একজন প্রকৃত নারীবাদী পুরুষ

0

তামান্না ইসলাম:

ট্যাক্সিতে উঠেছি অনেক টেনশন নিয়ে। বান্দরবন থেকে চিটাগাং এয়ারপোর্টে যাব। ফ্লাইট দুপুর বারটায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার দেরি করে এসেছে প্রায় আধা ঘণ্টা। রাস্তায় অনেক কুয়াশা ছিল এই অজুহাতে। কথা সত্য, তাই রাগ করতে পারছি না। আশার কথা, কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। কিন্তু বেলা বাড়লে জ্যামও বাড়বে। ফ্লাইট মিস করার সম্ভাবনা আছে। টেনশনটা সে কারণেই।

আমি ট্যাক্সিতে উঠে মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। তাছাড়া মানুষের সম্পর্কে জানা আমার একটা প্রিয় অভ্যাস। একেকটা মানুষের জীবন একেকটা গল্প। এই অজানা গল্পগুলো জীবন সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি কত যে পাল্টে দিয়েছে, সেটা কেবল আমিই জানি।

গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, নাম তার মোহাম্মাদ বেলাল। আদি নিবাস কুমিল্লা। যদিও তার বেড়ে ওঠা, সংসার সবই চিটাগাঙে। ছিল চিটাগাং শহরে, ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা করছিল। অসুস্থতার কারণে শহুরে জীবন চালাতে পারেনি। তাই গ্রামে ফেরত এসেছে।

দেখা গেল, পাকে চক্রে সেই গ্রামে আমার নানার বাড়ির দিকের কিছু আত্মীয় স্বজনও থাকে। আমি বহুবার গিয়েছি ওখানে। অত্যন্ত শিক্ষিত গ্রাম, এবং অবস্থাপন্ন। বাইরে থেকে দেখে ছোটবেলা আমার তাই মনে হত। দেখলাম এগুলো সত্য হলেও সামাজিক চিত্রটি অনেক ভিন্ন।

‘আপা, গ্রামের একটা জিনিস আমার ভাল লাগে না, শীতের সময় মেয়ের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি পিঠা পাঠাতে হয়। বুড়া বুড়া নারীদেরও মাফ নাই। তা না হলে শাশুড়ি, ননদ, পাড়া প্রতিবেশী নারীরা কথা শোনায়। বছরের পর বছর এই কাজ করা মেয়ের বাপের বাড়ির জন্য অনেক কষ্ট হয়ে যায়।’ বেলালের কথায় চিন্তা করলাম, আমিও চিটাগাঙের এসব আদিখ্যাতা রেওয়াজ দেখেছি। শহরেও শুনেছি, ট্রাক দিয়ে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে গরুর রান, ইফতারি, শীতের পিঠা এসব পাঠানো। একজন বিবাহিত পুরুষ যার বেড়ে ওঠা চিটাগাঙে তার এই উপলব্ধি আমাকে মুগ্ধ করেছে।

এর পরে কথা উঠলো যৌতুক নিয়ে। যুবক ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে টাকা পয়সা জমিয়ে দেশে বিয়ে করতে আসে। যথেষ্ট অর্থসঙ্গতি থাকার পরও নিয়ম হচ্ছে মেয়ের বাড়ি থেকে ফার্নিচার বিশেষ করে নব দম্পতির জন্য খাট দিতে হবে। কেউ এই নিয়মকে অস্বাভাবিক ভাবে না। এবং এভাবেই চলছে যুগ যুগ ধরে। বেলালের এটা খুব খারাপ লাগে। সে তার বন্ধু স্থানীয় যুবকদেরকে বিয়ের আগে এটা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে।

‘এতোদিন কাজ করে পয়সা জমিয়ে যদি তোর খাট কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে এখনও তোর বিয়ের সময় হয় নাই, আবার কাজে ফেরত যা।’ অনেক যুবকেরই এতে টনক নড়েছে। বাধ সেধেছে তাদের মুরুব্বিরা। ‘বেলাইল্লার সাথে মিশবি না, তোদের মাথা নষ্ট করছে।’ কিন্তু জেদি বেলাইল্লা ঠিকই লেগে থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত কয়েকটা যৌতুকবিহীন বিয়ে ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। হোক না হয় সে কারও কারও চক্ষুশূল, কিন্তু সে তো কিছু ভালো কাজ করতে পেরেছে।

এর পরের ঘটনা আরও করুণ।

এক মহিলার স্বামী প্রবাসী। মাঝে মাঝে আসে। তার সঙ্গে থাকেন শাশুড়ি। ছেলের বউয়ের সাথে শাশুড়ির সম্পর্ক ভালো না। মহিলার বাচ্চাও আছে। একবার স্বামী বিদেশ থেকে আসার পরে তার শাশুড়ি ছেলের কাছে ছেলের বউয়ের নামে বিভিন্ন ধরনের কুৎসা রটায়। বানিয়ে বানিয়ে চরিত্র নিয়েও বিভিন্ন ধরনের খারাপ মন্তব্য করে। রগচটা স্বামী অভিযোগের কোনরকম সত্যতা যাচাই না করে কাল বিলম্ব না করে স্ত্রীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেদম মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়, মহিলা অজ্ঞান হয়ে যায়। অথচ গ্রামের কেউ কখনো ওই নারীকে কোনো অনৈতিক কিছুতে লিপ্ত হতে দেখে নাই বা শোনে নাই।

বেলাল এই ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। তার মতে কোনো কারণেই একজন পুরুষ একজন নারীর গায়ে হাত তুলতে পারে না। কিন্তু তার গ্রামের ওই পুরুষটিকে এটা বোঝানো সম্ভব নয়। তাই সে অন্য পথ নেয়। সে তাকে যেয়ে বলে, ‘দেখ, মানুষ অন্যায় করলে আল্লাহ পর্যন্ত মাফ করে দেয়। তুই কী আল্লাহর চেয়েও বড় হলি যে ওকে মাফ করতে পারলি না, এভাবে মারলি? আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই সঠিকভাবে জানিসও না এই অন্যায় সে আসলেই করেছে কিনা! ‘ তার হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত এদের মীমাংসা হয় এবং স্বামীটি রাজি হয় যে সে আর কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত দেবে না।

সর্বশেষ ঘটনাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। ওই গ্রামে এক হিন্দু কবিরাজ ছিল। সে বিভিন্ন ধরেনের জাদু মন্ত্র, রোগের চিকিৎসা দিত গ্রামের মানুষকে। বিপুল পরিমাণ দক্ষিণা পেত। বিশেষ করে নারী রোগী তার বিশেষ পছন্দ। এদেরকে বিভিন্ন ভাবে চিকিৎসার নামে নানাভাবে গায়ে হাত-টাত দেওয়া ছিল তার প্রধান ধান্ধা। বেলাল এসবে বিশ্বাস করে না। সে নাস্তিক না, ধর্মে তার বিশ্বাস আছে। তবে যে কোনো ধর্মগুরুর কাছ থেকে এই সব ছু মন্ত্রে তার বিশ্বাস নেই। তাছাড়া মেয়েদের সাথে এই আচরণ তার ঘোরতর অন্যায় মনে হয়।

কিন্তু এই কবিরাজ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। গ্রামে তার বিশাল প্রতিপত্তি, তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস কারও নাই। কবিরাজের জারিজুরি ফাঁস করার লক্ষ্যে নিজের এক শারীরিক সমস্যা নিয়ে সে কবিরাজের কাছে হাজির হয়। বেলালের স্বভাব কবিরাজেরও জানা ছিল। সে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সে শুধু মেয়েদেরই চিকিৎসা দেবে বলে জানায়। বেলাল তখন প্রতিবাদ করে, এবং তাকে বলে, মেয়েদের সাথে তার এই অন্যায় করার কথা সে সাংবাদিকদের জানিয়ে দেবে। এই কথায় কবিরাজ তাকে হুমকি দেয়।

পরদিন বেলাল আসলেই একজন সাংবাদিককে জানান। গ্রাম থেকে ওই সাংবাদিকের সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথে কবিরাজের লোকেরা তার ট্যাক্সির এক্সিডেন্টের ব্যবস্থা করে। বেলালের পক্ষে আর সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করা সক্ষম হয় নাই। শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি পিছিয়ে যান। পরবর্তীতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই কবিরাজ নিজে থেকেই মারা যান, যে ঘটনার কারণে বেলালের আর প্রাণও হারাতে হয়নি এবং ওই অঞ্চলের নারীদের সাথে এই অন্যায় আচরণও আপনাতেই বন্ধ হয়ে যায়।

মুখে আমরা অনেকেই নারী স্বাধীনতা, অধিকার, নিরাপত্তা এসব নিয়ে অনেক কিছুই বলি। কিন্তু কজন মানুষ পারে নিজের জীবন বাজি রেখে সমাজ থেকে এই অনাচারগুলো দূর করতে? বিশেষ করে সে যেখানে একজন পুরুষ মানুষই শুধু না, প্রান্তিক পুরুষও বটে! আশার কথা, সমাজে এখনো এমন মানুষ আছে, এমন পুরুষ মানুষ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares

লেখাটি ৭৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.