প্রবাসে সমঅধিকারের জ্বরে বাঙালী পুরুষ

0

শাফিনেওয়াজ শিপু:

আমাদের দেশে অনেক পুরুষই আছেন যারা সমঅধিকারের বিষয়ে নাক সিঁটকান, আর তারাই যখন প্রবাসে আসেন তখন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সাথে এই শব্দটির মূল্য ও মর্ম বুঝতে শুরু করেন। কারণ বিদেশের কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য কিন্তু আমাদের দেশের মতো প্রকট না। তবে বিদেশে কিছু কিছু কর্মক্ষেত্রে অধিকারের প্রশ্নে নারীদের তুলনায় পুরুষরা যখন একটু পিছিয়ে পড়ে, আর তখনই তাদের মধ্যে এই সমঅধিকারের অনুভূতি জেগে উঠে, যেখানে তারা দেশে থাকলে হয়তো এই সমঅধিকার শব্দটিকে দুই পয়সার দামও দিতো না বা গোনায় ধরতো না।‌ আর প্রবাসে আসার পর যেই কর্মক্ষেত্রে আটকিয়ে গিয়েছেন বৈষম্যের বেড়াজালে, তখনই তিনি সমঅধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

হঠাৎ করে গত সপ্তাহে দেখা হলো এক পুরনো সহকর্মীর সাথে, এবং কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন তার বর্তমান কাজের অবস্থা। অভিযোগের সুরে বললেন তার কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য নিয়ে, যেখানে তিনি প্রতিদিনই বলতে গেলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তার কথার ভিত্তিতে আরো বুঝতে পারলাম যথেষ্ট পরিমাণ শ্রম দেওয়া সত্ত্বেও ম্যানেজার তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাজের সুবিধা দিচ্ছেন না। আর ম্যানেজার নারী হওয়ায় তাই অন্য নারী সহকর্মীদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন। এই কারণেই পুরনো সেই সহকর্মী রাগে-দু:খে ও ক্ষোভে সমঅধিকার নিয়ে গর্জে উঠলেন। যেখানে তার কথায় সমবেদনা ও সহানুভুতি প্রকাশ করার কথা, সেখানে উল্টো আমার হাসি পেলো তার কথা শুনে। কারণ এই মানুষটির দ্বারাই, মানে আমার এই কলিগের দ্বারাই আমিও একদিন কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছিলাম।

আমার পুরনো কর্মক্ষেত্রে প্রতি রবিবার ভোর বেলায় আমাকে দোকান খোলার পর দ্রব্য সামগ্রী রিসিভ করতে হতো। সেই সাথে অনেক ভারী ভারী বড় আকারের খাবারের বাক্সও বহন করতে হতো। কিন্তু একদিন খুব অসুস্থ বোধ করাতে এই সহকর্মীর কাছ থেকে সাহায্যের বদলে উল্টো সমঅধিকারের জ্ঞান পেয়েছিলাম। আমি সাধারণত কখনো কারো কাছ থেকে কাজের ক্ষেত্রে সাহায্য নেই না, কারণ আমি জানি এই দেশে নারী-পুরুষ সবাই একই রকম কাজ করে।

তখন আমার এই সহকর্মী বলেছিলেন, নারী হয়েছেন তো কী হয়েছে, আপনার কাজ আপনাকেই করতে হবে। এটি কিন্তু বাংলাদেশ নয়, এটি ইংল্যান্ড। আর তাছাড়া সবাই তো এইখানে একই পারিশ্রমিক পায়, সুতরাং কে পুরুষ আর কে নারী, এই দেশে তো এতো কিছু কেউ চিন্তা করে না কর্মক্ষেত্রে, বরং সবারই সমান অধিকার রয়েছে। সুতরাং নিজের কাজটি নিজে করার চেষ্টা করুন।

খুব সুন্দরভাবে তিনি আমাকে বয়ান দিয়ে গেলেন, কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরে আমার সামনে এক ইউরোপিয়ান কলিগকে সাহায্য করার জন্য তিনি হাত নিজ আগ্রহে বাড়িয়ে দিলেন। অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম সেই দিনের ব্যবহারে, কিন্তু তারপরও কিছু বলিনি। আমার অন্যান্য কলিগরা আমাকে বলেছিলেন তার নামে অভিযোগ করতে, কিন্তু আমি করিনি বাঙালী বলে। পারিশ্রমিক ও কাজের ঘন্টা ঠিকমতো পাওয়ার পরও অনেক সময় বিভিন্নভাবে আচরণগত বৈষম্যের শিকার হয় বাঙালী নারীরা, তাও আবার স্বজাতি দ্বারাই।

আমাদের বাঙালীদের মূল সমস্যা হলো আমরা অন্যদের বিষয়ে যতটা উদার, নিজেদের ব্যাপারে ঠিক ততটাই গোঁড়া।নিজের দেশের কাউকে আমরা টেনে তুলতে চাই না পাছে সে লাথি মারে কিনা এ ভয়ে। তাই ভিনদেশিদের প্রতি উদারতা দেখাতে চাইলেও স্বদেশীদের মাথায় লবণ রেখে বড়ই খেতেই পছন্দ করে কিছু কিছু বাঙালী পুরুষ সহকর্মী।

যাক অবশেষে আমার এই পুরুষ সহকর্মী ঠ্যাকায় পরে বুঝতে পারলেন, কেন আমাদের দেশের নারীরা সমঅধিকার বাস্তবায়নের জন্য দিনের পর দিন সংগ্রাম ও লড়াই করে যাচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক তার মতো যদি আমাদের দেশের সকল পুরুষরা বুঝতে পারতো, তাহলে হয়তো আজকে আমরা নারীরা কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এতোটা পিছিয়ে থাকতাম না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 297
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    297
    Shares

লেখাটি ১,১৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.