝে ছোটখাটো থ্রেট দেই, বলি, দেখিস একদিন তোকেও কেউ ছাড়িয়ে যাবে। শুভ হাসে। ও বলে, ঘুড়ি কখনো আকাশ ছাড়ায় না, বড়জোর মেঘের সাথে তার হাসি বিনিময় হয়। তবুও একটু ভয় থাকুক। জানুক, আমাকে জয় করা সহজ না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 5.1K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.1K
    Shares

লেখাটি ১৭,০২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.