ভালবাসার মরীচিকা!

0

ফারহানা বহ্নি শিখা:

রিতু’র বিভিন্ন লেখালেখির গ্রুপে ঘুরে ঘুরে গল্প পড়তে এতো ভালো লাগতো!
দুই একটা প্রিয় গ্রুপের মধ্যে বই পড়া, নামে একটা গ্রুপ আছে, যেখানে সে সুযোগ পেলেই ঢুঁ মেরে আসতো, গল্প পড়তো। তার নিজের ফেসবুক আইডি ছিলো না। বড়বোন মিতু’র আইডি থেকেই সে পড়তো।

লেখক আবির এর গল্পগুলো বারবার তার মন ছুঁয়ে যেতো। অন্যদের লেখা নিয়মিত পড়ুক বা না পড়ুক, আবিরের লেখা রিতু’র পড়তেই হবে, এমনই পছন্দ, ভালো লাগা। এ যেন এক নেশা!

এতো নেশা যে, আপু’র মোবাইল হাতে না পেলে ডেস্কটপ থেকে মিতু আপুর আইডিতে ঢুকে আবিরের লেখা খুঁজে খুঁজে পড়তো সে। আবিরের টাইমলাইনের নতুন পুরনো সব লেখায় তার পড়া হয়ে যায়।

নতুন লেখার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতে তার ভালো লাগতো। ঘণ্টা পর পর চেক করতো গল্প এলো কিনা। না পেলে মন খারাপ লাগতো। ইচ্ছে হতো, বকে দিতে! কিন্তু ফ্রেন্ড রিকুয়েস্টই পাঠাতে পারেনা, এটা যে তার বোনের আইডি! আর রিকুয়েস্ট না পাঠাতে পেরে তার ছটফটানি বাড়তেই থাকে। ইচ্ছে করে, সব লেখায় লাভ ইমো দিতে, সুন্দর সব কমেন্টস করতে, ইনবক্সে গিয়ে চ্যাট করতে! কিন্তু আপু’র আইডি, কিছুই করা হতোনা। মন খারাপ করে গল্প পড়েই সে সন্তুষ্ট থাকতো।

একটি বছর চুপিচুপি গল্প পড়েই কাটিয়ে দেয়। সাথে যুক্ত হয়, অনেক ভালোলাগা, ভালোবাসা আর ছটফটানি!
তারপর একদিন, অতি উৎসাহে নিজের একটা ফেসবুক আইডি খুলেই ফেলে। আর তর সয়ছিলোনা। একবছর কি কম সময়! বরং বলা যায় রিতু’র অনেক ধৈর্য!
ফেবু আইডি খোলার দেরি, ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিয়ে বসে আবির সাহেবকে। তারপর দুরুদুরু বুক নিয়ে অপেক্ষা তার, একসেপ্ট করলো কি!
পাঁচ মিনিট পর পর চেক করতে করতে তার ক্লান্তি এসে যায়। মানুষটা অনলাইনে আছে তো?

সাত আটবারের বেশি চেক করার পর রিতু যখন মোবাইল বালিশের পাশে রেখে শুতে যাবার আগে, শেষবারের মতো চেক করে দেখে, খুশিতে আত্মহারা হয় সে। লেখক আবির তার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করেছে! এ যেন ছোটকালে ঈদের চাঁদ দেখার চেয়েও বেশি আনন্দের!
উহু, এরচেয়েও আরো অনেক অনেক বেশি আনন্দের!

রাগী রাগী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, খুবই ভালো লাগার, এমনকি ভালোবাসারও মানুষটা তাকে বন্ধু হিসেবে নিলো, এ কি কম কথা!

সাথেসাথে রিতু ইনবক্সে নক করে। খুবই ভদ্রভাবে প্রথম মেসেজ দেয়,
-আসসালামু আলাইকুম।
তৎক্ষণাৎ জবাব আসে,
-ওয়াইলেকুম সালাম।
রিতু’র হার্টবিট বাড়তে থাকে।
সে আকাশে উড়তে থাকে। মনে হচ্ছিলো, তার মেসেজের অপেক্ষায় যেন করছিলো আবির! আহা, সত্যিই কি তাই?
তারপর সে লিখে,
-ভালো আছেন?
-হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
হায় আল্লাহ, আবির সে কেমন আছে, তাও জানতে চায়! হে খোদা, এতো খুশি সে কোথায় রাখবে!?

দশমিনিট এমন ভদ্রোচিত আলাপ চলে।
তারপর, রিতু লিখে,
-আমি খুব ভয়ে ভয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিয়েছি। আপনার ছবি দেখে ভীষণ রাগী মনে হয়!
এই মেসেজ দেবার পর, আবির সিন করেনা। আরো অনেকক্ষণ রিতু তার লেখা শেষ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থেকে প্রায় পুরো রাতটা নির্ঘুমই কাটিয়ে দেয় রিতু।
এই কথাটা সে না লিখলে কি হতো! ভাবে সে। তিনি কি পড়ে কিছু মনে করবেন? কতো চিন্তা যে তার মাথায় আসছে!

সকালে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলো রিতু। জাগতেই মোবাইল হাতে দেখে, এতো বড় একটা হাসির ইমো। যাক বাবা, বাঁচা গেলো! রিতু তার হাসির ইমো দেখেই লাফায়। তার খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছিলো। আবেগ সংবরণ করে রিতু লিখে,
-কি হলো?
-বারে, ভয় পাবার কি, আমি বাঘ নাকি ভালুক?

এভাবে প্রতিদিন তাদের চ্যাট হতো। ভালো লাগা, মন্দ লাগা ভাগ করতো দুইজন। খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো তারা। এমনকি কথায় কথায় রাগ, অভিমান, ঝগড়াও হতো!
পাঁচটি মাস এমনতর বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্কে কেটে গেলো। কিন্তু রিনি’র কাছে শুধু তা বন্ধুত্ব্ ছিলো না, এরচেয়েও বেশি কিছু ছিলো। সে যে আবিরকে ভালোবাসতো। মন প্রাণ উজাড় করেই ভালোবাসে সে।

মনে পড়ে, আবির যেদিন তুমি সম্বোধন করেছিলো রিতুকে। রিতু খুশিতে হাওয়ায় ভেসেছিলো। এতো ভালো লাগছিলো তার!
বারবার আয়নায় তার লজ্জারাঙা মুখটা দেখে নিজেই লজ্জা পাচ্ছিলো। আসলে নিজেকে বউ বউ লেগেছিলো সেদিন! সেদিনটির কথা মনে করে রিতু আজও হাসে। কি পাগলামিটাই না ছিলো!

একদিন টিউশন থেকে ফিরতে ফিরতে আবিরকে মেসেজ করে রিতু,
-আই লাভ ইউ।
লিখেই অফলাইন চলে যায় সে। সাথে মোবাইলও অফ করে দেয়। তার বুক কাঁপে, ভয় হয়, সে যদি এখন দেখেই সাথে সাথে নেগেটিভ কোনো জবাব দেয়! রিতু কীভাবে সইবে তা!

যখন ফোন অন করে, নিতু নেটে আসে, দেখে উনি রিপ্লাই দিয়েছেন,
-এই বয়সটা আমিও পার করে এসেছি, তাই বুঝি তোমার এই আবেগ বয়সের মোহ, ভালোবাসা না!

সে কী জানে, এটা ভালোবাসা নাকি মোহ!
রিতু কোনো জবাব দেয় না। এক বুক অভিমানে বুকটা ভেঙে যেতে চায় তার। মরে যেতে ইচ্ছে করে। দুই তিনদিন কোনো কথা হয়না দুইজনের।

কিন্তু এই দেড় বছরে যা মনে হয়নি তা অনুভব হচ্ছিলো তার। মনে হচ্ছিলো, আবিরকে হারিয়ে ফেলছে সে। সম্পর্কের কোথায় যেন তাল কেটে গেছে। আর আগের মতো কথা হয় না তাদের।

রিতু’র পরীক্ষা শুরু হয় তখন। মানসিক এই চাপ, অশান্তিতে কোনোভাবেই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না সে। যে মেয়ে দুই নাম্বারের প্রশ্ন ছেড়ে আসলে সারাপথ কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুছতো, সে সাতাশ নাম্বারের প্রশ্ন নির্বিঘ্নে ছেড়ে আসে। কিছুই ভালো লাগছিলো না তার। আবিরের নিরবতা অসহ্য লাগছিলো।

একদিকে আবিরকে হারানোর ভয় আরেকদিকে নিজের পড়াশুনা, রিতু কিছুই সামলাতে পারছিলো না, দিশেহারা হয়ে পড়ছিলো। নিজের মধ্যে সে যেন নেয়।
অধৈর্য হয়ে আবিরকে মেসেজ দিয়ে বসে। মনের যত রাগ, অভিমান, গোসসা আছে সব উজাড় করে ঝেড়ে দেয়। আবির যে শুধুই তার! কিভাবে তাকে হৃদয় থেকে দূরে চলে যেতে দেয়! আবির তাকে ভালো নাই বাসুক, রিতুকে তো তাকে ভালোবাসার অধিকার দিতে পারে, না কি তা বড্ড বেশি গোনাহের কাজ!?

জবাবে আবিরও কথা শোনালো এত্তোগুলি।
আবার নিরবতা। আবার অসহ্য সময়, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মনে হয়। কাটতে চায়না আবির ছাড়া।
অস্থির হৃদয়ের রিতু’ই মাফ চায়, বরফ গলানোর চেষ্টা করে। হয়তো বরফ গলতোও।
কিন্তু আবির হুট করে যোগাযোগ এর সব ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলো! রিতু অবাক হয়, স্তব্ধ হয়ে যায় সে।

আবির নিজেও জানেনা, সে রিতু’র কতোখানি জুড়ে ছিলো। আবিরের সব পছন্দ ভালোলাগা, ভালোবাসা সে নিজের মধ্যে ধারণ করে নিয়েছিলো।
আবির ঘনঘন চা পান করতো, বলেছিলো কোন এক কথোপকথনে। আর রিতু কখনোই চা পান করতে চায়তোনা। শুধুমাত্র আবিরের জন্য সে সুন্দর করে, যত্ন নিয়ে চা বানানো শিখেছিলো। আর একটু একটু চেখে দেখতে দেখতে রিতু হয়ে পড়েছিলো চায়ের পোকা! চা না হলে তার চলতোই না আর! এটা কি ভালোবাসা নয়?

আবির বিরানি খেতে পছন্দ করে বলেছিলো, রিতু তা তৈরি করাও শিখে নিয়েছিলো। বিরানি দেখলেই আবিরের কথা মনে পড়তো তার। সে বাসায় বারেবারে বিরানি রান্না করে হাত পাকিয়েছে!
আবির যেসব মিষ্টি খেতো, রিতুও বেছে বেছে তাই খেতো শুধু, বাকিগুলো খাওয়া একেবারেই বাদ দিয়েছে!

দুইটি বছর, হ্যাঁ দুইটি বছর ধরে সে আবিরকে হৃদয়ে লালন করছে, তাকে কিভাবে ভুলে!?
রিতুকে ব্লক করে দিলেই কি রিতু তাকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারবে?

আবিরের ঘুমানোর, খাওয়ার, ক্লাসে যাওয়ার,
এমনকি অসুখেরও রুটিন মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো রিতু’র! এই দুই বছরে আবির, রিতু’র অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো, তার সব অভ্যাস, রিতু’র অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো!

আবির অসুস্থ হলে রিতু’র ছটফটানি শুরু হয়ে যায়। ৩৪০ কিমি দূরে এক শহরে আবির হাসি দিয়ে ছবি আপলোড দিলে রিতু’র মুখে হাসি ফুটে।

আবিরও কি তাকে কম বুঝতো? চোখ বুঝেই যেন সব ঠিক ঠিক বলে দিতো রিতু সম্পর্কে! রিতু’র প্রিয় সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি, না জেনেই বলে ছিলো! রিতু’র শখ রান্না করা, কিভাবে যে বলতো সে! রিতু অবাক হতো আর উত্তোরোত্তর তার প্রতি আকর্ষণ বাড়তো চুম্বকের গতিতে।

আবিরে সব কিছুই আপন মনে হয় রিতু’র কাছে।
গত চারমাস ধরে আবিরের সাথে কথা হয় না।কিন্তু তার সব খবরই পায় সে, সব খবর।

আবির যাকে ভালোবাসেন সে নাকি তাকে ছেড়ে চলে গেছে! আবির খুব কষ্ট পাচ্ছে, কাঁদছে, ভেঙে পড়ছে।
রিতু’র এতে খুব খুশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেনো জানি, রিতু খুশি হতে পারছেনা, তার খুব কান্না পাচ্ছে। সে বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদে, আবিরের কষ্টে রিতু কাঁদে।

মনে হচ্ছে, আবিরের কষ্টটা রিতু’র বুকে বাজছে।
আর আবিরের এই কষ্টের জন্য নিজেকে দোষারোপ করে রিতু।
ভাবে, আবিরকে হারিয়ে রিতু’র কান্না কি ওর জন্য বদদোয়া হয়ে গেলো?
কিন্তু তাতে তো আবিরের কোনোই দোষ ছিলোনা! রিতু’ই না তাকে একতরফা ভালোবেসে গেলো শুধু। হ্যাঁ, একতরফাই তো।

কিন্তু রিতু তো কখনোই আবিরকে বলেনি তাকে ভালোবাসতে, শুধু সে তার মনের কথা টা বলে স্বাভাবিক হতে চেয়েছিলাম।। আর আবির বন্ধুত্বটুকুও ভেঙে দিলো! আহ, কি যে কষ্ট! শুধুমাত্র একটা কথা, আই লাভ ইউ! এটি’র জন্য সব বন্ধুত্ব ভালোবাসা সব শেষ!

এরপরেও রিতু এখনো তার বন্ধুত্বে, তার ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে প্রতিদিন। কিভাবে!? বলেছিলাম না, আবির রিতু’র অভ্যাস! সে অভ্যাস কিভাবে রিতু ত্যাগ করে! এ যে রিতু’র সুন্দর, প্রিয় এবং ভালোলাগা, ভালোবাসার অভ্যাস!

রিতু একটি ফেইক আইডি খুলে আবার আবিরকে রিকুয়েস্ট দিয়ে উত্তেজিত হয়ে অপেক্ষা করে, আবার বন্ধুত্ব হয়!
এখনো আবিরের সাথে কথোপকথনে মগ্ন হয়।
এখনো গানের লিরিক লিখে আবির সবার আগে রিতুকে দেখায়, গল্প লিখে রিতুকে পড়তে দেয় টাইমলাইনে রাখার আগেই।

না, আবির রিতুকে নয়, স্বপ্নাকে দেখাচ্ছে এসব, তার নতুন বন্ধুকে। হয়তো আবিরের বিশ্বাস এই বন্ধু আই লাভ ইউ বলবেনা। নাকি বলুক, তাই চায় আবির! রিতু জানেনা।

এখনো রিতু মন খারাপ করে। সে এখনো চায়, এইসব যদি আবির আসল রিতু’র সাথে করতো, রিতু আর কিছুই চাইতোনা। এখনো তার বুকে একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে থাকে গোপন ব্যথা হয়ে।

রিতু দিনদিন অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাসটা তাকে বড় জ্বালায়।
সামনে রিতু’র পরীক্ষা, সে মোটেও পড়তে পারছে না।

আবির যদি স্বপ্না নয়, রিতু’র সাথে একবার স্বাভাবিকভাবে আগের মতো কথা বলতো, রিতু সব কষ্ট ভুলে যেতো, ঠিক হয়ে যেতো রিতু। রিতু এখনো তার নিজের আইডিতে গিয়ে আবিরের আইডি খুঁজে, অপেক্ষা করে, আবির ব্লক উঠিয়ে নেবে।
আবির কি রিতু’র সাথে আর কখনো কথা বলবে, ব্লক উঠিয়ে নেবে, কী মনে হয়??

#বহ্নি শিখা
০২.০২.১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.