একজন শৈলী হোক হাজারও শৈলীর শক্তি

0

ফাহমিদা নীলা:

শৈলীকে একনজর দেখেই আমার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল। মায়াভরা মুখ, শ্যামলা রঙ, লম্বা রেশমী চুল, পোষাক অতি সাধারণ হলেও চলাফেরায় আধুনিকতা, কন্ঠস্বর দারুণ মিষ্টি। সব মিলিয়ে ভালো লাগার মতো একটা মেয়ে। একাই এসেছিল সে। খুব সুন্দর করে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলে। চেম্বারে এসে বসেই একটা মিষ্টি হাসি দিল, যেন অনেক দিনের চেনা।
তারপর কিছুটা বিব্রত হয়ে বললো,
‘আমি পিরিয়ড মিস করেছি’।

আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই যেন বুঝে ফেললো,
‘আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। বছর চারেকের সম্পর্ক আমাদের। ওর থিসিস শেষের পথে। শেষ হলেই আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা।’
এ পর্যন্ত বলে কিছুটা দম নিল সে। এরপর আবারও বিব্রত হয়ে বললো,
‘হঠাতই ও একদিন জোর করায় আমাদের শারীরিক সম্পর্ক হয় কিছুদিন আগে।’
কিছুটা লজ্জা, আড়ষ্টতা নিয়ে মাথা নিচু করে কথা বলছিল সে,
‘আমার ইচ্ছে ছিল না জানেন! কিন্তু ও এতোটা চাচ্ছিলো…অনেকটা জোর করেই…’
থেমে গেল সে।

‘আমি বাচ্চাটা নষ্ট করতে চাই না। আমি চাই আমার বেবিটা পৃথিবীতে আসুক। পৃথিবীর আলো, হাওয়া, সৌন্দর্য্য দেখুক। কিন্তু আমার বয়ফ্রেন্ড কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। এখন বিয়ে, বাচ্চা এসব নিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় না সে। সামনে ওর ক্যারিয়ার। ও এখন আমার, আসলে আমাদের দায়িত্ব নিতে চায় না।’

এতোক্ষণ চুপচাপ শুনছিলাম ওর কথা। সাধারণত: এরকম কেসে ভীষণ রাগ হয় আমার। কিন্তু মেয়েটাকে দেখে আমার অদ্ভুত মায়া হলো। কেন যেন ওর নিষ্পাপ চেহারা আর বাচনভঙ্গী বলে দিচ্ছিল, ও মিথ্যে বলছে না। আমি সহমর্মিতার সাথেই বললাম,

‘তুমি আগে একটা আল্ট্রাসনো করো। তারপর তোমাকে আমি অন্য কোথাও রেফার করে দেব।’
শৈলী কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আপনি পারবেন না আপু?’
‘অবশ্যই পারবো। একজন ডাক্তারের জন্য বাচ্চা নষ্ট করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু কী জানো শৈলী, এ কাজটা আমি করি না। করলে আমার ভীষণ মানসিক পীড়া হয়।’

সে যেন একটু অসহায়ত্বের হাসি হেসে বললো,
‘আমি বুঝতে পেরেছি আপু। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আগে আল্ট্রাসনোটা করে নিয়ে আসি।’

পরের দিন শৈলী এলো ওর রিপোর্ট নিয়ে, সাথে তার বয়ফ্রেন্ড। ছেলেটিকেও বেশ ঠাণ্ডা, পরিপাটি, ভদ্র মনে হলো। কিছুটা চিন্তার ছাপ চোখে-মুখে।
‘আপু, অ্যাবরশন করালে ওর কোনো ক্ষতি হবে না তো?’
‘সে তো হতেই পারে।’

বেশ সময় নিয়ে ওদের বোঝালাম সবকিছু। ছেলে বদ্ধপরিকর। নিজ দায়িত্ব শেষে অ্যাবরশনের জন্য তাই রেফার করে দিলাম অন্যখানে।
সপ্তাহখানেক পর শৈলী আবার একাই আসলো। ভীষণ দুর্বল দেখাচ্ছিল ওকে। চোখমুখ ফ্যাকাসে। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিল সে।

‘আপু, আমি কিছুতেই সুস্থ হতে পারছি না।’
‘তোমার রেস্টের প্রয়োজন শৈলী। তুমি বরং ক’টা দিন ভার্সিটি যেও না। তোমার সাংস্কৃতিক কাজকর্মও বন্ধ রাখো। বাসায় চলে যাও বরং।’

শৈলী আসলেই শারীরিকভাবে সুস্থ হতে পারছিল না। এছাড়া ব্যাপারটা গোপন রেখে ওর ব্যস্ত জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতেও বেশ হিমশিম খাচ্ছিল। সবকিছু সামলিয়ে শেষ পর্যন্ত বাসায় গেল সে। আমার সাথে ফোনে কথা হতো। মাঝে মাঝে ফোনে মেসেজ দিয়ে নিজের সমস্যার কথা জানাতো। একটু সুস্থ বোধ করলে সেটা জানাতেও ভুলতো না সে।

বাড়ী থেকে ফিরে শৈলী আবার আমার চেম্বারে আসল। চোখে-মুখে বিষন্নতার ছাপ। বাচ্চাটার কথা ভুলতে পারছিল না সে। মাতৃত্ববোধ আর অপরাধবোধ যেন একসাথে তাড়া করে ফিরছিল ওকে। আর মাতৃত্বের সাথে সাথে জীবনের প্রথম প্রেমেরও ইতি টানতে হয়েছিল ওকে। ওদের দায়িত্ব নিতে রাজী না হওয়ায় শৈলীর ব্রেকআপ হয়ে যায়। ক্ষোভে-অভিমানে নীরবে সরে এসেছিল মেয়েটি।

শৈলীর বিষন্নতা কাটাতেই অনেকটা সময় ব্যয় করতাম আমি। ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিল মেয়েটি। শারীরিক-মানসিক ধকল একসাথে কাটিয়ে উঠতে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। অসহায়ের মত আমার স্মরণাপন্ন হতে লাগল। চিকিৎসা ছাড়াও ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে কাউন্সেলিং করতাম। কখনো চেম্বারে, কখনো ফোনে। একবার ভাবলাম, শৈলীকে মানসিক ডাক্তারের কাছে রেফার করি। কিন্তু শৈলী তাতে রাজী হলো না। সে যেন আঁকড়ে ধরেছিল আমাকে। অদ্ভুত এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলো আমাদের মাঝে।

‘আপু, আমি জীবনের পথে চলার সব অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেছি যেন। বেঁচে থাকতে বড় কষ্ট হয়। অপরাধী সত্ত্বা যেন বারবার অতীতটা সামনে নিয়ে আসে। নারীর জীবন নিদারুণ কষ্টের। ভীষণ ভীষণ কষ্ট হয় আমার।’

‘নারীর জীবন সত্যিই কষ্টের। আর এ কারণেই নারীকে হতে হয় শক্ত, কঠিন। ভুলে যাও পুরনো সবকিছু। সামনে এগিয়ে যাও আপন শক্তিতে। দেখবে, অনেক সুন্দর দিন তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে….’

এমনি অনেক ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদান হতো আমাদের মাঝে। আমার ভয় হতো, শৈলী ঝোঁকের মাথায় কিছু করে না বসে। একদিন হঠাৎ খুব ভয়ার্ত কন্ঠে ফোন করে বললো,
‘আপু, আমার বাসা থেকে আপনাকে ফোন দিতে পারে।’

আমি আশ্বস্ত করে বললাম,
‘চিন্তা করো না। আমি সামলে নেবো সব।’

ধীরে ধীরে শৈলী সুস্থ হয়ে উঠলো। আমার সাথে যোগাযোগও কমে গেল। আমার ব্যস্ত জীবনে শৈলীর কথা ভুলতে বসেছি প্রায়, এমন সময় হঠাৎ একদিন ওর ফোন এলো।
‘আপু, কেমন আছেন? একটু কথা বলা যাবে? আপনার একটা পরামর্শ খুব প্রয়োজন।’

অনেক বেশী প্রাণবন্ত শোনাচ্ছিল শৈলীর কন্ঠ। আমার বেশ ভাল লাগলো। যাক, মেয়েটা তাহলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।
‘বল, বল। তোমার কন্ঠ শুনেই ভালো লাগছে।’
‘আপু, আমার বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। একজন প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক, যিনি কর্মসূত্রে আমার অনেক পরিচিত, উনি আমাকে না জানিয়েই বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।’ উৎফুল্ল শোনালো শৈলীর কন্ঠ।
‘বেশ তো। শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই তো হবে না, ছেলেটা কেমন সে খোঁজটাও নিও ভালভাবে।’
‘অনেক ভাল আপু। আমার অনেক পরিচিত। ওনার সাথে কথাও বলেছি আমি। উনি আমার আগের সম্পর্কের কথাও জানেন। এমনকি আমি যে ভার্জিন নই, এটাও উনি জেনেছেন। কিন্তু বেবীর কথাটা আমি ওনাকে এখনো বলিনি।’

আমি সেকেলে মানুষ। তাছাড়া প্র্যাকটিস থেকে পাওয়া অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভেবেই বললাম,
‘থাক শৈলী, ও কথা বলার দরকার নেই। আর তুমি নিজেও ওটা ভুলে যাও। খামোখা একটা অতীতের জন্য তোমার ভবিষ্যতের সুন্দর দিনগুলো নষ্ট করে লাভ কী!’

‘কিন্তু আপু, একটা নতুন জীবন শুরুর আগে তাঁকে আমি সবটা বলে দিতে চাই। সম্পর্কের মাঝে স্বচ্ছতা থাকাটা জরুরি।’
‘পুরুষ বড় অদ্ভুত জাতি শৈলী। প্রথমটায় মেনে নিলেও পরে কথায় কথায় এমন খোঁটা দেয়া শুরু করবে, তোমার জীবন অতিষ্ট করে তুলবে।’
‘আপনিও না করছেন আপু? আমার কাছের যে অল্প ক’জন জানেন, তারাও না করছে বলতে। কিন্তু আমার মধ্যে কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। আপনি বললে, আমি বলবো না। আমার সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতে, যখন আমার পাশে কেউ ছিল না, তখন আপনি আমার পাশে ছিলেন। আপনাকে আমি অনেক পছন্দ করি।’

‘আমি এখনো তোমার পাশেই আছি শৈলী। প্লিজ, তুমি তোমার জীবনের ঐ অংশটুকু ভুলে যাও। এ নিয়ে আর কারো সাথেই কথা বলার দরকার নেই।’

আমার কথায় সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে দিল শৈলী। এরপর মাঝখানে ঠিক কত দিন কেটে গেছে তা মনে নেই। হঠাৎ একদিন ফোন ঘাঁটতে গিয়ে শৈলীর নাম্বারে চোখ আটকে গেল। কেমন আছে মেয়েটা? এতোদিনে বিয়েথা করে সংসার করছে নিশ্চয়। কথায় কথায় জেনেছি, বাইরের গুনের পাশাপাশি সাংসারিক কাজেও ভীষণ পটু সে। ওর সুখের সংসারের খানিক খোঁজ নিই ভেবে ফোন দিলাম।

‘আপু, গতরাত থেকে কেমন যেন একটা শূন্যতা কাজ করছিল ভেতরে। আজ আপনার ফোনটা পেয়ে মনে হলো যেন একটা সংযোগ আছে আপনার সাথে।’
হেসে বললাম, ‘কেমন আছো মেয়ে?’
‘ভালো আছি আপু। অনেক ভালো।’

‘আমায় বিয়ের দাওয়াত দিলে না যে !’
‘আপু, বিয়ে তো করিনি। কারো সাথেই আর জড়াইনি নিজেকে।’
বিস্মিত হয়ে আগের ভদ্রলোকের কথা জানতে চাইলাম।
‘উনি এখনো অনেক আগ্রহী। বাসায় যোগাযোগ রাখছেন। বাসায় সবাই ভীষণ ইমপ্রেসড ওনার ব্যপারে। কিন্তু আমি আর এখন চাচ্ছি না।’
‘কেন বলো তো?’
‘আপু, উনি ভালো, ভীষণ ভালো। কিন্তু উনি শুধু একজন ঘরনী চান, চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকা একটা সংসারী স্ত্রী মাত্র। কিন্তু আমি তো নিজেকে শুধু ঘরে আটকে রাখতে পারবো না।’
একটু থেমে ও আবার বলা শুরু করলো,
‘আমার থিসিস শেষের পথে, এরপর এমফিল করবো। থিয়েটারেরও বেশ কিছু কাজ করছি। লেখালেখিও করছি এখন। সামনে আমার অনেক প্ল্যান।’

‘সেই ছেলেটির সাথে আর যোগাযোগ হয়নি কখনো?’
‘না আপু, আশ্চর্য ব্যাপার, সেই ঘটনার পর থেকে একটিবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি সে আমার। অথচ কোন ঝগড়া বা বিবাদ হয়নি কিন্তু আমাদের মধ্যে। খুব খারাপ সিচুয়েশনে আমি বুঝেছি, আসলে সে কী চায়! আমি তখন শুধু বলেছি, ওকে, ইটস ফাইন। আসলে ও নিজের ক্যারিয়ারটাকেই প্রাধান্য দিয়েছে, আমাদের ভালবাসার বা আমার মূল্যায়ন করেনি। শুনেছি একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে টিচার হয়ে ঢুকছে। আমি কখনো বদ দোয়া করিনি ওর জন্য। আমি সবসময় চাই, সে বড় হোক, সফলতার শীর্ষে উঠুক। কিন্তু কখনো কোনদিন যদি তার ভুলের উপলব্ধিটুকু হতো, তাহলে খুশী হতাম।’

ফোনটা রেখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি পেলাম যেন। যে শৈলীকে আমি এতোকাল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছি, সেই আজ আমাকে অনেক বেশী অনুপ্রাণিত করলো যেন। সারাটা ক্ষণ যেন ওর কণ্ঠটাই কানে বাজতে থাকলো,
‘আমি একা অনেক ভাল আছি আপু। জীবনটা আমার এখন অনেক বেশি সুন্দর। একটা ভুল, একটা এক্সিডেন্ট আমার পুরো জীবনের ব্যাপারে, সম্পর্কের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দিয়েছে। আমার জীবনটা এখন অনেক বেশি গুছানো, পরিপাটি। আমি বুঝতে শিখেছি, আমার ভালো থাকার জন্য কোনো পুরুষের প্রয়োজন নেই। জীবনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চাই না। আমি এগিয়ে যেতে চাই। হয়তো জীবনই আমাকে নতুন কাউকে উপহার দেবে, যে আমাকে জানবে, বুঝবে, যার সাথে আমার মনের মিল থাকবে সবদিক থেকে। তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে না। হয়তো সে সম্পর্ক নিজে থেকেই আসবে আমার দুয়ারে। বিশ্বাস করুন, এখন আমার জীবনটাকে অনেক বেশি ভালো লাগে। আমি অ-নে-ক ভালো আছি।’

ভাল থেকো শৈলী। অনেক ভাল থাকো। এগিয়ে যাও আপন আলোয়, আপন শক্তিতে। আমি জানি, তুমি পারবে। শৈলীরা পারে, শৈলীদের পারতেই হয়। পৃথিবীর কোনো বাঁধাই শৈলীদের পথ রুখতে পারেনি কখনো, পারবেও না। একজন শৈলীর আলোয় পথ খুঁজে পাক হাজারো শৈলী। একজন শৈলীর শক্তির ছোঁয়ায় আবেশিত হয়ে জেগে উঠুক আরও সহস্র শৈলী। শত শত কাপুরুষের সত্ত্বাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাক শত সহস্র শৈলী শক্তি।

বগুড়া।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 162
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    163
    Shares

লেখাটি ৭৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.