ভাইরে, আমাদেরও বাবা-ভাই আছে

0

ঈহিতা জলিল:

পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোড়া করে দেবো,
বলেছে পাড়ার দাদারা
অন্য পাড়া দিয়ে যাচ্ছি তাই।

চলছে স্ক্রিনশট প্রকাশের মহোৎসব। ভেবেছিলাম এটা নিয়ে কিছু বলবো না। কিন্তু আর চুপ থাকতে পারলাম না। বিরক্ত লাগছে। খারাপ কিছু জনসম্মুখে আসাই উচিত। এটা দোষের না। পুরুষদের কাছ থেকে তো তেমন কিছু আশা নেই। তবে নিঃসন্দেহে কিছু মানুষ-পুরুষের দেখা আমি আমার জীবনে পেয়েছি। তাও মিথ্যা না। আমি তাই আমার নারী বন্ধুদের কিছু কথা বলতে চাই।

আমি সবসময় নিজেকে সেকেলেই ভাবি। আধুনিক নারী কাকে বলে আমি জানি না। আমি বিশ্বাস করি স্মার্ট হওয়া মানেই উচ্ছৃঙ্খল হওয়া না। স্বাধীন হওয়া মানেই যা ইচ্ছা তাই করা না।

পরকীয়া কখনই সমর্থনযোগ্য না। সে যেই করুক। একাকিত্বের সমাধান কখনও অন্য নারী বা পুরুষের সঙ্গ হতে পারে না। আমরা যারা নিজেদেরকে অধিকার সচেতন নারী দাবি করি, অত্যন্ত তাদের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ কখনই গ্রহণযোগ্য না। আমরা নারীদের একটি স্বাধীন ও সম্মানজনক জায়গায় দেখতে চাই।

বাড়ির বড় সন্তানটির উপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপ্টা যায়। তাঁর সফলতা ও বিফলতার উপর নির্ভর করে পরের সন্তানগুলোর চলার পথের মসৃণতা ও অমসৃণতা। আমরা নারীরা বিশেষ করে যাদের পায়ের নিচের জমি খানিকটা শক্ত হয়েছে। তাদের কিন্তু অনেক দায়িত্ব। কারণ সেই সব নারীদের সামনে রেখেই পরের প্রজন্ম দাঁড়াবে। আমরা যদি আমাদের প্রমাণ করতে পারি তবে প্রত্যন্ত গ্রামের সেই মেয়েটি একদিন দাঁড়াতে পারবে। আর যদি না পারি সেই মেয়েটি কোনদিন আলোর মুখ দেখবে না। তাই প্লিজ নারীবাদ নিয়ে বাণিজ্য করবেন না।

আপনার কাছে নারীবাদ হয়তো শুধু একটা নাম বা বিখ্যাত হওয়ার সিঁড়ি। কিন্তু এই নাম নিয়ে বাণিজ্যের কারণেই অনেক নারী আজও ঘরে বন্দী। আজকে নারীবাদী বলে গাল দেওয়া হয়। আমরা কেনো ভাবছি না গোলমালটা কোথায়? তবে কি আমরা নিজেদের প্রমাণ করতে পারিনি? বলতে পারেন আমরা কেনো কারো কাছে প্রমাণ দিবো? কারণ আমরা এখনো “চশমাটা খসে গেলে মুশকিলে পরি, দাদা আমি এখনও যে ইশকুলে পড়ি, কব্জির জোরে আমি পারবো না।”

কার্পেটে মোড়ানো ঠাণ্ডা ঘরে বসে কী-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে বড় বড় কথা লেখা খুব সহজ, অথচ আমাদেরই কোনো এক বোন এই ২০১৮ তে এসেও কূপির আলোতে পড়ে। সে জানে না, এই পরীক্ষা পাশ করে সে কী করবে!! তাঁর কাছে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। যখন আমাদের এসব নিয়ে তর্ক করার কথা, তখন আমরা কার বউ কার সাথে প্রেম করেছে, কার বর কার সাথে প্রেমের কবিতা বিনিময় করেছে, এসব নিয়ে মেতে আছি। আমরা মেতে আছি এক আদিম ঝগড়ায়, “কে শ্রেষ্ঠ নারী না পুরষ”?

আপনি যদি কোন পুরুষের মুখোশ উন্মোচন করতে চান, তাহলে প্রথমেই তাঁর স্ত্রীকে বলুন। যে বিবাহিত পুরুষটি আপনাকে এপ্রোচ করছে, একবার কি ভেবেছেন যে তাঁর স্ত্রীকে রেখে আপনার কাছে আসছে, সে আপনাকে রেখেও আরেকজনের কাছে যেতে পারে! আপনি কেনো আরেকটি মেয়ের জীবনে কষ্টের কারণ হবেন!

আপনি যখন পুরুষটির মুখোশ খুলতে যেয়ে তাকে পাবলিক করে দিচ্ছেন, একবার কি ভেবেছেন তাঁর স্ত্রী-সন্তানটির কী অবস্থা হয়!! একজন সন্তান যখন জানতে পারে তাঁর বাবা তাঁর মাকে ছাড়া অন্য কোনো নারীকে নিয়ে ভাবছে, সেই সন্তানের মনোজগতটায় কী তুমুল ঝড় বয়ে যায়! সেটা কি ভাবার বিষয় নয়? একজন খারাপ পুরুষকে সামনে আনতে যেয়ে আমরা যেন আরেকজন নারীর জীবনে ঝড়ের কারণ না হই। কারণ দিনশেষে আমরা সকলেই যে মা। মা হবার জন্য সন্তান জন্ম দেয়াটা জরুরি না, বরং জন্ম থেকেই প্রতিটি কন্যাশিশুই মা।

যখন আমি একজনকে আমার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলাম, তখন এর দায়-দায়িত্বও আমাকেই নিতে হবে। কারণ আমাকে কিছু বলার অধিকার তো আমিই দিয়েছি। যখন থেকে এক্সেপ্ট বাটনে আপনি ক্লিক করলেন, আপনি তো এর দায় এড়াতে পারবেন না!!

অথচ কিছু বিষয় আমরা সবাই জানি কিন্তু আদৌ মানি কি? নারী কিংবা পুরুষ অপরিচিত কাউকেই বন্ধু তালিকায় জায়গা দেয়া ঠিক না। আর একান্তই এমন কেউ যাকে এভয়েড করা যাচ্ছে না, তাকে রেস্ট্রিক্টেড করে রাখুন। আর গভীর রাতে খুব দরকার ছাড়া যে আপনাকে নক করবে, তাকে তো আর যাই হোক ভদ্র বলা যায় না! আর সবার সব কথার উত্তর দেয়াটাও জরুরি না।

এমন অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাদের লেখা বা জীবনযাত্রা অনেকেরই ভালো লাগে। তাই তাঁরা তাদের বন্ধু তালিকায় থাকতে চান। আমি নিজে এমন অনেককে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি, কারণ তাদের সন্তানগুলোকে আমার ভালো লাগে। কেউ কেউ আছেন, দেখে মনে হয় ভীষণ সুখী দম্পতি। তাদের একসাথে দেখলেই ভালো লাগে।

বয়স্ক অনেক নারী-পুরুষ আছেন যারা ফেসবুক ঠিকমতো চালাতে পারেন না। অনেক কিছু তাঁরা বলতে চান, কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারেন না। ভুলবশত অনেক জায়গায় ক্লিক হয়ে যায় যা তাঁরা নিজেরাও বলতে পারেন না এটা কীভাবে হলো! আমার নিজেরই ইমো সাইন নিয়ে অনেকবার প্রবলেমে পড়তে হয়েছে। ভুল চিহ্নতে ক্লিক হয়ে গেছে।

ইগনোর করতে শিখুন। সবার সবকিছু তো ভালো লাগবে না। সবার সাথে মতের মিলও হবে না। আপনি হাইড অপশন ব্যবহার করুন। কাউকে মাথায় নিয়ে নাচারও দরকার নাই, আবার পরক্ষণেই পায়ে মাড়ানোরও দরকার নাই। আমরা খুব সহজে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। কোনো একটি ঘটনা দিয়ে কোনো ব্যক্তির ভালো বা খারাপ বিচার করা যায় না। সব মানুষই যেমন খারাপ না, আবার সব মানুষ ধোঁয়া তুলশী পাতাও না। দিনশেষে আমরা সবাই দোষ-গুণ মিলিয়েই মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুল করে।

আর ভাই-ছেলে যাই বলি না কেনো, হে পুরুষ, কোনো নারীকে খেলনা ভেবো না। এখনও অত্যাচারী নারীর চেয়ে অত্যাচারী পুরুষের সংখ্যা বেশি। যেদিন এ সংখ্যাটি সমান হয়ে যাবে তখন আর কেউ বলবে না বেশিরভাগ পুরুষই খারাপ। আমাদের ঘরেও বাবা-ভাই আছে, আমরাও বুঝি পুরুষের চাপা কষ্ট-যন্ত্রণা।

আর নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্বেষ না। আসুন আমরা নারী বা পুরুষ না, নিজেদের মানুষ ভাবি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তৈরি করি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল সমাজ।

০২.০২.২০১৮
শুক্রবার
সময়: বিকাল ০৪.২৬ মিনিট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 463
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    463
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.