অভব্যতার মাপকাঠি আচরণ, নাকি পোশাক?

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

”মেয়েগুলি আস্ত বেয়াদব, গুরু লঘু জ্ঞান নাই কোনো। টাইট টাইট জিন্স আর টি শার্ট পরে ঘুরছে, তাকাতেও ঘেন্না লাগে।”
এই ধরনের মন্তব্য প্রায়ই কানে আসে আমাদের আগের জেনারেশনের মানুষগুলোর মুখ থেকে। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থ্রি কোয়ার্টার স্লিভ পড়লে শুনতে হতো, এতোখানি হাত দেখা যাওয়া অভদ্রতা, তারপর শুনলাম এক সাইডে ওড়না পরা খুব খারাপ, এরপর আসলো গলায় ওড়না দেয়ার যুগ, তখন কিছু লোকে মুখ বিকৃত করে বললেন, ছি ছি গলায় ওড়না ঝোলানো আর ওড়না না পরা তো একই কথা…. ইদানিং লং কামিজগুলোর সাথে ওড়নাই থাকে না, ওভাবেই পরে অনেকে। এবং যারা মন্তব্য করার তারা যথারীতি বলেন, ‘এসব নোংরামি ফ্যাশন দেখলে চোখ বুঁজতে ইচ্ছা করে…. থাকবে না, থাকবে না, আর কিছুদিন পর লাজ-শরম কিছুই থাকবে না। এখন স্লিভলেস পরে ঘুরছে, কয়দিন পরে পথে- ঘাটে মেয়েরা কাপড় ছাড়া ঘুরবে’।

মজার ব্যাপার হলো, যুগে যুগে কিছু মানুষ সবসময়ই বলে আসছেন, ‘কী দিন আসলো রে ভাই, মেয়েরা নির্লজ্জ হয়ে গিয়েছে’….তখনও মেয়েরা যা পরতো, তাতে অভদ্রতা হতো, এখনো তাই হয়…এক এক সময় নির্লজ্জতার সংজ্ঞা এক এক রকম হয়েছে, কিন্তু মেয়েদের বদনামের কমতি কোনোদিন হয়নি। বড় হাসি পায় যখন দেখি, শুধুমাত্র পোশাক দিয়ে একজন মেয়ে ভদ্র না অভদ্র, সেটা পরিমাপ করা হয়…একজন মেয়ে হিজাব করে এবং তার সাথে যদি উঁচু হিল জুতো, লেগ্গিংস আর শার্ট পরে মুখে কিছুটা মেকআপ দেয়, তখন আমরা বলি, ‘সকল পর্দা কি শুধু মাথার চুলে নাকি? জামা কাপড়ের অবস্থা দেখ, হিজাব করে না ঢং করে?’

আসল কথা হলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নিজের রুচি ও পছন্দমতো কাপড় পরার স্বাধীনতা থাকা যাবে না। যাই পরো, কিছু লোক থাকবেই সমালোচনা করার জন্য।

কোথায় জানি পড়েছিলাম, যে পুরুষ বিকৃত মানসিকতার, আপাদমস্তক বোরখা দিয়ে ঢাকা শুধু একটি মেয়ের চোখটুকু দেখলেও তার কামনা জাগ্রত হয়, আর যে সভ্য ও শালীন, তার সামনে বিকিনি পরা মেয়ে এসে দাঁড়ালেও সে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করে। কথাটির পক্ষে/বিপক্ষে হাজারও যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু ঘুরে-ফিরে টপিক সেই মেয়েদের পোশাকই…একটা মেয়ের পোশাকের উপর তার চরিত্র নির্ভর করছে, একজন পুরুষ কোন্ দৃষ্টিতে তাকে দেখবে, সেটাও তার পোশাক দেখে বিবেচিত হবে… কী আজিব ব্যাপার!

একটা মেয়ে যদি সেই পঞ্চাশ দশকের মতো ঢিলা কামিজ পরে দুই পাশে পিনআপ করে ওড়না পরে, ছেলেরা বলবে, ইশ কী ক্ষ্যাত! এই মান্ধাতার আমলের ‘আপা’রে দেখলে ঘুম আসে, আবার যদি ওয়েস্টার্ন কাপড় পরে, তখন বলবে, এই আল্ট্রা মডার্ন নিয়ে ঘর করা যাবে না, ঘরের বৌ ঢাকাঢুকা থাকলেই ভালো লাগে। ছেলের মা-বাবারা বলবেন, ”আধুনিক পোশাক পরা মেয়েগুলাকে উগ্র লাগে, এইসব উগ্র মেয়ে মডেলিং করুক গিয়ে, তারা ছেলের বৌ হওয়ার জন্য না”…. আবার অনেকে এমন আছেন, মেয়ে হিজাব করে দেখে বলেন, ‘মেয়েরে তো বয়স বেশি লাগে, আমার ছেলের সাথে মানাবে না’।

মানুষের বলার আর শেষ নাই… তাদের সব কিছুতেই আপত্তি। আমার নিজের দেখা একটা ঘটনা বলি,
এক মেয়ে ছোটবেলা থেকে মাথায় কাপড় দেয়া অভ্যাস, শিক্ষিতা, সুন্দরী ও গুণবতী। নামকরা এক পরিবারে তার বিয়ে ঠিক হলো, তারা মেয়ে দেখে পছন্দ করলো, কিন্তু সাথে শর্ত জুড়ে দিলো, মেয়েকে মাথায় কাপড় দেয়া ছাড়তে হবে। কারণ তারা যে হাই ক্লাস সোসাইটিতে বিলং করেন, সেখানে এরকম মাথায় কাপড় দেয়া বৌ খুব বেমানান।

আবার উল্টোটাও আছে, আমার খুব ঘনিষ্ট এক বান্ধবী, যার কলেজ ও ইউনিভার্সিটি লাইফে ক্লাসের সবচেয়ে মডার্ন ও স্টাইলিশ মেয়ে হিসেবে পরিচিতি ছিল…দারুণ ফিগার ছিল, পাশ্চাত্য পোশাক সে খুব সুন্দর করে ক্যারি করতো। ছেলেরা তাকে ওপেনলি হট বলে ডাকতো। সেই মেয়ে এক হুজুর ফ্যামিলির ছেলের প্রেমে পড়লো এবং বিয়ের সময় যখন শ্বশুর বাড়ি থেকে তাকে জানানো হলো তাকে কঠিন পর্দা প্রথা পালন করতে হবে, সে বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নিয়ে সংসারী হয়ে গেলো। নিজের ঘরের মধ্যেও এখন সে হিজাব পরে থাকে।

এই হলো আমাদের সমাজ। একজন মেয়ের নিজস্ব পছন্দ/অপছন্দের উপর আরেকজনের ইচ্ছার প্রাধান্য কী প্রবল! সামান্য পোশাক, সেটাও তার রুচি অনুযায়ী পরা যাবে না… মুহূর্তেই আজীবনের অভ্যাস বিসর্জন দিয়ে নিজেকে আরেক ছাঁচে ঢেলে ফেলা। না হলে অশ্লীল, অসভ্য, উগ্র , নোংরা এসব উপাধিতে ভূষিত হতে হয়…হায়রে, কবে এই সমাজ বুঝবে মানুষের ব্যবহারে তার পরিচয়, অন্যকিছুতে নয়।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ধরুন একটি মেয়ে আপনার মনের মতো কাপড় পরলো, কিন্তু তার ব্যবহার নিকৃষ্ট পর্যায়ের, তবুও কি তাকে আপনি ভদ্র বলবেন? ধরুন একটি মেয়ে গুরুজন হিসেবে, মানুষ হিসেবে আপনাকে বিন্দুমাত্র সম্মান দিচ্ছে না, গালমন্দ করছে, শাপ-শাপান্ত করছে, অথচ আপনার দৃষ্টিতে যেই ধরনের কাপড় গ্রহণযোগ্য বা ভদ্র, সেটা পরে আছে, তাতে কি আপনি তৃপ্ত থাকবেন? তাকে কি আপনি অমার্জিত বলবেন না? একটি মেয়ে হয়তো আধুনিক বেশভূষা ধারিনী, কিন্তু তার ব্যবহার ভীষণ মিষ্টি, বড়দের শ্রদ্ধা করে, ছোটদের স্নেহ করে, তারপরও কি আপনি তাকে অমার্জিত, অশালীন বলবেন?

আবার কেউ ভাবতে বসবেন না আমি ধর্মীয় বিধিনিষেধ এর বিপক্ষে কিছু বলতে বসেছি। আমি আমার ধর্মের প্রতি যথেষ্টই শ্রদ্ধাশীল। ধর্ম জানি দেখেই বলতে পারি আমাদের ধর্মে গীবত করা, মিথ্যা বলা থেকে শুরু করে গান, নাচ, প্রেম সবই নিষেধ, সবই খারাপ। সেগুলো তো আমরা সবাই কমবেশি করি…তখন কিন্তু আমাদের মনে পড়ে না এগুলো ঠিক না।

আমাদের সব ধর্মপ্রেম শুধু মেয়েদের পোশাকের বেলায় জাগ্রত হয়… এটা কী হাস্যকর ও দ্বৈত মানসিকতার পরিচয় নয়? ধর্ম তো ছেলে খেলা নয় যে যেটা ভালো লাগলো সেটা মানলাম, আর যেটা লাগলো না, সেটা উপেক্ষা করলাম। কে কী পরবে সেটা তার নিজের রুচি ও সাচ্ছন্দের ব্যাপার, আপনার চোখের আরামের জন্য তো আরেকজন কাপড় পরবে না, সে পরবে তার নিজের ভাললাগার জন্য।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে সেই ধরনের পোশাকই পরবে, যেটা পরতে সে কমফোর্টেবল … সে যদি বোরখাতে স্বস্তি পায়, তা আমাদের চোখে সম্মানের হওয়া উচিত, সে যদি স্লিভলেস জামা পরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাহলে সেটাকেও আমাদের সমালোচনা না করে সাবলীলভাবে গ্রহণ করা উচিত। একজন মানুষকে শুধুমাত্র তার বাহ্যিক আবরণ/পরিধেয় বস্ত্রের কারণে “খারাপ” বা “ফরওয়ার্ড” ট্যাগ দেয়া আমার দৃষ্টিতে অন্যায়।

আমরা এ সমাজে এখনও মেয়েদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পছন্দকে এপ্রিসিয়েট করতে শিখতে পারিনি, এখনও আমরা মেয়েদের না জেনে, না বুঝে তার সম্পর্কে আজে-বাজে মন্তব্য করি… এটা শুধু বিশ্রীই নয়, আমার মতে এইসব করে সবচেয়ে বড় অসভ্যতামীটা আমরা নিজেরাই করি… নিজেদের আদিকালের ধ্যান ধারণা, পছন্দ অপছন্দ আরেকজনের উপর চাপিয়ে তাকে তার কমফোর্ট এর জায়গা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করাটাও কিন্তু এক ধরনের অমার্জিত ও অশোভন আচরণ।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলবো, মেয়েদের অসভ্য বলার আগে আপনারা নিজেরা যে অসভ্যতা করছেন সেটাও একটু ভেবে দেখা উচিত। শুধু মেয়েরা বা বয়সে ছোটরাই ভদ্রতা রক্ষা করবে, আর পুরুষরা এবং প্রবীণারা অভদ্ৰ আচরণ করে যাবেন, এটা কখনোই ন্যায্য হতে পারে না।

বেডফোর্ড, ইংল্যান্ড

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 226
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    228
    Shares

লেখাটি ৮৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.