“শয়তান নারীবাদীগুলা” কেন তুচ্ছ বিষয়ে নিষ্পাপ “জনগণরে” বিব্রত করে!

0

বৈশালী রহমান:

ইদানিং ফেসবুকে কম থাকতে চাই। কম লিখি, কম তর্কে জড়াই, কম গ্যাঞ্জাম করি। মূল কারণ হলো ব্যস্ততা। থিসিসের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা আর প্রচণ্ড চাপের মধ্যে দিয়ে যাঁরা গিয়েছেন, শুধু তাঁরাই বলতে পারবেন এই সময়ের কষ্টটা ঠিক কতোটুকু তীব্র। যাহোক, বাদ দেই দু:খের কথা। সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে আসি।

সম্প্রতি আমার কিছু ভাই বেরাদর, এবং কিছু বোন, ‘ভুন’ এবং ‘ভোন’দের মুখে এক নতুন “নারীবাদীয়” বাণী আমাকে কিছু কথা বলতে বাধ্য করেছে। সেই “নারীবাদীয়” বাণীটি হলো, নারীবাদীরা “ছোটোখাটো” বিষয়ে, যেগুলো আসলে নির্যাতন না, সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে নাকি নারীর প্রতি চলমান বড়ো বড়ো নির্যাতনে মাথা ঘামাতে পারে না। এইসব মহান বাণীতে যদি নির্যাতন শব্দটা না আসতো, তবে হয়তো আমি কোনো কথাই বলতাম না। কিন্তু নির্যাতন শব্দটা যখন এসেছে, তখন মুখ ফসকে একটা প্রশ্ন বের হয়েই যায়, “নারীর প্রতি চলমান নির্যাতনের কোনটা কম, কোনটা বেশি, কোনটা নিয়ে কথা বলা যাবে, কোনটা নিয়ে বলা যাবে না, এইটা ঠিক করলো কোন কুতুবে?”

প্রথমেই আসি নির্যাতন প্রসঙ্গে। অতীব দু:খের সাথে বলতে হয়, আমাদের দেশে একমাত্র মাইর ছাড়া আর নারীর প্রতি চলমান অন্য কোনো নির্যাতনকেই আসলে নির্যাতন বলে ধরা হয় না। তাও মাইরটাকেও ধর্মীয় এবং সামাজিক সিস্টেমের মাধ্যমে বেশ কিছুটা বৈধতা দেওয়া হয়েছে বলে অনেকে এটাকেও নির্যাতন হিসেবে ধরে না। একমাত্র নারী নির্যাতন আইনে নারীর গায়ে হাত তুললে কঠিন শাস্তির ভয় আছে বলে আর মাইরের দাগটা চোখে দেখা যায় বলে সুমহান মানবতাবাদীরা এবং “অনারীবাদী” ভাই বেরাদর, বোন এবং ভোনেরা এই জিনিসটার বিরুদ্ধে যৎকিঞ্চিৎ প্রতিবাদ করে থাকেন এবং আশা করেন যে নারীবাদীরাও তাদের “চিল্লাফাল্লা” শুধু মাইর এবং ধর্ষণের প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।

কিন্তু এই বেকুব নারীবাদীর মনে আবার কিছু প্রশ্ন আঁকুপাকু করে। আচ্ছা, যে নির্যাতন শরীরে দাগ ফেলে না, ওইটা কি নির্যাতন না? ধরেন, সারাজীবন একটা মেয়ে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে আসলো, হুট করে কোত্থেকে এক পুরুষ এসে তাকে বললো, “আজ থেকে তোমার জীবন রান্নাঘর, শোওয়ার ঘর, আমার বাপ মায়ের কামলা গিরি, আর আমাদের সন্তানদের দেখভালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এর বদলে তোমারে জামাকাপড়, গয়নাগাঁটি, খানা দানা দেওয়া হবে।”

এই যে একটা পুরুষ শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার সুবিধার কারণে নারীটির জীবনের সকল স্বপ্নের ওপর করাত চালিয়ে দিলো, সম্ভাবনাময় একটা মেয়েরে চোখের জলে তার জীবনের সকল সম্ভাবনা বিসর্জন দিতে হলো, এটা কি নির্যাতন না? মেয়েটির গায়ে যেহেতু আঘাত নাই, সেহেতু এটা নিয়ে যদি নারীবাদীরা নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবি নিয়ে আপনাদের ভাষায় “চিল্লাফাল্লা” করে, আপনাদের এত আঁতে ঘা লাগে কেন? আপনাদের এই “রূপ” এর রহস্য কী?

দ্বিতীয়ত, নারীবাদীরা পোশাকের স্বাধীনতার কথা বললে নাকি অনেক “গুরুত্বপূর্ণ” আন্দোলন ধামাচাপা পড়ে যায়। হা হা হা হা হা হা! তো, তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে জগতের যতো “গুরুত্বপূর্ণ” আন্দোলনকে সাইড দেওয়া হলো নারীবাদীদের ঠেকা? জগতে আপনারা আসছেন কী করতে? হাঁসের ডিমে তা দিয়া বাচ্চা ফুটাইতে? তা, সেই “গুরুত্বপূর্ণ” বিষয়গুলাতেও তো আপনাদের চাইতে নারীবাদীরাই নড়াচড়া করে বেশি। ধর্ষণের খবরে অবশ্য আপনাদের কিছুটা আওয়াজ দিতে দেখা যায়, তবে ওইখানেও কিন্তু আছে। ধর্ষণটা যদি কেউ বিবাহ চুক্তির মাধ্যমে করে সেইখানে কিন্তু আপনারা টুঁ শব্দ করেন না। কেননা, ওই ধর্ষণ তো “বৈধ” লোকে করসে, “স্বামী”র সম্পূর্ণ অধিকার আছে স্ত্রীকে ধর্ষণ করার।

এক্ষেত্রে নারীবাদীদের সাথে আপনাদের পার্থক্য হলো, এই যে আমরা নারীবাদীরা ম্যারিটাল রেপ নিয়েও কথা বলি। একটা কাগজে সাইন করে দুইটা শব্দ তোতাপাখির মতো মুখস্থ বলে গেলেই যে স্ত্রীকে ধর্ষণের অধিকার পাওয়া যায় না, তার অপরাধও যে একজন ধর্ষকের সমানই, একবিন্দু কম নয়, এই কথা বলার জন্যও এই “তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিল্লাফাল্লা” করা নারীবাদীদেরই লাগে। “মহা গুরুত্বপূর্ণ” পীর সাহেব এবং সাহেবাইনরা তো তখন শপিং এর সাথে ম্যারিটাল রেপের ট্রলের খিচুড়ি বানায়ে মাছ ভাজি সহকারে “চেটে চেটে খাইতে” ব্যস্ত থাকেন। এবং এইখানেই সেই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চলে আসে ভাই এবং বোনসব, “সমস্যা কোথায়”।

ধর্ষণ নিয়ে আন্দোলন করবো, প্রতিবাদ করবো ঠিক আছে। কিন্তু সেই সাথে যেটারে আমরা স্বাধীন দেশ বলি, সেখানে আমাদের নিজের পছন্দমতো পোশাক পরার স্বাধীনতা থাকবে না, আমার ওড়না বুকে থাকবে, গলায় থাকবে নাকি একেবারেই থাকবে না, সেটা নিয়ে অন্যের নাক গলানো, শুয়োরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ, এসবের প্রতিবাদ করলে সমস্যা কোথায়? মেয়েরা নিজ ইচ্ছায় তাদের পোশাকটা, সাজটা পর্যন্ত নির্বাচন করতে পারবে না, তথাকথিত “শালীন” পোশাক না পরার অপরাধে তাদের যা তা বলা হবে, এটা কি নির্যাতন নয়? এটা নিয়ে নারীবাদীরা কথা বললে কাদের পশ্চাদ্দেশ জ্বলে, এটা বোঝা কি খুব কঠিন?

একটা মেয়েকে তার স্বামী শ্বশুরবাড়ির লোকজন দ্বারা দৈহিক নির্যাতনের শিকার হলে তো প্রতিবাদ হবেই, সেই সাথে স্বামী এবং তার বাপ মায়ের সেবার দায় চাপিয়ে দিয়ে তার লেখাপড়া এবং কেরিয়ার বন্ধ করার, মেয়েটির নিজ বাবা মায়ের সাথে, বন্ধুবান্ধবদের সাথে সময় কাটানোতে বাধা দেওয়ার, কেনা বাঁদীর মতো তার জীবনটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে দেওয়ার, নিজের বাপ মা ভুলে গিয়ে অন্য পরিবারের মেয়ে হয়ে ওঠার দায় চাপানো, এগুলোর প্রতিবাদ করা যাবে না কেন? এটা কি নির্যাতন নয়?

ইন ফ্যাক্ট, মেয়েদের যে বিয়ের পর নিজের বাপ মা, শৈশবের পরিমণ্ডল ছেড়ে পুরুষের পরিবারে, পুরুষের বাপ মায়ের সাথে গিয়ে থাকতে হয়, এই বিশ্রী পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমই তো বরং সমস্ত নির্যাতনের মূল কারণ। নিজের কোর্টে বল পেলে বাড়ি না মেরে আত্মসম্বরণ করার মতো উদারতা কয় জনেরই বা থাকে।

আরে, চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটা গাছকেও তো আমরা এক মাটি থেকে উপড়িয়ে আরেক মাটিতে রাখি না। সেই জায়গায় চব্বিশ পঁচিশ বছরের একটা মেয়েকে কতো অবলীলায় আমরা তার নিজের পরিবার থেকে তুলে নিয়ে অন্য পরিবারে পুঁতে দিই। নিজের পরিবার ভুলে অন্য পরিবারকে আপন করতে বলি। কই, পুরুষের তো এই দায় নেই? এটা কি নির্যাতন নয়? এটা কি বৈষম্য নয়?

এখন এই বিষয়টা নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও শুনতে হয় নারীবাদীরা কেন এইসব “তুচ্ছ” “অপ্রাসঙ্গিক” বিষয় নিয়ে কথা বলছে! অবশ্য পুরুষের যদি বাপ মা ছেড়ে শুধুমাত্র বউয়ের সাথেও ভিন্ন পরিবারে থাকা লাগে, তখন আর বিষয়টা এত তুচ্ছও থাকে না। তখন “যে বাপ মা জন্ম দিছে, লালন পালন করসে, তাদের ছেড়ে কেমনে বউ নিয়া থাকো”, এইসব ইমোশনাল অত্যাচারও চলে আসে। যেন মেয়েরা মায়ের পেটে জন্ম নেয় না, শাশুড়ির পেটে জন্ম নেয়। যেন মা বাপে তাদের লালন পালন করে না। শ্বশুর শাশুড়ি তাদের লালন পালন করে, বুকের দুধ খাওয়ায়, গু মুত কাচায়, অ আ ক খ থেকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত সাথে সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকে, তাই তাদেরই ঠেকা বাপ মায়েরে পর করে অন্যের বাপ মারে আপন করা।

বিয়ের পর দুইটা সুস্থ স্বাভাবিক নারী পুরুষ নিজেরা সংসার করতে চাইলে সমাজ মোড়লদের কাছে পুরুষটা হয়ে যায় ভেড়া, আর মেয়েটা হয়ে যায় কামরূপ কামাখ্যার কুহকিনী, যার আর খেয়ে দেয়ে কাম কাজ নাই বলে মা বাপের চিরকালীন ল্যাদা বাচ্চাটাকে মন্ত্র পড়ে ভেড়া বানিয়ে নিয়ে গেছে। এইগুলা বৈষম্য মনে হয় না আপনাদের কাছে? নির্যাতন মনে হয় না?

যাহোক, আমি মূর্খ নাদান, আপনাদের মতো জ্ঞানের জাহাজ নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া দূরে থাক, জ্ঞানসমুদ্রের পাড়ে গিয়া নুড়ি কুড়ানোর জন্য একটা সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাড়া করার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারি নাই। কিন্তু আমার সামান্য জ্ঞানে আমি এইটুকু অন্তত বুঝি, সমাজে যদি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমতা বিধান করতে হয়,তবে নারীর প্রতি শুধু নারী বলেই যেসব নির্যাতন, বৈষম্য চালানো হয়, তার প্রত্যেকটির বিরুদ্ধেই কথা বলতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে।

ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতা নিয়ে যেমন কথা বলতে হবে, ঠিক তেমনি কথা বলতে হবে যৌন স্বাধীনতা নিয়েও। নারীর আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে যেমন কথা বলতে হবে, ঠিক তেমনি কথা বলতে হবে তার পোশাকের স্বাধীনতা নিয়েও। পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে যেমন কথা বলতে হবে, ঠিক তেমনি শুধু নারীকেই কেন মাঝখান থেকে ভিন্ন পরিবারে, ভিন্ন পরিবেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হবে, শুধু নারীকেই কেন সংসার সন্তানের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা, কেরিয়ার স্যাক্রিফাইস করতে হবে, এই বিষয়গুলোও আলোচনার টেবিলে উঠে আসা জরুরি।

কারণ কোনো নির্যাতন, কোনো বৈষম্যই তুচ্ছ নয়। ছোটো ছোটো বালুকণাই মহাদেশ তৈরি করে। বিন্দু বিন্দু জলই তৈরি করে অতল মহাসাগর। আপাতদৃষ্টিতে “তুচ্ছ” কোনো নির্যাতন, বৈষম্যের মধ্যেই নিহিত থাকে আপনাদের মতে “বড়ো” এবং “গুরুত্বপূর্ণ” বৈষম্য এবং নির্যাতনের মূল কারণ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 354
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    354
    Shares

লেখাটি ৭৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.