“দু‌:শ্চিন্তা নয়, বরং চিন্তাটা খুব জরুরি”

0

হেলেনা আফরোজ:

ঘুমা‌তে যাওয়া মা‌নে এক ধর‌নের মারা যাওয়া, অামরা সবাই এটা ভাল ক‌রে জা‌নি, যে মানুষ একবার মারা যায় সে কখ‌নো ফির‌বে না অার।

য‌দিও এটাও স‌ত্যি যে প্র‌তি‌দিন সকা‌লে যখন অামরা ঘুম থে‌কে জে‌গে উঠ‌ছি, তখন কিন্তুু মৃত অবস্থা থে‌কেই বে‌ঁচে উঠ‌‌ছি একবার। একটা নতুন জীবন, একটা নতুন সকাল, একটা নতুন দিন। অাব‌ার অ‌নে‌কেরই হয়ত অার জে‌গে ওঠার সৌভাগ্য হ‌চ্ছে না নতুন একটা সূর্যোদয় দেখার জন্য।

প্র‌তিটা সকালই ঠিক একইরকমভা‌বে অাস‌ছে অামাদের জীব‌নে। এই নিয়‌মের কোনো ব্যাতিক্রম নেই, একটু য‌দি ভালোভা‌বে চিন্তা ক‌রেন, তাহ‌লেই বুঝ‌তে পার‌বেন প্র‌তিটা সকা‌লে জে‌গে ওঠার সা‌থে সা‌থে অামা‌দের কতখা‌নি খু‌শি অার কতটা কৃতজ্ঞতা বোধ ম‌নে নি‌য়ে থাকা উ‌চিত। হয়তো কিছুই না, শুধুমাত্র অাপ‌নি এখনও বেঁচে অা‌ছেন সেইজন্য।

ব্যাপারটা একটু কষ্টজনক হ‌লেও স‌ত্যি যে, অামরা বোধহয় এরকম খুব কম মানুষ‌কেই দে‌খি যারা সকালটা শুরু ক‌রে জীবনটা‌কে অা‌রেকবার নতুন ক‌রে ফি‌রে পাবার অানন্দ নি‌য়ে, স‌ত্যিকা‌রের প্রশা‌ন্তি অার কৃতজ্ঞতা বোধ নি‌য়ে।

বরং যে দৃশ্যটা খুব কমন তা হলো, কেউ কেউ হয়‌তো সকালটা শুরু করে “এ্যই অামার চা কই” কাউ‌কে এরকম একটা ঝা‌ড়ি দি‌য়ে। অাবার কেউ কেউ এতোটাই বির‌ক্তি নি‌য়ে দি‌নের শুরুটা ক‌রে যেন তারা ঘুম থেকে জে‌গে উঠে পৃ‌থিবী‌কেই একরকম দয়া করে‌ছে। রা‌জ্যের বির‌ক্তি অার দু‌শ্চিন্তা ভর ক‌রে থা‌কে চো‌খে মু‌খে।

এত‌োকিছু বলার পেছ‌নে উ‌দ্দেশ্য হলো, অামরা য‌দি খুব ভালো ক‌রে একটু চিন্তা ক‌রে দে‌খি জীব‌নের এই অতি প‌রি‌চিত অার সহজ ব্যাপারগু‌লো নি‌য়ে, তাহ‌লে দু:শ্চিন্তা করার মতো কোন কারণই বোধহয় খু‌ঁজে পাবো না।

এমন‌কি শুধু সহজ কেন, বরং কোনো জ‌টিল বিষয় নি‌য়েও দু‌:শ্চিন্তা ক‌রে অাপ‌নি বিষয়টা‌কে অা‌রেও খা‌নিকটা জটিলই ক‌রে ফেল‌বেন, স‌ত্যিকা‌রের সমাধান খুঁজ‌তে হ‌লে অাপনা‌কে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর‌তে হ‌বে।
অারও একটা কথা, অাপনা‌কে ম‌নে প্রা‌ণে বিশ্বাস কর‌তে হ‌বে যে কোনো সমস্যাই তার সমাধা‌নের চাই‌তে বড় না।
অার দু‌:শ্চিন্তা ক‌রে অাপ‌নি যে শুধু নি‌জের সুন্দর সময়টা‌কে নষ্ট কর‌ছেন, তা না, অা‌শেপা‌শের প‌রি‌বেশটা‌কেও নষ্ট কর‌ছেন সমানভা‌বে। অাপনার পা‌শের মানুষটা অাপনার কাছ থে‌কে কোনো ভালো শক্তি তো পা‌চ্ছেই না, বরং অাপনার দুঃখ‌বিলাসী ম‌নোভাব দে‌খে তার নি‌জের ম‌নোবলটাও নষ্ট হ‌চ্ছে।

অাপ‌নি য‌দি সৃষ্টিকর্তা‌তে ‌বিশ্বাস করেন, ত‌বে নিশ্চয় অাপ‌নি জা‌নেন, যে এই পৃ‌থিবীটা বা অাপনাকে অামা‌কে সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছে, তার নিশ্চয়ই কোনো উ‌দ্দেশ্য অা‌ছে। কী সেই উ‌দ্দেশ্য, সেটা ওই গ‌বেষকই একমাত্র জা‌নেন, অাপ‌নি অা‌মি এখা‌নে গ‌বেষণার স্যাম্পল মাত্র।
সুতরাং অাপনার উ‌চিত অাপনার নি‌জের রোলটা নি‌য়ে সুন্দরভা‌বে চিন্তা ক‌রে সেটা‌কে নিখুঁতভা‌বে ‌প্লে করা।

অার একটু ভালো ক‌রে চিন্তা কর‌লে অাপ‌নি প্রথ‌মেই যে বিষয়টা বু‌ঝ‌তে পার‌বেন তা হলো, এখা‌নে অাপনার দু‌:শ্চিন্তা করা‌তে না কোনকিছু নতুন ক‌রে তৈ‌রি হ‌চ্ছে, না কোনকিছু থে‌মে থাক‌ছে। সব‌কিছুই চল‌ছে তার অাপন অার নিজস্ব গ‌তি‌তে, পি‌ছি‌য়ে যা‌চ্ছেন শুধু অাপ‌নি নি‌জে। যে সময়টা অাপ‌নি দু‌:শ্চিন্তা ক‌রে নষ্ট কর‌ছেন, সেই সময়টা অ‌নেক সুন্দরভা‌বে কাটা‌তে পার‌তেন। কোনো ভালো কা‌জেও লাগা‌তে পার‌তেন, হয়‌তো নি‌জের জন্য বা অন্য কা‌রো জন্য।

দু‌:শ্চিন্তা যে‌হেতু একটা নে‌গে‌টিভ ই‌মোশন অার একটা নে‌গে‌টিভ ই‌মোশন দি‌য়ে অাপ‌নি কখ‌নো ভাল কোন ফলাফল বা সিদ্ধা‌ন্তে পৌছা‌তে পার‌বেন না।

অামরা বে‌শিরভাগ মানুষই কোনো কথা বা ঘটনার একটা নে‌গে‌টিভ মা‌নে খুব দ্রুত বের করে ফেল‌তে পা‌রি কোন রকম চিন্তা ভাবনা ছাড়াই। অা‌মি‌ বোধহয় হা‌তে গোনা ক‌য়েকজন মানুষ‌কে দে‌খে‌ছি যারা স‌ত্যিই চিন্তা ক‌রে এবং কোন বিষয় যতই জ‌টিল হোক না কেন, সেটা‌কে প‌জি‌টিভ‌লি ট্রান্স‌লেট করার ক্ষমতা অা‌ছে তা‌দের।

কিছু‌দিন অা‌গে অামার এক বন্ধুর সা‌থে যখন অামার ক্যান্সা‌রের বিষয়টা শেয়ার কর‌ছিলাম তার প্রথম মন্তব্যটাই ছিল যে, তাহ‌লে অাপ‌নি অার কখ‌নো মা হ‌তে পার‌বেন না। কথাটা শু‌নে সে‌দিন খ‌ুব জো‌রে একটা ধাক্কা লে‌গে‌ছিল স‌ত্যি। না ক‌ষ্টের না, বরং প্রচণ্ড বিস্ময়ের। প্রথমত কষ্টের না এই জন্য কারণ কথাটার কোনো ভি‌ত্তি নেই। যে কথাটা সায়েন্স, অার্টস, বা কমার্স কেউ বল‌ছে না, শুধুমাত্র অাপ‌নিই ভাব‌ছেন, সেটা ভি‌ত্তিহীন কথাই।

‌দ্বিতীয়ত অাম‌ার বন্ধু‌টি খুব ভালো একজন গ‌বেষক এবং গ‌বেষণার বিষয়ও সায়েন্স। সুতরাং তার কাছ থে‌কে এরকম ভি‌ত্তিহীন একটা কথা নিশ্চয় অাশা করা যায় না।

অা‌মি অামার বন্ধুর প্র‌তি শ্রদ্ধা এবং সম্মান রে‌খেই বল‌ছি, সে মন্তব্যটা ক‌রে‌ছে শুধুমাত্র দু‌:শ্চিন্তা থে‌কে। অার ওই যে কোন ঘটনার একটা নে‌গে‌টিভ মি‌নিং সবার অা‌গে অামা‌দের মাথায় চ‌লে অা‌সে। অার দু‌:শ্চিন্তা একধর‌নের মান‌সিক ব্যা‌ধিও ব‌টে, অাপ‌নি একবার এ‌তে অাক্রান্ত হ‌লে সেখান থে‌কে বের হওয়াটা একটু ক‌ষ্টেরই হ‌বে বোধহয়। কিন্তুু পার‌বেন য‌দি অাপ‌নি চান।

অামার ম‌নে হয় এর একটা সমাধান হ‌তে পা‌রে যে অাপ‌নি য‌দি নি‌জের প্র‌তি বিশ্বাসটা অা‌রো একটু মজবুত ক‌রেন। শত ব্যস্ততার মা‌ঝেও য‌দি একটু সময় বের ক‌রে বর্তমান সময়টা নি‌য়ে ভা‌বেন, অতীত বা ভ‌বিষ্যৎ নি‌য়ে নয়।
তাহ‌লে অাপ‌নি বুঝ‌তে পার‌বেন কতটা পথ অাপ‌নি অল‌রে‌ডি পা‌ড়ি দি‌য়ে এ‌সে‌ছেন, নি‌জের অর্জনগু‌লো দেখ‌তে পা‌বেন।

অার এ‌তেও য‌দি অাপ‌নি নি‌জের অা‌শির্বাদগু‌লো খু‌ঁজে না পান, তাহ‌লে যে মানুষগু‌লো অাপন‌ার চাই‌তে নিচে অা‌ছে, বা অাপনার চাইতে খারাপ অবস্থায় অা‌ছে, তা‌দের দি‌কে তাকান, তাহ‌লে অাপনার নি‌জের অবস্থানটা বুঝ‌তে সু‌বিধা হ‌বে।

অামার মা সবসময় ব‌লেন, যখন খুব কষ্ট লাগ‌বে, খুব দু‌:শ্চিন্তা ভর কর‌বে, সবসময় নি‌চের দি‌কে তাকা‌বি, তাহ‌লে নি‌জের কষ্ট বা টেনশনগু‌লো অ‌নেক ছোট ম‌নে হ‌বে।

অার দু‌:শ্চিন্তা করার অা‌গে অন্তত একবার ভে‌বে দেখা উ‌চিত, যে বিষয়টা নি‌য়ে এতোটা দু‌:শ্চিন্তাগ্রস্ত হ‌চ্ছেন অাপ‌নি, সেটা অাস‌লে কতোটা যু‌ক্তিসঙ্গত, বা সেটা নি‌য়ে দু‌:শ্চিন্তা করার মতো কোনো কারণ অা‌ছে কিনা! যেমন অাপ‌নি য‌দি একজন ছে‌লে মানুষ হোন, তাহ‌লে অাপনার প্রেগ‌নেন্ট হ‌য়ে যাওয়া নি‌য়ে ভয় বা দু‌:শ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

অার ওই যে বললাম প্রায় সবটাই অাপনার নি‌জের হা‌তে। অাপ‌নি য‌দি মাথার ম‌ধ্যে সারাক্ষণ দু‌:শ্চিন্তার পাহাড় অার কা‌নের ম‌ধ্যে “অা‌মি কষ্ট পে‌তে ভালবা‌সি” টাইপ সুর বাজা‌তে থা‌কেন, তাহ‌লে তো অাপ‌নি কষ্ট‌কে একরকম জামাই আদরে ডেকে নিয়েই এলেন।

অামা‌দের স‌ত্যিই উ‌চিত হাজা‌রও জ‌টিলতার মা‌ঝে নি‌জের জীবনটাকে যতটা সম্ভব সহজ করা। একটাই তো জীবন। অা‌মি বল‌ছি না যে অামার দেখানো পথটাই সঠিক, কিন্তু এটা একটা সম্ভাব্য পথ, কাজেই অাপ‌নি চিন্তা ক‌রে দেখ‌তে পা‌রেন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 214
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    214
    Shares

লেখাটি ৬৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.