নারীর জীবনে “পরকীয়া” অপবাদ

0

অপরাজিতা রীনা:
”পরকীয়া” শব্দটি ইদানীং খুব বেশি শুনতে পাচ্ছি সরাসরি, পত্রিকায়, টিভিসহ নানাভাবে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শব্দটি শোনা গেলেও বর্তমানে এর রঙটা  বড্ড চড়া ! শব্দটি বেশি শোনার দুর্ভাগ্য হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করতে গিয়ে। তাছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতায় কাজ করতে গিয়েও হরহামেশাই শুনি দুর্ভাগ্যবশতঃ।
যুগে যুগে নারীর স্বাধীনতা, নারীর মানবাধিকার , নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত হতে হয়েছে , হচ্ছে মানবাধিকার কর্মীদের। আত্মসচেতন নারী সবচে’ বেশি নিগৃহীত তার পরিবারে, সমাজে। যখনই নারী বৈষম্যের মূলে আঘাত করেছে , অধিকারের দাবি জানিয়েছে, পুরুষতান্ত্রিকতায় ঘা দিয়ে নিজেকে মর্যাদার আসনে দেখতে চেয়েছে , দুঃশাসনের কূটজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে, নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার উদগ্র কামনা বাস্তবায়নে উদগ্রীব হয়েছে — তখনই আফিমসেবী ঘূণেধরা, ঝিমিয়ে পড়া, একচোখা সমাজ ব্যবস্থা উন্মাতাল হয়ে নারীকে অবদমিত করেছে হাজারো প্রকারে, লক্ষ অজুহাতে ! এই অবদমনের বিশেষ একটি অস্ত্র হলো — নারীকে ‘পরকীয়া”র মোড়কে মুড়ে ফেলা!
স্বল্পজ্ঞান আমার। পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা, অচেনা। ছোট্ট পরিসরে আমার বাস। তবে দু’চারজন উচ্চশিক্ষিত বন্ধু-বান্ধব চারপাশে আছে। তাদের কথায়ও হতচকিত হই কখনও কখনও।
দেখা গেছে , স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়ে ডিভোর্সের পর্যায়ে গেলে স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ কোনো দোষ খুঁজে না পেলে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে “পরকীয়া”-র মিথ্যে অপবাদটি। সালিশ করতে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি দেখেছি। এটি এখন সাধারণ ঘরের সীমানা ছেড়ে উচ্চ সমাজেও ঘাঁটি গেড়েছে। স্ত্রীকে দোষী করার মানসে স্বামীদের মুখে এ শব্দটি শুনে এর আসল কারণ জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। দেখলাম নারীকে অবদমন করার এটিই সহজ পন্থা।
দু’একদিনের মধ্যে আবার এরূপ আরেকটি অভিযোগ এলো । মজার ব্যাপার হলো, একজন অত্যন্ত ধার্মিক, পর্দানশীন নারী আমাকে বললো — “ পুরুষ তার অন্যায় শাসন কায়েম করার জন্যে নারীর ওপর “পরকীয়া” অপবাদ দিয়ে তাকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। আর যদি পরকীয়াতে জড়ায়ও, তবে তা স্বামীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক, আর্থিকভাবে নির্যাতিত হতে হতে মুক্তির মানসে এটি করে।” আমার দৃষ্টি ওর মুখপটে আটকে গেল।
একজন মেয়ে তার পুরুষ বন্ধুর সাথে কথা কথা বললে কিংবা চললে কেন তাকে “পরকীয়া”র অপবাদ সইতে হবে? এটিকে পুঁজি করে কেন তাকে ঘরছাড়া করা হবে? সারাজীবন কেন মিথ্যে অপবাদের বোঝা বইতে হবে? পুরুষরা কি তার মেয়ে বন্ধুর সাথে কথা বলে না? তখন সেটা কী হয়? বরং স্বেচ্ছাচারিতায় মেয়েরা সবসময়ই পিছিয়ে।
কবি নজরুল ইসলামের কথায় বলতে হয় —
’অসৎ মাতার সন্তান যদি জারজ পুত্র হয় ,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয় “।
একজন পুরুষ যদি নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছন্দে নারীদের সাথে মেলামেশা করতে পারে, তবে নারী কেন পারবে না? নারীর স্বাধীনতাকে কেন স্বেচ্ছাচারিতা  বলা হবে? কোনো নারী তার আত্মসম্মান, মর্যাদা হারিয়ে কোনো পুরুষ কেন, কারো সাথেই কথা বলে না। তাহলে কেন তাকে “পরকীয়া”র অপবাদ সইতে হবে? স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছিন্নতার অজুহাত বা কারণ কী অন্যটা হতে পারে না?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 321
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    321
    Shares

লেখাটি ১,৪৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.