যাবো বহুদূর, দেখা হবে বন্ধু, দেখা হবে রাজপথে

0

আতিকা রোমা:

আট নয় বছর আগের কথা। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলতে পারি না বলে যে সামান্য কয় টাকা রোজগার করতাম, তার পুরোটাই চলে যেত সিএনজি অটোচালকদের পকেটে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চেপেছি খুব কমই। ঘন্টার পর ঘন্টা রোদ বৃষ্টি ঝড় মাথায় করে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর যখন এক একটা বাস আসতো, উঠেই দেখতাম তিল ধরার জায়গা নেই। কিন্তু তার মধ্যেও কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে আরও লোক নেয়া হতো। আমি হতাশ হয়ে পড়তাম।

এভাবে চলতে চলতেই অনেকটা বিরক্ত হয়ে একটা ব্যাটারিচালিত মোটর সাইকেল কিনে ফেললাম। দোকান থেকে কিনে সোজা বাসায় এনে হাজির। মা প্রথম প্রথম আপত্তি করলেও পরে মেনে নিলেন। তখনও বাজারে তেলে-চালিত স্কুটি আসেনি। কিছু কিছু দোকানে চাইনিজ এবং ব্যাটারি চালিত স্কুটি এসেছে মাত্র। কিন্তু ব্যাটারি-চালিত বাইকের সমস্যা হলো এর গতি কম এবং কোথাও যাবার আগে দূরত্ব মেপে যেতে হতো। কখনও চার্জ কমে গেলে কাউকে অনুরোধ করলে সহজে চার্জ দিতে দিতো না। অথচ চার্জ বাবদ যে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হতো সেটা না, কিন্তু লোকে তা বুঝতো না। এর অনেকদিন পরই একটি তেলে-চালিত স্কুটি কিনলাম। গতি এবং দূরত্ব সবই যেন হাতের নাগালে চলে এলো। শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়।

এরপর আর কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যতদূর ইচ্ছে হয়েছে, যেখানে যেতে ইচ্ছে হয়েছে, সবটাই ঘটেছে নিজের ইচ্ছেতে। আমি হয়ে উঠলাম নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক। আমার আর কারো ওপর নির্ভর করতে হয় না। আমি আমার মর্জির মালিক।

স্কুটি চালিয়ে পাড়ি দিয়েছি বাংলাদেশের অনেক অনেক জায়গা। স্কুটি চালানো এরপর প্রয়োজন ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে শখ। এক দারুণ আনন্দ যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দল বেঁধে চলে গেছি কুমিল্লা, নোয়াখালি, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুষ্টিয়া মেহেরপুরসহ আরও কত শত জায়গায়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা থেকে স্কুটি চালিয়ে গেছি চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজার। সব মিলিয়ে এক হাজার দুইশ-র বেশি কিলোমিটার পথ। রচনা করেছি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় “দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাস্তা” বান্দরবান জেলায় অবস্থিত থানচি আলীকদমের মাঝামাঝি ডিম পাহাড় পৌঁছে। এতো উঁচু এবং খাঁড়া রাস্তায় স্কুটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা আসলে খুব সহজ ছিল না। যারা বান্দরবানের মিলনছড়ি হয়ে চিম্বুক, নীলগিরি, থানচি, আলীকদম, লামা, ফাইসসাখালি হয়ে কক্সবাজার গেছেন, তারাই একমাত্র বুঝতে পারবেন রাস্তাগুলো কেমন সেখানে।

স্কুটি নিয়ে ভালো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি খুব খারাপ অভিজ্ঞতাও আছে জীবনে। কিন্তু খারাপ অভিজ্ঞতাগুলোকে আমি খারাপ স্বপ্নের মতোই পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছি দিনের পর দিন। একদম শুরুর দিকে যখন ঢাকার রাস্তায় স্কুটি নিয়ে চলতে শুরু করেছিলাম, চলন্ত রাস্তায় বহুবার ঢিল খেয়েছি, লোকে মেয়ে হয়ে মোটরসাইকেল চালানোর জন্য গায়ে থু থু ছিটিয়েছে। এমনকি একবার চলন্ত অবস্থায় একটি বড় পিকআপ ভ্যান উড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল নেহাতই খেয়ালের বশে। এই খেয়ালের জন্য আমার ডান হাতটা তিন টুকরো হয়ে গেছিল।

একদম প্রথম দিককার চালানোর একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। বনানীর কাকলি সিগন্যালের কাছে চলন্ত অবস্থায় পাশের বাস থেকে ঝুলে থাকা এক যাত্রী আমার পিঠ বরাবর একটা থাবা মেরেছিল। আমি চলছিলাম এবং বাসটিও চলছিল। আমি শুধু লুকিং গ্লাসে একটি হলুদ শার্টের হাতা দেখতে পেয়ে সিগন্যালে স্কুটিটা রেখেই লাফ দিয়ে বাসে উঠে পড়ি। দরজার খুব কাছেই ছিল লোকটি, খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। আমি শুধু শক্ত করে তার কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে বাস থেকে নামিয়েই কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম। আকস্মিক পরিস্থিতিতে সে প্রথমে হতভম্ব, এবং এরপরই চোটপাট শুরু করলো। আমি তাকে আরও একটা চড় বসিয়ে দিলাম। এবার সে পুরোপুরি হিংস্র এবং পাবলিক সিমপ্যাথিও তার দিকে। এমন সময় পেছনের বাসের ড্রাইভার নেমে এসে সেও ঐ লোককে একটা থাপ্পড় মারলো, এবং বললো, সে দেখেছে এই লোক চলন্ত রাস্তায় কী করেছে! কারণ উনি আমার এবং ঐ বাসের ঠিক পেছনেই ছিলেন। এরপর সেই লোক মার খেয়ে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে।

এরকম হাজার হাজার অভিজ্ঞতা আছে যেগুলো আসলে বলে শেষ করা যাবে না। আমি জানি আজ যারা এই লেখাটা পড়ছেন, বিশেষ করে নারী, তাদেরও অভিজ্ঞতার ঝুলি খুব ছোট না। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত রাস্তায় বেরোলেই এক একজন নারীর বহু ধরনের বাজে অভিজ্ঞতা হয়। একটু রাত হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এতো নিরাপত্তাহীনতার ভেতরেও স্কুটি চালিয়ে যাতায়াতের জন্য আমি নিজেকে অনিরাপদ মনে করি না আজ। প্রতিদিন অনেক সকালে এবং বেশ রাত করেই মূল ঢাকা থেকে উত্তরায় যাতায়াত করি।

ডিসেম্বর ২০১৭ এর শেষ সময়ে যখন স্কুটি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাস্তা পাড়ি দিয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করলাম, চারদিক থেকে প্রচুর অভিনন্দন বার্তার পাশাপাশি অনেকেই একটা অনুরোধ জানালো, আর তা হলো, অন্য মেয়েদেরকেও স্কুটি চালানো শেখানো এবং অন্যদের মোবিলিটি বাড়ানোর জন্যও আমার কাজ করা উচিৎ।

নিজেকে কেমন যেন স্বার্থপর মনে হচ্ছিল যে, আমি যেখানে খুশি সেখানেই যেতে পারি, এবং যখন ইচ্ছা তখনই। কিন্তু অনেকের ইচ্ছা এবং সামর্থ্য থাকার পরেও তা পারছে না। কারণ স্কুটি চালাতে জানেন না, কোথায় কিনতে হয়, কী ধরনের কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, পরবর্তীতে ইত্যাদি নানান ভাবনার কারণে আর হয়ে ওঠে না।

সেই জায়গা থেকে অনেক অনেক বার ভেবে মনে হলো, শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য যদি স্কুটি চালানোর একটি স্কুলের ব্যবস্থা করি, তবে কেমন হবে বিষয়টা! অনেক ভাবনার পর আমি আমার আপা নিশাত জাহান রানা’র সাথে কথা বললাম। আমার সব কাজেই আপার অনেক উৎসাহ পাই, তাই এ যাত্রাতেও আপা এগিয়ে এলেন। সাথে আসলেন সেলিনা শেলী আপা। ওনারা আমাকে পরিকল্পনা ও বাজেট করতে বললেন। আমি জানালাম কোনো উন্মুক্ত রাস্তায় আমি এই প্রশিক্ষণ দিতে চাই না। আমার একটা জায়গা প্রয়োজন। অনতত দুটি স্কুটি প্রয়োজন এবং ভালো একটি পরিবেশ প্রয়োজন। ওনারা সেসবের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন বলেই আজ আমি কাজটা শুরু করতে পারছি।

উন্মুক্ত জায়গায় করতে না চাওয়ার কারণ হলো ঢাকা শহরে ফাঁকা রাস্তার ভীষণ অভাব। আর শেখাতে হলে অনেক সকাল এবং বিকালের পর করতে হবে, যেহেতু আমি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। অফিসের সময়ের বাইরে কাজটা করতে হবে। আবার যাদেরকে শেখাবো, দেখা গেল তারা আমার অনেক আগেই পৌঁছে গেল। হয়তো একাই পৌঁছে গেল। সেসময় তার নিরাপত্তা কে দেবে? আরও একটি বড় সমস্যা হলো, ফাঁকা রাস্তায় যখন লোকে একসাথে অনেক কয়জন মেয়েকে স্কুটি চালানো শিখতে দেখবে, সেই ভিড় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাবে এবং নিঃসন্দেহে উটকো ঝামেলার সৃষ্টি করবে, যা সামাল দেয়ার পরিস্থিতি আমার জানা নেই।

তার ওপর আরও একটি বিষয় বার বার অনুভব করেছি, তা হলো ওয়াশরুম। আমি নিজে যখন গাড়ি চালানো শিখতে গেছি, এমন অনেকদিনই হয়েছে সেখানে ওয়াশরুমের কোনো ব্যবস্থা ছিল না এবং আমার সেটার খুব প্রয়োজন ছিল। তাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি এমনভাবে চিন্তা করেছি, যেখানে একজন নারী যেকোনো সময় যেতে পারবে, নিরাপত্তার সাথে সেখানে অবস্থান করতে পারবে, ওয়াশরুমের ব্যবস্থা থাকবে, চাইলে হালকা বা ভারি খাবার কিনে খেতে পারবে এবং চাইলে গাছের ছায়ায় বসে বইও পড়তে পারবে।

এই প্রশিক্ষণটিতে স্কুটি চালানো ছাড়াও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কী, নিরাপত্তা, ট্রাফিক আইনসহ আরও অনেক বিষয়ে তাত্ত্বিক ক্লাসের ব্যবস্থাও থাকছে। ২০০০ টাকা সম্মানীর বিপরীতে তৈরি করা হবে এক একজন স্কুটি রাইডার, যারা রোজকার অসহনীয় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থেকে নেমে এসে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে এগিয়ে যাবেন। পুরো কোর্সটি সম্পন্ন করতে সাত দিন সময় লাগবে। যারা সাইকেল চালাতে জানেন, তাদের জন্য স্কুটি চালাতে শেখা অনেক বেশি সহজ হবে।

তবে যারা সাইকেল চালাতে জানেন না তাদেরও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পুরো বিষয়টি হলো ভারসাম্যের খেলা। আপনি সাইকেল দিয়ে না হোক স্কুটি দিয়েই সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করবেন। এই কাজে সাহসই সবচেয়ে বড় পুঁজি। সাহস আছে যার, রাস্তা হবে তার। কাজেই সাহস করে শুরু করে দিন।

স্কুটি ড্রাইভিং লার্নিং স্কুলটি তেজগাঁও এলাকায় শুরু করতে যাচ্ছি। যারা শিখতে আগ্রহী তারা ফর্ম/ফরম পূরণ করে পাঠালেই কেবলমাত্র তাদেরকে পূর্ণ ঠিকানাটা জানানো হবে। আপাতত ঠিকানা সবার জন্য উন্মুক্ত করছি না। শুধুমাত্র ঢাকাতেই এই কার্যক্রমটি শুরু করা হবে।

আগামী মার্চ ২০১৮ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে বলে আশা করছি। আগ্রহীরা নিচের তথ্যগুলি ওয়ার্ড ফাইলে লিখে পাঠিয়ে দিন এই ঠিনাকায় [email protected] । আপাতত শুধু মার্চ ২০১৮-এর সময়সূচী ঠিক করা হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝিতে এপ্রিল এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মাসের সময়সূচী নিয়মিত জানিয়ে দেয়া হবে। (শুধুমাত্র নারীদের জন্যই এই প্রশিক্ষণ)।

1. Name:
2. Address:
3. Contact no:
4. E-mail:
5. NID:
6. Occupation:
7. Height:
8. Weight:
9. Blood Group:
10. Choose your shift: A) Morning B) Evening >
11. Can you ride a bicycle? A) Yes B) No >
** Fill up the information in a MS word file and send it to [email protected]
** See the schedule in next page
** Learning school is in Tejgoan (Near Nabisco & Channel-i)

স্কুটি শুধুমাত্র একটি বাহন না। এটি স্বাধীনতা, ডানাবিহীন আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। একটা গতিময় জীবনের জন্য আন্দোলন।
দেখা হবে বন্ধু, দেখা হবে রাজপথে, ব্যস্ত সড়কে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ১,৪৫২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.