বৈবাহিক সম্পর্ক, জটিল সমীকরণ

0

মাহসিনা আফরোজ ইলা:

যে কোনো সম্পর্ক নাকি পরিচর্যা করতে হয়। নয়তো সেখানে দূরত্ব রচিত হয় এবং তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সম্পর্কটাকে অবহেলা করে, তা বোধ করি বৈবাহিক সম্পর্ক। অথচ পৃথিবীর তাবৎ সম্পর্কের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক না। এই সম্পর্ক লেনদেনের সম্পর্ক। যার ভিত্তি, এক টুকরো কাগজ এবং একে টিকিয়ে রাখে সন্তান এবং লৌকিকতা।

অনেকেই এর বিরোধিতা করতে পারেন। বলতে পারেন, বিয়ে কোনো লেনদেনের সম্পর্ক নয়। বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, আবেগ, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের প্রতি প্রশ্ন, আমাদের সমাজে ভালোবাসার বিয়ে কয়টা? বেশির ভাগ বিয়েই তো সমঝোতার। সত্যি কথা হচ্ছে, কালে কালে এই বিশ্বাস, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, আবেগ একে একে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে। বাকি থাকে কাগজ, সন্তান আর সামাজিক বাধ্যবাধকতা।

বৈবাহিক সম্পর্কে অবহেলার শিকার কে বেশি হয়? স্বামী নাকি স্ত্রী? স্ত্রী, বলাই বাহুল্য। স্বামীর ক্ষেত্রে কিন্তু ঘটনা উল্টেও যেতে পারে। পুরুষ মানুষ বিয়ে করার পর তার পরিবারে তাকে নিয়ে একটা সুক্ষ্ম টানাটানি শুরু হয়ে যায়। পাছে আবার বউ ভক্ত না হয়ে ওঠে। অথচ বিয়ের আগে হয়তো এই ছেলের কোনো খোঁজই ছিল না। ছেলে ছিল বাউন্ডুলে। বাবা, মায়ের খোঁজ কোনদিন নিয়েছে কিংবা নেয়নি। বিষয়টা মোটেও গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু এখন যখন সে বিয়ে করেছে, তার সঙ্গে আরেকটা মেয়ের নাম জুড়ে গেছে, এখন তো তাকে প্রমাণ দিতেই হবে যে বউ একটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় ছাড়া আর কিছু না। বউ এর জন্য ভালোবাসা দেখিয়েছো কী মরেছো! সংসারে হাহাকার শুরু হয়ে যাবে। ছেলে হাতছাড়া হয়ে গেল!

উপরের চিত্রটা মোটামুটি কমন হলেও স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের শীতলতার জন্য যে সব সময় পরিবারের আর সদস্যরা দায়ী, তা নয়। অনেকাংশে দায়ী স্বামীর প্রতি স্ত্রী’র বা স্ত্রী’র প্রতি স্বামীর অথবা একে অপরের প্রতি উদাসীনতা। এবারেও উদাসীনতার শিকার স্ত্রীটাই বেশি। বিয়ের আগের উচ্ছল লোকটাকে অনেক সময় বিয়ের পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। স্ত্রী’র প্রতি প্রেমেও যেন কিছুটা ভাটা পড়ে। শুরুতে যে মানুষটার সংগে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দিয়েও মনে হতো, আরেকটু থাকলে কী এমন ক্ষতি, সেই একই মানুষের সংগে কিছুদিন পর কথা বলাতেও অনাগ্রহ।

এর কারণ হতে পারে, হঠাৎ করে কাঁধে পড়া দায়িত্বের বোঝা। বিয়ের পর আমাদের দেশের ছেলেরা বেশ সমস্যায় পড়ে। কারণ মেয়েদের শিশু বয়স থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়, এক সময় তাদের পরের বাড়ি যেতে হবে। পরের বাড়ির সংগে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। কিন্তু ছেলেদের কোন প্রস্তুতি থাকে না। তাদের শেখানো হয়, এক সময় সে একটা মেয়ের অধিকার পাবে। কিন্তু এই অধিকারের সংগে যে দায়িত্বগুলো জড়িয়ে আছে, সেই শিক্ষা দিতে অভিভাবকরা সাধারণত ভুলে যান। আমাদের দেশের ছেলেরা তাই দায়িত্ব নেবার বেলায় সব সময় অপ্রস্তুত। চল্লিশ বছরের বুড়ো খোকার বাবা-মায়ের মুখেও শোনা যায়, ‘আমার ছেলের বিয়ের বয়স হয়নি।’

বিয়ের পর তাই এ কী অকূল পাথারে পড়লাম! এতো ঝামেলা আগে তো বুঝি নাই! এই চিন্তা করতে করতে বউ এর জন্য প্রেমের ইতি। আরও একটা কারণ আছে, বউকে চিরন্তন ধরে নেওয়া। ভেবে নেওয়া যে বিয়ে হয়ে গেছে, এখন সব শেষ। মানুষটাকে পাওয়া হয়ে গেছে। এখন আর তার দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিলেও চলবে। সে আছে এবং থাকবে চির জীবনের জন্য। ভালবাসলেও থাকবে, ভাল না বাসলেও থাকবে। কারণ সে চুক্তিবদ্ধ এবং দায়বদ্ধ।

স্বামী মহোদয়রা একটা কথা ভুলে যান। বিয়ের পর তারা যে স্ট্রেসে পড়েন, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি স্ট্রেসে স্ত্রীরা পড়েন। কারণ তাকে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবারে, সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষের সংগে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। যেসব মানুষ মনে করেন, তার সংগে যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। খুব কম পরিবার নতুন বউকে শুরুতে মন থেকে মেনে নিতে পারেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে নিজের জায়গা করে নেয়ার কঠিন পরীক্ষায় স্ত্রীকেই নামতে হয়। সেখানে ছেলেদের স্ট্রেস হয়ে দাঁড়ায়, বউ আগে, না পরিবার আগে। কোনটা অতিক্রম করা সহজ সেই বিচারের ভার বিচক্ষণ ব্যক্তিদের উপর। সমাজের উপর দিয়ে লাভ নেই। কারণ এই সমাজ একচোখা।

প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার এই প্রচলিত ধ্যান ধারণার সংগে যুদ্ধ করতে করতে একদিন স্ত্রী বেচারি দেখেন, স্বামী মহোদয়টি তার উপর থেকে আগ্রহ হারিয়েছেন। কারণ তিনি সংসারের ঘানি টেনে ক্লান্ত এবং একঘেয়েমিতে আক্রান্ত। তখন আর কী করার থাকে? সন্তানের মুখ চেয়ে আর স্বামীর করুণা ভিক্ষা করতে করতেই জীবনের ইতি টানতে হয়।

সবাই যে এতো মহৎপ্রাণ হোন, তা কিন্তু না। কারণ স্ত্রীরাও মানুষ। যারা পরিস্থিতি মেনে নিয়ে জীবন যাপন করেন, সমাজ তাদেরকেই উদাহরণ ধরে নেয়। আর যারা মেনে নিতে অস্বীকার করে, প্রতিবাদ করেন, তাদের তো আমরা অনেক বিশেষণেই চিনি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.8K
    Shares

লেখাটি ৬,৭১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.