হৃদয়ের সমকক্ষ কোনো আয়না নেই

0

রাব্বী আহমেদ:

ভাবা যাক অনেকদিন আয়না না দেখা এক যুবককে কোনো এক তরুণী এক আশ্চর্য আয়না উপহার দিলো। আয়নার সাথে জুড়ে দিলো এক রহস্যময় চিরকুট। তরুণী লিখলো, আয়না ও যৌনক্রিয়া ঘৃণ্য বিষয়, কেননা উভয়ই মানুষের সংখ্যাকে বহুগুণিত করে।

লিখলো, বোহের্সের এই উক্তি আসলে সর্বদা প্রযোজ্য নয়। মূলত চলমান মূহূর্তে মানুষ আয়নার দাসত্বকে বরণ করে নিয়েছে বলেই এতো বিভ্রান্তি। আয়না মাঝেমধ্যে মানুষের সংখ্যাকে গুণীতক করে না, বরং মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়ালে আরো একা অনুভব করে। তখন সে ভাবে, আয়নার মাঝে যে মানুষটিকে দেখা যাচ্ছে তাঁর অস্তিত্ব থাকলে পৃথিবীর বিপুল বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি মিলতো। সে জানালো, আয়না আবিষ্কারের অনেক পূর্বে যখন জলে মানুষের ছায়া পড়তো, ক্লান্ত-ক্লেদান্ত মানুষ তখন নিজেকে দেখে বিভ্রান্ত হতো।

মানুষ মূলত নিজেকে দেখতে ভালোবাসে, তাই তাঁর আয়না প্রিয়। তখন আমাদের মনে পড়বে গ্রিসের সেই রূপস যুবকের কথা, স্বচ্ছ জলে যে তার মুখাবয়ব দেখে মুগ্ধ নয়নে নিজের প্রেমে পড়েছিল। মূহুর্তের পর মুহূর্ত নিজের দিকে তাকিয়ে সে পরিণত হয়েছিল একটা ফুলে। আত্মপ্রেমের এ যুগে, এইসব মায়াবী রূপকথা প্রাসঙ্গিক হলেও নিজের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকার সময় নেই কারো। যে যার মতো ছুটে চলা এ নিদারুণ ব্যস্ততার শহরে নিজেকে দেখার মতো ঝুঁকি মানুষ নেয় না। নিজেকে দেখলেই চোখে পড়বে, অনেক আগে যে শিশুর সারল্য লেপ্টে ছিলো মানুষের মানচিত্রে, সে সারল্য ক্রমশ এসে ঢেকে দিচ্ছে নাগরিক কমপ্লেক্সিটি।

বিভ্রান্তের এ শহরে সদ্য প্রেমে পরা কোনো যুবক মাঝরাতে ফোন দিয়ে বলে না, আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন,
কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে….

বকুল শাঁখে যে ফুল ফোটে, নাগরিক ভ্রমর তাঁর খবর রাখে না বলে এমন অনেক নিঁখুত বিউটিস্পট প্রেমিকের চোখে আড়াল রয়ে যায়। কিংবা এই পাল্টানো সময়ের ঘেরাটোপে মানুষ হয়তো ভুলে গ্যাছে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা। কিংবা হয়তো জানেই না, গভীর দুঃখে দুঃখী হয়ে, মুখোমুখি বসে অবসরে দু’টি আইস্ক্রিমের বরফজল হবার মর্মান্তিক পরিণতির দৃশ্য দেখার নামই প্রেম।

তারপরও হৃদয়ে প্রেমের দিন আসে। যেসব অভিমানের কোন নিকনেইম নেই, যেসব অনুভূতিকে কিনশিপ টার্ম দিয়ে ডিফাইন্ড করা যায় না, মানব-মানবীর নিবিড় রহস্যময় মনোজগতের মাঝে জাগরূক দ্বীপের মতো তেমনই কিছু সম্পর্ক সুগন্ধ ছড়ায়। হৃদয়ের সমতল পৃষ্ঠে যে মলিন মুখ, যেসব মুখ আমরা লালন করি যত্নে, সেসব মুখের কাছে আমাদের মুখোশ খুলে ফেলে নিজেকে অপর্ণ করি সর্বান্তকরণে, সে সব আপন প্রতিবিম্বের কাছে মানুষ মূলত পরাজিত আলোকরশ্মি। তবুও হৃদয়ের সমকক্ষ কোন আয়না নেই। আয়না ভেঙে গেলে যেমন অজস্র আয়নার জন্ম হয়, তেমনই মানুষ ভেঙে গেলেও অজস্র মানুষের জন্ম হয়। তখন মনের মাঝে চক্রাকারে তাড়া করে ফেরে,
‘প্রতিবার প্রেমে নতুন জনম, জীবন কি করে একটাই?’

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 344
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    344
    Shares

লেখাটি ৭২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.