বাঙালী নারীর পোশাক যখন আলোচনার বস্তু

0

দিলশানা পারুল:

বাঙালী মেয়েদের ক্ষেত্রে আমি কমন যে সীমাবদ্ধতাটা খেয়াল করেছি, সেইটা হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাব। জড়-সড় তটস্থ হয়ে থাকা মেয়েগুলোকে খুব ভালো করে অবজারভ করে বোঝার চেষ্টা করেছি, এর শুরুটা আসলে কোথায়? আমার কাছে মনে হয়েছে, শরীরের বাঁক নিয়ে আমরা মেয়েরা এতোটাই ব্যস্ত থাকি, এতো অস্থির থাকি বাঁক লুকানোর জন্য যে এই বাঁকগুলোকে আর এক সময় নিজের শরীরের অংশ বলেই ভাবি না।

ইচ্ছে হলেই আমাদের মেয়েরা এক দৌড় লাগাতে পারে না শরীরের বাঁক স্পষ্ট হবে বলে। প্রয়োজন হলেই বাস ধরার জন্য বা বন্ধুকে ধরার জন্য দৌড় লাগাই না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েগুলোও না। সেই যে কৈশোরে মা বা খালা বা বড় বোন শরীরের বাঁককে চিনিয়ে দিয়ে বলেছিল, বাপু সামলে, যেন দেখতে খারাপ না লাগে! বাঁক লুকাও, নইলে লোকে কী বলবে!

ওই যে পাছে লোকে কী বলবে ৬০ বছরের বুড়ি হওয়া অব্দি আমরা সেইটা ছাড়তে পারি না। দৌড় দেয়ার আগে দশবার ভাবি আমাকে কেমন দেখাবে। এই মনস্তত্বের সাথে আসলে পোশাকের সম্পর্ক্ নাই। কারণ আমি এমন অনেক নারীকে চিনি স্রেফ শাড়ি পরেই এরা দুর্দান্ত সাহসী, আত্মবিশ্বাসী। মিটিং করছে, মিছিল করছে, বড় বড় সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছে তার পোশাক তার আত্মবিশ্মাসে কোথাও চিড় ধরাচ্ছে না। আবার ফ্যাশনবল এমন অনেক মেয়েকে দেখেছি, ফ্যাশন করে প্যান্টের উপর একটা আঁটোসাটো টি শার্ট্ জড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজের উপর চার আনা বিশ্বাসও নাই। চোখে মুখে জড়তা, অস্বস্তি, নিজেকে ক্রমাগত মেয়ে হিসেবে আবিষ্কারে বিব্রত।

অনেককেই দেখি ওড়নার উপর দুনিয়ার তাবত রাগ ঝারেন। নারীর মনস্তত্ব না পাল্টে আসলেই শুধু যদি ওড়নাটা ফেলে দেন, কোনো লাভ হবে? আমি যখন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যেতাম কখনোই ওড়না ছাড়া যাই নাই, এবং নারী পুরুষ সবাইকে পিছনে ফেলে ফার্স্ট হয়েই চাকরিগুলো পেয়েছি। আমার ওড়না কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাসে কখনো চিড় ধরায়নি। এইটা একটা পোষাকের অংশ। দ্যাটস অল। শাড়ি বা প্যান্ট-শার্ট বা বোরখা সবই পরিধেয় বস্ত্র। পারিপার্শিকতা বিবেচনায় নিয়ে মেয়েগুলো ঠিক করে, সে কী পরবে (প্রচ্ছন্নভাবে বললে সমাজ ঠিক করে দেয় নারী বা পুরুষের পোষাক কী হবে!)।

নারীর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে পরিধেয় পোষাক হচ্ছে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে শেষে ভাবার জিনিষ। অথচ অনেককেই দেখি নারী অধিকার এর কথা শুরু করেন মেয়েরা কী পোষাক পরলো না পরলো এইখান থেকেই। যে কোনো মেয়ের তার প্রাপ্য সম্মান এবং অধিকার আদায়ের প্রথম শর্ত্ হচ্ছে নিজেকে বারগেইন পয়েন্টে নিয়ে আসা। মানে পরিবারের সাথে, সমাজের সাথে নিজের অধিকার নিয়ে যেন বারগেইন করতে পারে সেই যোগ্যতা অর্জন করা। পোষাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বা ওড়না ফেলে দেয়ার মধ্যে দিয়ে কী সেই যোগ্যতা অর্জন হয়, নাকি হবে?

(বি.দ্র: চাইলেই এই লিখাটায় মেয়েদের আত্মবিশ্বাসের পিছনে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কেমন করে কাজ করে দেখাতে পারতাম। কিন্তু এই কাজটা আর করবো না। মেয়েদের দায়িত্ব আসলে মেয়েদের নিতে হবে, এর কোনো ব্যত্য়য় নেই। )

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 191
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    191
    Shares

লেখাটি ৬৬৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.