পদ্মাবতী- পুরুষের পেশী, ক্ষমতা ও ‘গৌরবের’ মহান এক বলি!

শেখ তাসলিমা মুন:

রোববার বৈকালিক আহার শেষে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বন্ধু দম্পতি জলি ও সংগ্রামের সাথে প্ল্যান হয়ে গেল ‘পদ্মাবত’ দেখে আসি। তখনই ফোন টেপাটেপি। বুক করার ফুস্রুতটুকুনের ভেতরই ফটাফট হাউজফুল হয়ে গেল। একটু দূরে ৬৩টি সিট বাকী। ফোনের মিনিটের ফাঁকে সেখানেও কমপ্লিট। সিট মিললো দ্বিতীয় সারিতে। কী আর করা? ঘাড় উঁচু করে পদ্মাবত দেখার সিদ্ধান্ত বলবত থাকলো। সিট ভাল নাই তো কী?  পদ্মাবতী জিতে থাকলো। দেখা যাক কেন এতো বিতর্ক জমিয়েছে ছবি নিয়ে?

‘চিতোরের রানীর আত্মাহুতি’ আমি পড়েছি মূলত আমার ইন্টামিডিয়েটে। আমার জন্য এটি মোটেও নতুন ঘটনা জানা নয়। তবু  ভুলেও যেতে পারি। বসলাম দর্শকের সারিতে। মন দিয়ে দেখলাম।

নির্মাণে মুন্সিয়ানা ‘রিং অফ দ্য লর্ড’ টাইপের। বোঝা যায়, কসরত এবং টাকা খরচ করে বানানো। আলাউদ্দিন খিলজির চরিত্রটি সমস্ত ছবির ভিলেন নায়ক মূল চরিত। চরিত্রটি রুপায়নে অভিনেতা খেটেছে বোঝা যায়। এমনকি রাজপুত রানা রতন সিং ও শৌর্যে বীর্যে চরিত্রে মহিয়ান। কিন্তু যে রানীর মাহাত্ম্যগাঁথা, তাঁকে খুব কম খুঁজে পাওয়া গেছে আমার কাছে। রূপ এবং সাজ বিন্যাসের রানী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বেশি। যদিও ছবির শুরুতে তার তীর শৈলী দিয়ে অনেকটা ‘টমবয়’ ক্যারেক্টারে শুরু করিয়ে, বিদুষী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রাজপুত রানা সিং এর দ্বিতীয় রানী হিসেবে তিনি চিতোরের প্রাসাদে প্রবেশ করেন।

ইতিহাস অবশ্য বলে চিতোরের রানীর  ঐশ্বর্যের প্রতি বেশ টান ছিল এবং প্রাসাদে তিনি বিপুল ধন সম্পদ নিয়ে পদার্পণ করেন।  ছবিতে সে বিষয়ে তেমন কোনো উল্লেখ না থাকলেও তার পতিপ্রেম এবং গহনার নৈপূণ্য প্রকাশে কোনো কার্পণ্য করা হয়নি। সতী সাধ্বী এক রূপসী নারীর মান ও কূলের গৌরবগাঁথা।

ছবিটি কেন এ সময়ে করা হলো, সেটি নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট প্রশ্ন জেগেছে। এ ছাড়া ছবিতে মূলত এ ছবি নিষিদ্ধ হবার মতো কিছু দেখিনি। সমস্ত ছবিটি দুটো শক্তিধর প্রাসাদকেন্দ্রিক। সেখানে প্রজা বিষয়ে কোনো ইতিহাস উঠে আসেনি। আলাউদ্দিন খিলজিকে একজন লম্পট ক্ষমতালিপ্সু অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভিলেন রূপে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে রাজপুত রাজার উন্নত নৈতিকতা, বংশ সম্মান, উন্নত ও দৃঢ় চরিত্র ও মানবিক শক্তি রূপে প্রকাশ করা হয়েছে।

আলাউদ্দিন খিলজি তার চাচাকে হত্যা করে সুলতান হয়। সুলতান হবার আগে সে চাচার মেয়েকে বিবাহ করে। নগরবনিতার শয্যা থেকে নেমে এসে বিবাহ রাতে তার বিবাহ বাসরে অংশগ্রহণ করে। তার চাচার শাসনও খাদ্য পানীয় ও অজস্র বেগমের ধারায় দুর্বল ছিল, আলাউদ্দিন খিলজি তার সুযোগ সম্পূর্ণভাবে নেয়।

আলাউদ্দিন খিলজি মানুষ হিসেবে এমন নিষ্ঠুর ছিল যে আপন চাচার মাথা সে তার চাচাতো ভাইয়ের হাত দিয়ে চাচির কাছে পাঠায়। ক্ষমতা দখলে সে হাজার হাজার সৈন্য ও মানুষ হত্যা করে। ক্ষমতার মূল দর্শন ‘নিষ্ঠুরতা’ আলাউদ্দিন খিলজি সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে। সে মধ্যযুগে এছাড়া দখল করে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব ছিল না, এটাও সত্য। ছবিতে উল্লেখ তেমন না থাকলেও ইতিহাস বলে, আলাউদ্দিন খিলজি যাদের গাদ্দারির সুবিধা নিয়ে সুলতান হয়, তাদের সকলকে এক রাতে হত্যা করে। এটি মনে হয় একটি পুরনো নিয়ম। (জেনারেল জিয়ার কথা মনে পড়ে গেল)। ইতিহাস কথা বলে।

আলাউদ্দিন খিলজি একটি সে আমলের প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীকে উন্নত করে এবং যুদ্ধের অস্ত্রও আধুনিক করে। ওদিকে তার খাজনা নেওয়া নীতি এমন ছিল যে কৃষক দরিদ্র হয়ে পড়ে। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কৃষকদের নারীদের হরণ করা হয়। যৌনদাসী বানানো হয়।  আর হিন্দু রাজপুতরা মূলত ছিল কৃষি প্রজার উপর। আলাউদ্দিনের আমলে হিন্দু রাজা এবং প্রজা উভয়ই  দুর্বল হয়ে পড়ে।  ছবিতে এসব আসেনি। যাক।

কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু জোরালোভাবে বলে না যে খিলজির দখলনীতি ইসলাম কায়েম করার জন্য। আলাউদ্দিন খিলজি এসব নিয়ে মাথাও ঘামায় নাই আর ইসলামিক জীবনও যাপন করেনি। তার ছিল ক্ষমতার লিপ্সা। ক্ষমতা ও নারী ভোগ ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। নিজেকে সে এতো ক্ষমতাশালী দেখতে চেয়েছিল যে নিজেকে সে ‘দ্বিতীয় আলেকজান্ডার’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। তার ধম্মো কম্মো মূলত সেটা ছিল। ইসলামের সাথে তার কোন কারবার ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তার অরিজিনও মুসলিম নয়। সে ছিল একজন ‘উপজাতি’ থেকে আসা।

ছবিতে যেটা দেখানো হচ্ছে যে, রাজা রানা সিং, রানী পদ্মাবতীর স্বামীর গুরু রানীর রূপ এবং বিদ্যায় অভিভূত হয়। রানীর খাস মহলে রানী ও রাজার সাথে ঘনিষ্ট মুহূর্ত অবলোকন করে। তার শাস্তি হিসেবে তাকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই গুরু আলাউদ্দিন খিলজির সাথে হাত মেলায় এবং আলাউদ্দিন খিলজি দুর্বলতার সুযোগ ব্যবহার করে সুচিন্তিতভাবে। সে চিতোরের রানীর রুপের বর্ণনা আলাউদ্দিন খিলজির কাছে এমনভাবে বয়ান করে যে আলাউদ্দিন খিলজির ভেতর কামনার আগুন জ্বলে ওঠে। সেই শুরু রাজপুত ও সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির স্নায়ুযুদ্ধ, পরবর্তিতে তা রণযুদ্ধে রূপ নেয়।

তবুও বলবো, যে মহারানীকে নিয়ে এ দু পরাক্রমশালী পুরুষের যুদ্ধ, সেখানে রানীকে ছবিতে চরিত্রায়নে যে খুব বেশি সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা আমার কাছে মনে হয়নি। দু পুরুষের শক্তির খেলা।

আলাউদ্দিন খিলজি কোনভাবেই যখন রানীকে বাগে না পেয়ে চতুরতার সুযোগ নেয়। এমনকি রানী চিতোরের স্বার্থ রক্ষায় শর্ত অনুযায়ী আলাউদ্দিন খিলজিকে এক ঝলক দর্শনও দেয় এবং এ বিষয়ে তার স্বামী রাজী না থাকলেও সে তার স্বামীকে কনভিন্স করে চিতোর সাম্রাজের স্বার্থে। কিন্তু সে এক ঝলক দর্শন আলাউদ্দিন খিলজির ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দেয়। সে রাজা রানা রতন সিং এর সাথে বন্ধুর অভিনয় করে করে তার আতিথ্য গ্রহণ করে। রাজা তার বংশের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাকে আপ্যায়ন করে।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি পাল্টা দাওয়াত করে। রানী পদ্মাবতী নিজ হাতে স্বামীকে রাজপুত সাজে সাজিয়ে দেয়।  আলাউদ্দিন খিলজি নিম্ন নীতির পরিচয় দেয়, বেঈমানি করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজাকে বন্দী করে রানী পদ্মাবতীর সাথে দেখা করার জন্য আলাউদ্দিন খিলজি দূত পাঠায়। রানী শর্ত দেয়। সে শর্তের ভেতর থাকে তার আটশো দাসীর জন্য পালকি পাঠাতে হবে। স্বামীকে মুক্তি দিতে হবে। বেঈমান গুরুর প্রাণনাশ করতে হবে। তাদেরকে চিতোরে আসতে সুযোগ দিতে হবে ইত্যাদি। সুলতান হুঙ্কারে উত্তর দেয় ”মঞ্জুর”!

ইতিহাস বলে, রানী পদ্মাবতীর বুদ্ধিবলে তিনি তার স্বামীকে মুক্ত করেন। আটশো দাসীর বদলে পালকিতে সৈন্য এবং অস্ত্র নিয়ে হাজির হোন। ছবিতে সুলতানের স্ত্রীর সহায়তায় সুড়ঙ্গ পথে রানী পদ্মাবতী স্বামীকে নিয়ে চিতোরে পৌঁছান। প্রাসাদে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

ওদিকে আলাউদ্দিন খিলজি হিংস্র হয়ে স্ত্রীকে জীবন্ত কবর দিয়ে চিতোরের দিকে রওয়ানা দেয়। রানী রাজাকে আপন হাতে স্বামীকে যুদ্ধের সাজ এবং ‘জওহর’ প্রস্তুত করে। স্বামীর হাতের লাল টক টকে রক্তের ছোপ একটি উত্তরীয়তে এঁকে নেয়। স্বামী যুদ্ধ জিতে ফিরে না আসলে এ ‘জওহর’ নিয়ে সে আগুনে ঝাঁপ দেবে। যাকে অনেকটা ‘সতীদাহের’ সাথে তুলনা করা হয়।

বাইরে যখন যুদ্ধ চলছে। রানী তখন প্রাসাদের নারীদের একত্রিত করে। তাদের রাজপুদের সম্মান ঐতিহ্য এবং মর্যাদা বিষয়ে উজ্জীবিত করে তোলে। রাজপুত হিন্দু কখনও আপন সম্ভ্রম শত্রুর কাছে বিকিয়ে দেয় না, সম্ভ্রম দেয়না। পরাজয় মানে না। তারা রাজপুত হিন্দু নারী ! কক্ষণও আত্মসমর্পণ করবে না। তারা আগুনে নিজেদের নিক্ষেপ করবে।

উল্লেখ্য,  তখন বিজেতারা একটি এলাকা জেতার পর সেখানকার প্রাসাদ সম্পদ এবং নারী দখল করতো। সে নারীদের বেগম নয়, যৌনদাসী হিসেবে রাখা হতো। এক্সেপশনাল সুন্দরী কাউকে বেগম করা হতো।

যুদ্ধে রাজা রানা রতন সিংকে পেছন থেকে হত্যা করা হয়। আলাউদ্দিন বলে যুদ্ধর একমাত্র নীতি ‘জেতা’। রানী পদ্মাবতীর ক্ষেত্রেও তার এটিই মূল নীতি রানী পদ্মাবতীকে জিতে নেওয়া।

প্রাসাদে খবর আসে রাজা নিহত। রানী পদ্মাবতী প্রাসাদের দরোজা বন্ধ করে তার চারপাশে আগুন ধরিয়ে দেয়। একটি শ্ত্রুকেও প্রবেশ করতে দেয় না। সে তার প্রাসাদের সকল নারী ও তার স্বামীর হাতের ছাপ উত্তরীয় ‘জওহর’ নিয়ে আগুনে প্রবেশ করার আগে বলে, এটাই আলাউদ্দিন খিলজিকে তার প্রপার জবাব! প্রাণ দেবে সে, কিন্তু রাজপুত হিন্দু বংশের গৌরব সম্মান সে জলাঞ্জলি দেবে না। আলাউদ্দিন খিলজি পরাজিত নৈতিকতা বিবর্জিত এক বিশাল মাংসের পাহাড়ের মতো প্রাসাদের দরোজায় আছড়ে পড়ে। কিন্তু রানী পদ্মাবতীকে সে পায়না।

রানী পদ্মাবতী প্রাসাদের সকল নারী নিয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেন। আলাউদ্দিন খিলজি পদ্মাবতীকে কামনা করে যে রক্তপাতের সূত্রপাত করে, তার সাথে প্রাসাদের অন্য নারীদের কোনো সম্পর্ক যেমন ছিল না, ঐ নারীদের সাথে পদ্মাবতীর শ্রেণী সম্পর্কও এক ছিল না।

বর্তমান ভারতে এ কাহিনী নিয়ে ছবি বানানোর অর্থ নিয়ে ভাবনা মনে আসতেই পারে। কিন্তু এ গল্প কেবল গল্প সেটিও নয়। ১৩০০ শতাব্দীর একটি কাহিনী। সেখানে একজন রানী এবং নারী পরাক্রম ক্ষমতার কাছে ধরা দেয়নি। মৃত্যুকে বরণ করেছে। কেবল নিজে নয়, প্রায় এক হাজার নারী নিয়ে। তখন এমন ছিল, যুদ্ধে পরাজিত হলে নারীর ভাগ্যে এটিই হতো। অনেক হিন্দু রানীর ভাগ্যে এটা জুটেছেও। কিন্তু রানী পদ্মাবতী সেটি হতে দেয়নি। সে রাজপুত রানী হয়েই নিজেকে আত্মাহুতি  দিয়েছে। গল্পটি আজও সেখানে মুখে মুখে ফেরে। এখনও টুরিস্টরা সেখানে গিয়ে চিতোরের রানীর প্রাসাদ কোনটি, সেটি খোঁজে।

সেইতো কাহিনী! পরাক্রমশালীর নারীর উপর থাবা। ক্ষমতাবলে নারীকে দখল করো। এ চিত্র কি অচেনা মনে হয়?  আজকের ডিজিটাল যুগে কি ভাবতে অসুবিধে হয় নারীর উপর দখলদারিতার উৎস তাহলে কোথায়? কতদূরে?  খুব বেশি কি বদলেছে চিত্র?

নারীকে কালো কাপড়ে মুড়েই কি সমাধান  হয় তাহলে? কোনো নারীর রূপের কথা ছড়িয়ে যাওয়াই কি যথেষ্ট ছিল না? দেখার দরকার হয়েছে?  রানী পদ্মাবতীর সতীন যখন বলছে, তুমি এবং তোমার রূপই এ রাজ্যের সকল অনিষ্টের মূল, তখন রানী পদ্মাবতী বলে, ‘কেবল রূপই সকল অনিষ্টের মূল? যে খারাপ দৃষ্টিতে দেখে, তার কোনো দোষ নেই?’ একজন নারীবাদী পদ্মাবতী! হাহাহাহ।

ছবিটিতে রাজপুত রক্তকে সম্মান ও বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে। বর্তমানের মোদীর ভারতে এ ছবিটিতে হিন্দু মূর্খ মৌলবাদে একটু বাতাস যে লাগবে, তাতে কোন সন্দেহ নাই!  কিন্তু আমি এখানে হিন্দু মুসলমানের উত্তেজনা সৃষ্টির মতো কিছু দেখিনি।

শেয়ার করুন:
  • 157
  •  
  •  
  •  
  •  
    157
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.