জীবন আমাকে ‘মহিলা’ হতে শেখায়নি

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

আমি ছোটবেলায় প্রথম যে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম সেটা ছিল একটি মিশনারি স্কুল। প্রোটেস্টাইন চার্চের পাশে সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী-ই ছিল আমাদের এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এবং তাদের অধিকাংশই আমার বিকেল বেলার খেলার সাথী। তবে স্কুলে আমার সাথী ছিল তারাই, যারা মাঠে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি করে খেলে বেড়াতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার ক্লাসের অনেক মেয়েরই মাঠে খেলার অনুমতি ছিল না বাসা থেকে।

প্রথম স্কুলের প্রথম শিক্ষিকা আর সবার মতো আমার জীবনেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, নামটা আমার কখনই শোনা হয়নি। আমি জানতাম তিনি ম্যাডাম। তিনি অনেক মজার মজার গল্প বলতেন, গান শোনাতেন, কাগজ কাটতে দিতেন, রঙ করতে দিতেন, তেমন কোনো পড়ালেখা স্কুলে করাতেন বলে মনে পড়ছে না, বেশির ভাগ পড়া আমি বাসাতেই শিখে ফেলেছিলাম। আম্মুই আমাকে পড়াতো, তখন আম্মু চাকরি করতো না তো, তাই অফুরন্ত সময় আমাকে লেখাপড়া শেখাবার। স্কুল ছিল আমার কাছে মূল্যবোধ শেখার জায়গা।

মূল্যবোধের কথাটা মাথায় আসলো, কারণ ঐ স্কুলের কথা মনে পড়লেই আমার যে কথাগুলোই মনে পড়ে, তা হলো, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, কীভাবে কথা বলা উচিত, কেন যেখানে-সেখানে থুথু ফেলা উচিত না, কেন অন্যকে কষ্ট দেয়া উচিত না, এসব। কখনো ধর্মীয় গল্পের ছলে, কখনো বা ঈশপের গল্প বলে। ভাবতে ভালো লাগে যে জীবনের প্রথম স্কুলের প্রথম শিক্ষিকার কাছ থেকে আমি কিছু জীবন শিক্ষা নিতে সক্ষম হয়েছিলাম।

কিন্তু খুব বেশিদিন আমার সেই স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি, বছর ঘুরতেই আমাকে ভর্তি করানো হল প্রতিষ্ঠিত এক বাংলা মিডিয়াম স্কুলে। স্কুলের চালচলন আমার প্রথম স্কুলের ঠিক বিপরীত। শিক্ষক-শিক্ষিকারা কথায় কথায় ছাত্র-ছাত্রীদের বকা দেন, রাগ দেখান, মারেনও।

স্কুল আর আকর্ষণীয় থাকলো না আমার কাছে। পড়ার প্রতিও অনাগ্রহ তৈরি হলো। ঐ স্কুলের কোনো শিক্ষকের কথা আমার তেমন মনেই পড়ে না, যদিও পাঁচ বছর পড়েছিলাম আমি সেই স্কুলে। সেই স্কুলের একজন শিক্ষক আবার আমাকে বাসায় এসেও পড়াতেন, বাসায় এসে পড়াতেন বলে উনার কথা অল্প বিস্তর মনে থাকলেও তেমন কোনো শিক্ষণীয় স্মৃতি আমার মনে আসে না। স্কুলের শিক্ষক ছিলেন বলে উনি পরীক্ষার আগে আমাকে যা যা পড়াতেন, পরীক্ষার হলে ঢুকে দেখতাম সেই জিনিসগুলোই এসেছে। সোজা বাংলায় উনি প্রশ্ন ফাঁস করতেন টাকার বিনিময়ে। মনে হয় ব্যাপারটা আব্বু- আম্মু ধরতে পেরেছিলেন এবং তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এতোদিন পর এভাবে উনার কথা মনে পড়াতে খারাপ লাগছে ঠিকই, কিন্তু সেটাই সত্য।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমি আবার স্কুল পরিবর্তন করে চলে আসি ঢাকার নামীদামী স্কুলের একটিতে। এটা আবার শুধুই বালিকা বিদ্যালয় ।

মজার বিষয় হলো, এই যে আমি স্কুল পরিবর্তন করছি, কোথাও কিন্তু কোনো বন্ধু কিনবা বান্ধবী ফেলে আসছি না, কেননা আমার আলাদা করে কোনো বান্ধবী হতোই না। ক্লাসের সবাই আমার বন্ধু – বান্ধবী। আমি সবার সাথেই মিশতাম, মিশতাম বললে ভুল হবে, খেলতাম। আমার কাছে বন্ধু/বান্ধবী ছিল সেই, যে আমার সাথে খেলে। আমার সাথে শুধু খেলতো না শেষ বেঞ্চে বসা বড় মেয়েগুলো। ওরা বয়সে অন্যদের থেকে দুই-তিন বছরের বড় ছিল বলেই হয়তো খেলতো না। ওরা থাকতো চুপচাপ, নিজেদের নিয়ে।

যাই হোক নতুন স্কুলে এসে হঠাৎ করেই যেন জানতে পারলাম আমি মেয়ে। কারন আমার আগের স্কুল কো-এডুকেশন হলেও মেয়ে-ছেলের পার্থক্যটা আমি সেভাবে বুঝিনি, যতোটা না আমি বুঝিছি এখানে এসে। মেয়েগুলো যেন একটু বেশিই মেয়েলি। তারা স্কুলে বসেই সাজুগুজু করে, জামা কাপড়ের গল্প করে, কেউ টিফিনে খেলে না, সিনেমার গল্প করে, বয়ফ্রেন্ডের গল্প করে আরো নানা আজব আজব গল্প।

আমি পড়লাম দারুণ বিপদে। হঠাৎ করে খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মন খারাপ থাকতো বেশির ভাগ সময়। কোনভাবেই কারো সাথে বন্ধুত্ব হচ্ছে না, শেষমেশ আমার গল্পের বই পড়ার নেশা হলো, শুরু হলো এর ওর কাছ থেকে গল্পের বই ধার করে পড়া। বাসার গল্পের বইগুলোও পড়া শুরু করালাম। আব্বু পড়তো ‘মাসুদ রানা’, আর আম্মু ‘তসলিমা নাসরিন’। ফলে সেই বয়সেই ভিন্ন ধারার দুই ধরনের বই পড়ার অভ্যেস হলো। বুঝলাম, মাসুদ রানা একটু বেশিই পুরুষ আর তসলিমা নাসরিনের নারী চরিত্রগুলো একটু বেশিই নারী।

এভাবে স্কুল পেরিয়ে কলেজে পদার্পণ। আবার মিশনারি! তবে এখানে মেয়েরা রীতিমতো মহিলা, কারণ আমার কলেজটাই যে মহিলা কলেজ। মহিলা শব্দটি খুবই অপমানজনক আমার কাছে। মহল থেকে মহিলা শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ যে মহলে থাকে। কেমন যেন বন্দিদশা, দম বন্ধ করা! তবু ঢাকার নামি-দামি নারীদের কলেজগুলোকে তখনও মহিলা কলেজই বলা হতো। আবার আমি একা হয়ে গেলাম, এবার এইচএসসি-র বিরাট সিলেবাস আমাকে গল্পের বই পড়ারও ফুরসত দিল না। ক্লাস শেষে ল্যাব এর কাজ, কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি, বাসায় এসে পড়ার টাইম বের করাই বিরাট ব্যাপার।

তবে একটাই আনন্দের জায়গা ছিল কলেজে,সেটা হলো ছোটবেলার স্মৃতিচারণ। সেই মূল্যবোধ শিক্ষা, ন্যায়-অন্যায়, জীবনের ভুল-ভ্রান্তি; সেই সকল জীবন শিক্ষা আবার আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন কলেজের সিস্টাররা। বেশিরভাগ মেয়েদেরই বোধ করি সে কথা শুনতে ভাল লাগতো না, কিন্তু আমার বেশ লাগতো। কারণ পাঠ্য- পুস্তকের পড়া আমি নিজেই পড়ে নিতে পারি, কিন্তু জীবনশিক্ষা (?) সেটা যেহেতু পরিবার থেকে আমাদের শেখায় না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই শেষ ভরসা।

নতুন করে নিজ জীবনের আদর্শ তৈরি করেছিলাম তখন। সমবয়সী মেয়েগুলো যখন মহিলা হতে ব্যস্ত, আমি তখন সমাজ নিয়ে ভেবেছি, সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছি। আর তাই একা হয়েছি, আরো একা। পরবর্তীতে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একা থাকিনি, অনেক অ-মহিলাদের সাথে দেখা হয়েছে, অনেক অ-পুরুষদের সাথেও, (যারা মহিলা কিংবা পুরুষ কম, মানুষ বেশি) তবে তথাকথিত মহিলাদের সাথে আমার আর বন্ধুত্ব করা হয়নি, ঠিক তেমনি তাদের সাথেও বন্ধুত্ব হয়নি, যারা মহিলা পছন্দ করে। কারণ আমি অ-মহিলাই থেকে গেছি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 536
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    536
    Shares

লেখাটি ১,৮৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.