যে গল্পের শেষ নেই

0

ভায়লা সালিনা লিজা:

সাল ২০০০। তখন কাজ করি জ্যাকসন হাইটসের গোল্ডের দোকানে। মার্চ মাস, শীত যাই যাই করছে। রাতে কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতে প্রায় প্রতিরাতেই ন’টা বেজে যেতো। সেদিনও কাজ শেষ করে ঘরে ফিরছি; ৭৬ স্ট্রিটের মোড়ে হঠাৎ কেউ লিজা লিজা বলে ডেকে উঠে। এরপর যাকে দেখলাম তাকে দেখে ভূত দেখার মতই চমকে উঠলাম।

একটু পিছনে ফিরে যাই ১৯৯৮ এ। আমি তখন এক নতুন গোল্ডের দোকানে কাজ করি। স্বপ্না নামের ছোট এক মেয়ে কাজ করতে এলে তাকে কাজে রেখে দেই দোকানের ম্যানেজারকে বলে। প্রথম প্রথম কথা হতো না আমাদের তেমন। তাকে দেখলেই ভাবতাম এতো ছোট মেয়ে কী কাজ করবে! বয়স হয়তো ১৫/১৬ ভেবে খুব বেশি কথাও হতো না মেয়েটির সাথে। কিছুদিন পর যখন খুব সখ্য হয়ে যায়, জানতে পারি তার বয়স আমার চেয়ে ১/২ মাস কম; সে বিবাহিত এবং তিন বছর বয়সি তার একটি বাচ্চাও আছে। সমবয়সি হওয়ায় আমাদের দুজনের সম্পর্ক বন্ধুর মতোই হয়ে যায়। মেয়েটির স্বামী মাঝে মাঝেই মেয়েটিকে নিতে আসতো। কাজের পর আমরা কখনও কখনও খেতে চলে যেতাম আমি, চুন্নু মোহাম্মদ, স্বপ্না ও তার হাসবেন্ড। খেতে বসে আমি মুগ্ধ নয়নে তাদের খুনসুটি দেখতাম। ঘরে ফিরে সুখী সুখী চেহারার ঐ যুগলের কথা ভেবে চুন্নুকে বলতাম, আহা কী ভালো লাগে ওদের দুজনকে।

এর কিছুদিন পর শুরু হয় কাজে ফাঁকি। প্রায় সে কাজে আসে না। একবার এক সপ্তাহ সে কাজে না আসায় দোকানের ম্যানেজার কল করে তার খোঁজ নিতে বললেন। কল দিতে গিয়ে মনে পড়লো, সে কখনও তার বাসার ফোন নাম্বার দেয়নি। আমিও চাইনি তার শ্বশুর-শাশুড়ি তার বাসায় থাকেন বলে। এরপর যখন সে কাজে ফিরে আসে আমার থেকে কেমন দূরে সরে থাকে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে একসময় ডেকে এনে জিজ্ঞেস করি, আমাকে এড়ানোর কারণ কী? উত্তর এলো-কই না তো, এড়াচ্ছি না। আমার মনে হলো, আগের সেই প্রাণোচ্ছ্বল স্বপ্না ফিরেনি।
ওর মুখের দিকে তাকাতেই দেখি ডান গালটা নীল হয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলে বলে দরজায় বাড়ি খেয়ে নীল হয়ে গেছে। আমি তাই বিশ্বাস করি। মাঝে মাঝেই তার হাতে খামচির দাগ দেখে জিজ্ঞেস করতাম, কী হয়েছে? -বিড়াল আঁচড় কেটেছে। তার স্বামীও তখন আর তাকে নিতে আসে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, সে কাজ থেকে দেরিতে ফিরে। স্বপ্না যা বলে আমি তাই বিশ্বাস করি। এর কিছুদিন পর হুট করে সে কাজ ছেড়ে দিলো। আমি আর স্টোরের অন্য সবাই অবাক হয়ে যাই।

স্বপ্না ময়মনসিংহ জেলার মেয়ে। ৫ ফিট উচ্চতার ভীষণ সুন্দরী হৃষ্টপুষ্ট একটি মেয়ে। প্রথম যেদিন ওকে দেখি শান্তশিষ্ট মিষ্টি একটা ছোট মেয়ে ভেবে যে কেউ ভুল করতো। এই স্বপ্নাকে যখন দু’বছর পর দেখি, মনে হয়েছিল হঠাৎ তার বয়স বেড়ে গেছে। আমি ওর ডাক শুনে দাঁড়াতেই তাকে দেখে অবাক হয়ে যাই। প্রায় ভুলে যাওয়া স্বপ্নার মুখের দিকে আমি তাকিয়ে থাকি, আর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকে সেই মায়া মায়া মুখেই, কিন্তু মুখে কোনো হাসি নেই। ওর ছেলেটি সাথেই ছিল; সেও বড় হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম, স্বপ্না স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে বেশ আনন্দেই আছে। কিন্তু সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রহস্যময় গলায় জানালো তার স্বামীর সাথে তার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।

পাশে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজনে বসে কথা শুরু করে স্বপ্না নিজেই বলল, বিয়ের প্রথম কয়দিন কেটেছিল স্বপ্নের মতো। বাবা-মা আমেরিকান বাংলাদেশি আইটি ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন। সে নিজেও ছিলো সুন্দরী এবং বুদ্ধিমান। বিয়ের পর আমেরিকায় এসে দুজনে সুখেই দিন কাটাচ্ছিল শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে। ছেলের জন্মের পর চাকরিতে ঢোকার কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হলো অশান্তি।

স্বপ্না শাশুড়ির কাছে ছেলেকে রেখে কাজ করতো। শাশুড়ি বললেন, বাড়ির বৌ বাচ্চা রেখে কাজ করতে হবে? এর কীসের দরকার? লেখাপড়ার কথা বলতেই শ্বশুর বললেন, বাড়ির বৌ, এতো পড়ালেখারই বা কী দরকার? ছেলে তো ইনকাম করছেই। এবার স্বপ্না একটু বিদ্রোহী হলো। সে বাসায় জানালো। বাসায় বাবা-মা বললেন- বিয়ের আগে তো বলেছিলাম জামাই বাবাকে তোমাকে লেখাপড়া আর কাজ করতে দিতে। স্বপ্নার বাবা-মা জ্যামাইকায় ওর বড় ভাইয়ের বাসায় থাকেন। বাসায় যেতে চাইলে বলা হতো- বাড়ির বৌ, ঘনঘন এতো বাপের বাড়ি যাওয়া কীসের?

স্বপ্না কাঁদতো। বাবা-মা কষ্ট পাবেন ভেবে চুপচাপ এমন আরও বহু অসংখ্য অন্যায় আবদার মেনে নিতো। কিন্তু কাজ ছাড়লো না। স্বামীকে বলল- কাজটা করতে দাও। আমি নাহয় এক/দু বছর পর আর চাকরিও করব না। স্বামী প্রায়ই গায়ে হাত তুলে। হঠাৎ একদিন মনে হলো- এই জীবন কি সে চেয়েছিল? যে জীবনে নিজের সাধ নেই, ইচ্ছা নেই, এভাবে মানুষ বাঁচে? স্বপ্নার মনে হলো সে একটি মৃত মানুষের জীবন যাপন করছে। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। মা’কে খুলে বললো এতোদিন যাবত কী ঘটেছে তার সাথে।
সব শুনে স্বপ্নার মা কান্না করে বলেন- মা’রে তুই এতোসব সহ্য করে এই অমানুষদের সংসারে বাচ্চাটা নিয়ে থাকলি কেমন করে? পুলিশকে জানাস নাই কেন? স্বপ্না বলে, ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তোমাদের মান-সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু স্বপ্নার মা-বাবা আর ভাই মেনে নিতে পারেননি। পুলিশকে সব জানিয়ে মামলা করে দেন। এরপর হয় ডিভোর্স।

জীবন এগিয়ে যায়। স্বপ্না তার মা-বাবা আর ছেলে নিয়ে নতুন করে সংসার আর লেখাপড়া শুরু করেছে, যেখানে আগের জীবনের ছায়া নেই। লেখাপড়া শেষ করে টিডি ব্যাংকে চাকরি করছে। স্বপ্ন দেখছে ছেলেকে বড় করবে, ছেলে ভাল চাকরি করবে। অনেক স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তবুও সুখের আকাশে তার বিষাদের ছায়া। বুকের মধ্যে বয়ে বেড়ায় দুর্বিষহ কষ্ট, আর দীর্ঘশ্বাস। কেটে যায় কত নির্ঘুম রাত; সব এলোমেলো লাগলে ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে যায়। স্বামী অনেকবার তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কখনো সফল হতে পারেনি।

পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে উঠে যাবার সময় আমি স্বপ্নার আত্মবিশ্বাসভরা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিদায় নিয়ে গন্তব্যে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবি, আমাদের সংক্ষিপ্ত এ জীবনে কতো স্মৃতি, কতো মায়া। মায়ার বাঁধনে আমরা কতো আশা, আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি। বেঁচে থাকি পেছনের কতশত গল্প নিয়ে; যেসব গল্পরা গোপনে থেকে যায়, কিন্তু শেষ হয় না।

নিউ ইয়র্ক
০২/০১/২০১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 435
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    435
    Shares

লেখাটি ১,০৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.