হ্যালো পুরুষ, আপনাকে বলছি…

0

হাবিবা রিমা:

মেয়েদের নিয়ে আজ পর্যন্ত এমন ধরনের কিছু উদাহরণ পেলাম যার সবটাতেই মেয়েদেরকে খাবারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। গা জ্বালা ধরে আমার এসব শুনলে। আজ এরকম একটা উদাহরণ শুনে মেজাজ খারাপ হলো, তাই লিখতে বসলাম।

বলা হয়, ঢেকে রাখা খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকার কথা, কখনও ডিম এর উদাহরণ টানা হয়। ডিম ভাঙতে হবে একান্তে, ঘরের মধ্যে। রাস্তা-ঘাটে ডিম ভেঙ্গে পড়ে গেলে তাতে পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে ডিম আর খাবার উপযুক্ত থাকে না। মোট কথা, ডিম ভেঙ্গে খাওয়ার জিনিস হলেও তা যেমন ভাঙ্গার এবং খাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ ও নির্দ্দিষ্ট পাত্র চাই, তেমনি নারীর বেলায়ও।

পুরুষেরা ঢেকে রাখা খাবারও না, ডিমও না, তেতুল আমড়া কিছুই না। এসব উদাহরণ কেবল এবং কেবলমাত্র নারীর জন্যই পুরুষের নির্দিষ্ট করা।

পুরুষেরা, আপনাদের মতে পৃথিবীতে মেয়েরা হলো খাদ্যদ্রব্যের সাথে তুলনীয় তুচ্ছ বস্তু সামগ্রী। উদাহরণগুলো দেবার সময় আপনাদের একবারও মাথায় ঢুকে না যে, মেয়েরা না কোনো পণ্য, না কোনো খাদ্য দ্রব্য। তারা জীবন্ত, রক্ত মাংসের মানুষ। খাদ্য দ্রব্য, জড় কাঠ পুতুলের সাথে তাদের তুলনা চলে না।

আপনারা কী ভাবেন? পুরুষের কামদাসী হয়ে সারাজীবন বদ্ধ ঘরে বসে বসে আপনার খায়েশ মেটানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই নারীদের? সারাক্ষণ খাদক শ্রেণির পুরুষের লালসা থেকে বেঁচে থাকা, গা বাঁচিয়ে চলা ছাড়া তাদের আরও অনেক দিকে মনোনিবেশ করার আছে।

পুরুষেরা তাদের লালসাকে সংবরণ করুক। স্ত্রীর সৌন্দর্য শুধু তার স্বামীর দেখার অধিকার আছে এ কথাটা আমি মানি না। এটাও মানি না, নারীরা তাদেরকে আড়াল করে রাখবে, কারণ তাকে দেখবার অধিকার কেবল তার স্বামীরই আছে। সৌন্দর্য নারী পুরুষ উভয়েরই আছে। যদি তা গোপন রাখার এতো দরকার বোধ করেন, তাহলে পুরুষেরা, আপনাদের বেলায়ও তা প্রযোজ্য।

আসলে আপনারা পুরুষেরা নিজেদের নড়বড়ে চরিত্রের কথা খুব ভালো করেই জানেন। আপনারা জানেন যে, আপনাদের দোষ আছে। আপনাদের কাম, আপনাদের লোভাতুর জিহ্বা, কামুক দৃষ্টির উপর প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন আপনারা।

সৌন্দর্য্য দেখে মুগ্ধ হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সীমাবদ্ধতা না। আপনাদের দৃষ্টি, সৌন্দর্য্য কতটুকু দেখে জানি না, তবে আপনাদের লোভী মন, কামুক দৃষ্টি, শাড়ি-ব্লাউজ বা কামিজের নিচে দেখে নারীর একদলা মাংসপিণ্ড, দেখে তার মসৃণ ঊরু, সরু কোমর, নিতম্ব, যৌনাঙ্গ এসব। দেখা না গেলেও আপনারা দেখেন। মনে মনে নারীদের আপনারা ল্যাংটা বানিয়ে ফেলেন। মনে মনে ধরেন, টেপেন, বিছানায় নিয়ে যান।

কখনও কখনও বাস্তবে আপনাদের হিংস্রতার শিকার হয় নারী। আপনাদের সেই লালসাকে, ঘৃণিত পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ না করে, নারীর শরীরে পরিয়ে দিতে চান পাল্লায় পাল্লায় বস্ত্র, বস্ত্রের উপরে আরো বস্ত্র। পরতে পরতে বস্ত্রের কেল্লা বানিয়ে আপনারা বের করেছেন নারীদের নিজেকে সুরক্ষিত রাখার আদিম আর হাস্যকর উপায়। তাও আবার কোন জানোয়ারদের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য? পুরুষের, আপনাদের।

পুরুষেরা, আপনারা আসলে কি করেছেন জানেন? কেড়ে নিয়েছেন নারীর স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার। এনে দিয়েছেন জড়তা, চলার গতিকে করেছেন ধীর। নারীকে সারাজীবনই বস্তাবন্দী দৌড় করাতে চেয়েছেন আপনারা। বস্তাবন্দী দৌড় সারাজীবন ধরে দৌড়ানো কতটা কঠিন, আপনারা জানেন? নারীর পর্দার কথা বলেন আপনারা। আসলে পর্দার দরকার আপনার দৃষ্টির, মনের।

কতটা হাস্যকর ভেবে দেখেন, বাইরে আপনি যাই করে আসেন নিজের বৌকে ষোল আনাই আপনার চাই। তাকে তো আর ভাগ করা যায়না। অন্য মেয়ের সাথে মারিয়ে আসলেও আপনার বৌ কারো সাথে মারাতে পারবেনা। অন্য বেপর্দা নারীর শরীর আপনাকে মুগ্ধ করলেও আপনার বৌ এর শরীর একান্ত আপনার। তা টপটপ করে গেলার অধিকার শুধু আপনার আছে।

আজ বিয়ের আগে কোন পুরুষের সংস্পর্শে আসেনি এমন মেয়ে চান আপনারা। আপনাদের ভাষায় ফ্রেশ, ভার্জিন মেয়ে দরকার হয় আপনাদের। আর অন্য যে মেয়ের সাথে আপনি বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে শুয়ে আসলেন সে আপনার কাছে তাইলে বেশ্যা হলো। তারে বেশ্যা বানালেন আপনি, আর তাকে বৌ হবার অযোগ্য মনে করেনও আপনি। মেয়ে তো পুরুষের সাথেই শুয়েছে। আর বেশ্যা হবার বেলায় বেশ্যা হয়েছে কেবল সে। বাতিল গণ্য হয়েছে কেবল সে।

পুরুষেরা, নারীদের নিয়ে এমন কেন ভাবেন জানেন? কারণ, নারীদেরকে ভোগ্য একদলা মাংস পিণ্ড ছাড়া আর কিছুই ভাবা শেখেননি আপনারা।

আর পর্দার দোহাই দিয়ে কথা বলছেন? নয় মাসের কন্যা শিশুকে স্নান করাতে গিয়ে বাবার দৃষ্টি যখন বারবার ওইটুকু মেয়ের যৌনাঙ্গের দিকে যায় তখন? মাটি দিয়ে বানানো প্রতিমার নারীরুপ যখন পুরুষের কামের উদ্রেক করে, প্রতিমার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে বসে থাকে, তখন?

আসলে শুধরানো দরকার পুরুষের এ হীন মানসিকতা, এ দৃষ্টিভঙ্গি। পুরুষের নিজের দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তার নিজের। নারীর চলাফেরা, সৌন্দর্য দেখিয়ে বেড়ানোর কথা বলা, নারীর খুঁত ধরা পুরুষের এক আদিম ষড়যন্ত্র! নিজের কুকীর্তিকে সমাজে গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত করে তোলার ঘৃণ্য প্রয়াস মাত্র। নারীর উপর আঙ্গুল তুলে নিজের অপরাধকে আড়াল করে নিজের অবস্থানকে ধরে রাখার বর্বর কৌশল মাত্র।

হায়রে পুরুষ, কতো কৌশলে আপনারা নিজের অপরাধের ভার নারীর উপর চাপিয়ে মুক্তি পেতে চান। আপনাদের ধান্ধাবাজি আমরা বুঝি। আপনাদের মতে,

স্বাধীনতা পুরুষকে বানায় বাদশা
আর নারীকে বানায় বেশ্যা….

কারণ কি জানেন? ওই একটাই কারণ। এক জোড়া স্তন, একটা ভ্যাজাইনা আর জরায়ু ছাড়া নারীর মধ্যে আর কিছু দেখতে পারেন না আপনারা। এ সংকীর্ণতা, এ লজ্জা আপনার হে পুরুষ।

এবার আমি যেটা বলতে চাই তা হলো, হে ভালো পুরুষেরা, আপনারা আপনাদের বিশ্বাস, পৌরুষ, পুরুষত্ব আর পুরুষাঙ্গ নিয়ে দূরে থাকুন। আমি বলছি, নারী সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত আপনাদের দ্বারা, তাদের ভয় আপনাদের পৈশাচিকতা, বর্বরতা নিয়ে।

তাই দূরে থাকুন। আমি নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে জোৎস্না মাখি, ঘাসের বুকে লুটোপুটি খাই। আমি বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবো স্বাধীনভাবে, প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবো কাছ থেকে।

ক্ষিপ্রতা দেখাতে আসবেন না, পুরুষাঙ্গ দিয়ে নারী শরীরকে ক্ষত বিক্ষত করবেন না, শরীরের জোর দেখাতে আসবেন না। দূরে থাকুন। আপনি দূরে থাকলেই আমরা সুরক্ষিত থাকবো এমনিতেই।

আমার দৃষ্টিতে, আপনার অযৌক্তিক, ভ্রান্ত বিশ্বাসের দরুণ, আপনার ঘৃণা, উপেক্ষা হাসি মুখে নিতে পারবো কিন্তু আপনার লোভ লালসা, কামনার শিকার হবার চেয়ে, একদলা মাংসপিন্ডধারী মাল হিসাবে মূল্যায়িত হবার চেয়ে অধিকতর শ্রেষ্ঠ মনে করবো। তবু আমার স্বাধীনতা চাই।

তাতে আপনার ভাষায় বিপথগামী বেশ্যা হতে দিন আমাকে। এ স্বাধীনতার নাম যদি বেশ্যার স্বাধীনতা হয় তবে তাই সই।
অন্তত,
ঐ চঞ্চল, সজল পবন বেগে, উদ্ভ্রান্ত মেঘে, মন চাইলেই বলাকার ওই পথ খানি তো চিনে নিতে পারবো……..।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 213
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    213
    Shares

লেখাটি ৮৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.