পারিবারিক সুখ-শান্তিরও নিয়ন্ত্রক পুরুষ!

0

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী:

সমাজটা বদলে গেছে। একটু বেশিই বদলে গেছে। কেন জানি না মনে হচ্ছে এই সময়ে বাংলাদেশে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মেয়ে বা নারী প্রজাতির এখন আর কোনো দরকার নাই।
প্রাচীন যুগের মতো কেবল সন্তান উৎপাদন এবং পুরুষের মনোরঞ্জন (সাজ সজ্জা,উদ্ভট নাচ – বাংলাদেশের একদিন যে কোন বেসরকারী টিভি প্রোগ্রাম দেখলেই বুঝতে পারবেন এর সত্যতা) ছাড়া এদেশের নারীদের আর কোনো কাজ নেই।
এক সময়ে সন্তান লালন-পালন, সংসারে সুখ উৎপাদন, মায়ার বাঁধনে পরিবারের সদস্যদের বেঁধে রাখা, স্বল্প আয়ে সংসার চালানো, সংস্কার, আত্মীয়তা, লোক-লৌকিকতা,পালা পার্বন পালন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা এবং সংস্কৃতির পাঠদানে নারীর ভূমিকা ছিল।

এখনকার সময়ে নারীর হাতে আর কিছু নাই। ছেলেমেয়ে পড়াশুনা শিখছে দুর্নীতিবাজ শিক্ষা মন্ত্রীর পিএ এবং ঐ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিযুক্ত কর্মকাণ্ডে। প্রশ্ন ফাঁস আর বাপের টাকার কোচিংই হচ্ছে এদেশের শিক্ষা। সংস্কৃতি আরও সোজা। কিছু ভূয়া নাচ গান শেখাবার টাকার মেশিনসম ট্রেনিং সেন্টার এবং ট্রেইনারদের ইন্ডিয়া থেকে ডিরেক্ট নকল নাচ গানই হলো সংস্কৃতি।
ঈদ এ মিলাদুন্নবী, স্বরস্বতী পূজা কিংবা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন – সব কিছুতেই ধামাকাদার হিন্দী গান আর শরীর প্রদর্শন করা নৃত্য। এই আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি।
লোক লৌকিকতা,পূজা পার্বন সবকিছুই কর্তা ব্যক্তিটির খরচকৃত টাকার মাপে হয়।

স্বামী ব্যক্তিটি ভালো হলে তথা আন্তরিক হলে, স্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত হলে, মানবিক হলে, দায়িত্ববোধ সম্পন্ন হলে, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলে, নিজের একটা সুন্দর জীবন চাইলে সেই সংসার সুখের হয়।
আর স্বামী ব্যক্তিটি দায়িত্বহীন, চরিত্রহীন, বেয়াদব, হিংস্র, রাগী, মাইজার হলে সংসারটি রংহীন হয়। ভেঙ্গে যায়।

একজন নারী যতই ভদ্র,পরিশ্রমী, সৎ, সংসারী, দায়িত্বশীল এবং ওয়েল বিহেভ হোক না কেন, স্বামী ব্যক্তিটি যদি পরকীয়াকারী হয়, মাইজার হয়, নোংরা ব্যবহারকারী হয়, স্ত্রীকে অসম্মান করে, নিজের দোষ ঢাকতে স্ত্রীকে অপবাদ দেয়, ঐ সংসারে সুখ পাখি কখনও বাসা বাঁধে না।

আবার একজন নারী যতই উগ্র, বদমেজাজী, দায়িত্বহীন হোক না কেন, স্বামীটি যদি আন্তরিক হোন, স্ত্রীকে সম্মান করে, স্ত্রীর ইমোশনকে গুরুত্ব দেন, দুদিন পর পর স্ত্রীর খুশির জন্য নিত্যনতুন হানিমুন প্ল্যান করেন, নিজের পরিবারের সামনে স্ত্রী এবং তার পরিবারকে সম্মান দেন – খুব দ্রুত সফল এবং সুখী সংসার সকলে দেখতে পাই। ঐ দোষগ্রস্থ মেয়েটিই সুখী দম্পতির একজন হোন।

একজন কোয়ালিফাইড, একজন প্রজ্ঞাবান উচ্চশিক্ষিত কিংবা মানবিক নারী কেবল জীবনসঙ্গী হিসেবে মন্দ পুরুষটিকে পেলেই পারিবারিক জীবনে ব্যর্থ হতে বাধ্য। অপরপক্ষে একজন কোয়ালিফাইড,মানবিক পুরুষ কেবল একজন নারীকে পেলেই সফল পারিবারিক জীবন পেতে পারে।

এই সময়ের আর একটি বড় ট্রাজেডি হলো, যে কোনো পুরুষের প্রথম পছন্দ লেস কোয়ালিফাইড নারী। এর মানে যে নারী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী না, যুক্তিবাদী না, স্বাধীন চেতা না, যে নারীর নিজস্ব রং নাই, স্বাধীন ভাবনা চিন্তার ক্ষমতা নাই, যে নারী অন্যায়ে প্রতিবাদ করে না, যে নারী অধিকার সচেতন না, যে নারীর নিজস্ব মূল্যবোধ, চেতনা বা রাজনৈতিক সচেতনতা নাই এবং যে নারীর সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতা নাই, তারাই সাংসারিক জীবনে সফল। মেরুদণ্ডহীনতাই যেন সংসারী হবার প্রধান যোগ্যতা।

পুরুষদের আরো পছন্দ টাকাওয়ালা বাপের গাধা টাইপের মেয়ে। হাত বাড়ালেই নিজের সব প্রয়োজন, গাড়ি-বাড়ি ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে। স্বল্প মেধাবী, নিজস্ব রংহীন মেয়েগুলোকে ভুংভাং বোঝানো যাবে। তার বাপ ভাইয়ের পয়সায় ফূর্তিও করা যাবে।

তাই মেয়েদের আজকাল আর উন্নত শিক্ষা, সংস্কৃতি, সততা, আত্মসম্মানী, ভদ্র, মানবিক করে গড়ে তোলা যাবে না। মেয়ে জন্ম দিয়েই নেমে পড়তে হবে টাকা রোজগারে। বোকা-সোকা মেয়ে আর মেয়ের ওজনের টাকা দিয়ে মেয়েকে সুখী পারিবারিক জীবন দিবে।

নইলে মেয়েটিকে সুযোগ্য করে গড়ে তুলে তাকে একটি টানাপোড়েনের পারিবারিক জীবনযাপন করতে দেখবে। বেঘোরে মরতে দেখবে। হত্যা না আত্মহত্যা তারই কূল কিনারা পাবে না। অসহায় আক্রোশে ছটফট করবে। অপরাধী পুরুষকূল নেমে পড়বে নতুন শিকারে। সেই শিকার যে তোমার কোলে পিঠে বেড়ে ওঠা তোমার কন্যাটি নয়, তার নিশ্চয়তা তোমায় আমি দিতে পারছি না।

তাই সময় হয়েছে পুরো সমাজটাকে বদলে দেবার। উন্নত ভাবনা চিন্তা, সঠিক শিক্ষা এবং সংস্কৃতিমনা একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলার। তবেই নারীজন্ম আর ব্যর্থ হবে না এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে।
আর এই দায়ভার আমাদের সকলের। কারণ আগামী দিনের নারীগণ শিশুকন্যা হিসেবে আপনার আমার ঘরেই বড় হচ্ছে!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 489
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    489
    Shares

লেখাটি ১,২১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.