সুইডেনে #MeToo

শেখ তাসলিমা মুন:

সুইডেনের Guldbaggen, English: Gold Scarab বাৎসরিক ফিল্ম এওয়ার্ড অনুষ্ঠান। বেশ বড় অনুষ্ঠান। সুইডেনের অস্কার। এইতো সেদিন হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের শুরুতেই নামকরা সব অভিনেত্রী হাতে হাত ধরে হিউম্যান চেইন করে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলো। #MeToo মুভমেন্টে অংশ নেওয়া সকল নারীর প্রতি তাঁদের সৌহার্দ্য প্রকাশের মাধ্যমে।

সুইডেন মনে হয় একটিমাত্র দেশ, যেখানে #MeTooকে একটি মাত্র সপ্তাহের অ্যাক্টিভিটির ভেতর সীমাবদ্ধ করেনি। সুইডেন মনে হয় একটি দেশ যেখানকার নারীরা, বালিকারা, কিশোরীরা, তরুণীরা এ মুভমেন্টের মাধ্যমে এদেশের সকল স্তরের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। বিপ্লব বলতে যা বুঝায়, তাঁরা সেটি আক্ষরিক অর্থে ঘটিয়েছে। মিডিয়া যেখানে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। যেকোনো নাগরিককে শুধু একটি প্রশ্ন করলেই যথেষ্ট, ‘২০১৭ সালকে তুমি এক কথায় কীভাবে প্রকাশ করবে?’ উত্তর- #MeToo। এ বিপ্লব মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী সবাইকে জনকাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে স্পেশ্যাল আইন করার প্রস্তাব চলছে পার্লামেন্টে।

এমনকি এ দেশের রাজা এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রেসে তাঁর বক্তব্য দিয়েছেন। সকল নারীর প্রতি এ মুভমেন্টের প্রতি তাঁর সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।

একের পর এক চলছে অনুষ্ঠান, এক্টিভিটিজ। টিভিতে আলোচনা, পর্যালোচনা থেমে নেই একদিনও। বহুবিধ ড্রামা, থিয়েটার, প্লে শো চলছে পুরোদমে। কবিতা এবং বই প্রকাশ হয়ে গেছে। বড় বড় নামী-দামী গায়ক গায়িকা পাবলিক প্লেসে শো করছে। একক গান করছে।

এই তুষার ঢাকা জল ও পর্বতের দেশে বাস করা সম্ভবপর করে তুলে যে এমন কারণ, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সম্প্রতি আরও একটি ঘটনা আমাকে আলোড়িত করেছে। সেটিও #MeToo মুভমেন্ট বিষয়ক। ঘটনাটি আমাকে একই সাথে বেদনার্ত এবং আনন্দিত করেছে।

আমি একজন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট। আমার দলের পরে আমার প্রিয় দল সুইডেনের Vänster Parti (বামদল)। এই দলের প্রধান ছিল তখন একজন নারী। আমার খুব প্রিয়। Gudrun Schyman। -তাঁর মতো বিতর্কিত নারী খুব কম আছে। তাঁর মতো সাহসী ও ক্যারিশম্যাটিক কালারফুল ব্যক্তিও আমি কম দেখেছি। সে এমন সব সাহসী কাজ করেছে, যা এখনও মিডিয়ায় আসে, মূলত বলা চলে যে, না এসে পারে না। তিনি তাঁর নয় মাসের প্রেগন্যান্সি ডকুমেন্ট করে রেখেছিলেন এবং পুরো প্রসব প্রক্রিয়া লাইভ করেছিলেন। তাও আজ থেকে চার যুগ আগে। একজন রাজনৈতিক নেত্রী ক্যামেরায় সন্তান প্রসব করছে, এটা অনেকে ভাবতেই পারবে না। কিন্তু তাঁর মতো ফেমিনিস্ট নারী মনে করেছিল, নারীর এ শক্তি পুরুষের এবং সকল মানুষের জানা দরকার। একটি প্রসব মানে একটি সৃষ্টি এবং সে সৃষ্টি কতোটা শক্তির, যার প্রতিটি মুহূর্তের ভেতর দিয়ে নারীকে যেতে হয়, সেই নারীকে শক্তিহীন মনে করার দুঃসাহস কারও পক্ষে দেখানো সমীচীন কিনা সেটি পরখ করতেই এই নারী তাঁর প্রসবকে পাবলিক করেছিলেন। এমন নারীকে ভালো না বেসে পারা যায় না।

আমার এ আইডল পরে বামদল ছেড়ে ফেমিনিস্ট ইনিশিয়েটিভ নামে একটি দল গঠন করেন। তাঁর দল থেকে পদত্যাগের পরে যে ছেলেটি নেতৃত্বে আসে, তাকেই নিয়েই আজকের কাহিনী। এ ছেলেটিও ছিল আমার অসম্ভব একজন প্রিয় ব্যক্তি। পেশায় তিনি একজন ট্রেন চালক। দল প্রধান হতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি, কারণ তিনি তাঁর চাকরিটা ছাড়তে চাননি, আর এর পিছনে কারণ ছিল, তিনি ছিলেন সিংগল ড্যাড। বাচ্চারা স্কুলে যায়, তাঁদেরকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, ডিনার রান্না, বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক, সবই তাঁকে দেখতে হয়। এসব কারণে তাঁর পক্ষে দলের নেতৃত্ব নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে দলের স্বার্থে তাঁকে রাজী হতে হয়, তবে তিনি ট্রেনচালকের কাজও একই সাথে করতেন। এমন মানুষকেও ভালো না বেসে পারা যায় না। যদিও সুইডেনে সব রাজনৈতিক নেতার জীবনই কম-বেশি এমনই। প্রধানমন্ত্রী সাইকেলে করে অফিস যায়। নিজে বাজার করে। নিজ হাতে ডিশ ক্লিন করে। লন্ড্রি করে।

বাম এই রাজনীতিকের নামে ডানপন্থীদের অনেক প্রপাগান্ডার মধ্যে সবচাইতে বেশি যে দোষটি দিয়ে তাকে কাবু করতে চাইতো, সেটি হলো সে ‘কম্যুনিস্ট’। কারণ সে একবার প্রেসে এক সাংবাদিকের বারংবার প্রশ্নের সামনে বলেছিলেন, তিনি ‘কম্যুনিস্ট’। এরপর এটা বছরের পর বছর চলতে থাকে। ইউরোপে এমন হয়েছে, ‘হিটলার’ আর ‘কম্যুনিস্ট’ তারা এক ক্যাটাগরিতে দেখে।

যাই হোক এই তরুণ ‘কম্যুনিস্ট’ এর কিছুটা প্রেমে পড়েছিলাম অস্বীকার করবো না। তখন বয়স কম। আদর্শিক রোমান্টিসিজম রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যার কারণে ব্যক্তি জীবনে মূল্য কম দেইনি। সে প্রসঙ্গ ভিন্ন।

বলছিলাম, এ বাম দলপ্রধানের কথা। নায়কোচিত চেহারা, অপূর্ব হাসি, কিছুটা লাজুক, বিনয়ী আবার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব। এক কথায় পুরুষ হিসেবেও এই ট্রেনচালক কম্যুনিস্ট আকর্ষণীয়। তিনি তার দলের প্রধানকাল পূর্ণ করেছেন ঠিকমতোই। কোনো ঝামেলা ছাড়াই। সেই তাঁর কথা এখন ভিন্নভাবে বলতে হচ্ছে।
এই নেতা এখন কিছুটা মধ্য বয়সের। রাজনীতির নেতৃত্ব তরুণদের কাছে ছেড়ে দিয়ে দলের অন্য কাজে নিমগ্ন। এই নেতা এতোদিন পর আবার খবর হয়েছেন। এবারের টপিক #MeToo!

#MeToo মুভমেন্টে তাঁর দলের এক নারী তার নামে যৌন হয়রানি বা অনভিপ্রেত যৌন আমন্ত্রণের অভিযোগ এনেছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। তার দল এ ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। তিন মাস অভ্যন্তরীণ তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে তবেই তার নাম মিডিয়ায় প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সাথে তাকে দল থেকে পদত্যাগ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই নেতা পদত্যাগ করেছেন এবং তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তিনি কাউকে অসম্মান করলে তিনি তার জন্য ক্ষমা চান। এবং নির্দিষ্ট সে মেয়ের কাছে তিনি ক্ষমা চান এবং পাশাপাশি তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি যেভাবে নিয়েছিলেন সেখানে দুজনের বুঝার গ্যাপ ছিল বলেই তিনি মনে করেন। তিনি তবু তাঁর কাজের দায়িত্ব নেন।

এই হলো সুইডেন। এবং এ কারণে আমি এদেশটিতে আমার জীবনের বেশি অর্ধেক সময় বাস করে যাচ্ছি।

বি: দ্র: ছবিটি সুইডেনের একজন মন্ত্রীর।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.