কোথায় নেমেছে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ?

0

নাসিব নিতু:

কদিন থেকেই মাথায় কথাটা পাক খাচ্ছে। মানুষ হিসেবে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ বোধ নামতে নামতে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? আমরা কি কখনো মানুষ হতে পেরেছি, নাকি ঊনমানুষই রয়ে গেছি?

কয়েকদিন আগে বাসার নিচে নামতেই দেখি রিক্সার সাথে বাইকের ধাক্কায় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। বিশাল সাইজের একটা বাইক চালক ছেলেটার পায়ের উপর পড়ে আছে। ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে। কিন্তু অতি উৎসাহী মানুষ তার পায়ের উপর পড়ে থাকা বাইকটা না সরিয়ে ছেলেটাকে গালিগালাজ করছে। মানছি হয়তো তার দোষ ছিলো, কিন্তু সেও তো আক্রান্ত। তখন ওই ছেলেটার দরকার একটা মানুষের হাত। কিন্তু উপস্থিত জনতার মধ্যে কোনো মানুষ পেলাম না।

দৌড়ে গেলাম, শুনলাম ছেলেটা বলছে পানি খাবো, আমাকে দেখে কাতর কন্ঠে বলে উঠলো, ”আপু একটু পানি খাবো”। দোকান থেকে পানি এনে দিলাম। তখন মনুষ্যত্ববোধ না জাগলেও পুরুষের অহমিকা জেগে উঠেছে। তারা এবার একটু সদয় হলেন, ছেলেটাকে সাহায্য করলেন। এ যাত্রায় হয়তো পা’টা বেঁচে গেল ছেলেটার। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? ওই মুহূর্তে মানুষ হিসেবে আমাদের কী করার ছিলো, আমরা কী করেছি?

গত বৃহস্পতিবার রাতে ওয়ারীতে উচ্চ স্বরে গান বাজানোর প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটা খুব ভালো জানি, কারণ ভিক্টিম আমার হাজবেন্ডের বন্ধুর বাবা। একজন ষাটোর্ধ্ব লোকের জন্য কেউ যখন যায় রিকোয়েস্ট করতে যে, তাঁর হার্টের অসুখের কারণে উচ্চশব্দে সমস্যা হচ্ছে, তারই উপর মানুষের হাত কীভাবে ওঠে? রাস্তায় কোনো নারীকে নির্যাতিত হতে দেখলে তো এই হাত ওঠে না!

সবচেয়ে অবাক বিষয়, লোক যখন বলে “কী দরকার ছিলো বুড়া মানুষের এসবের মধ্যে যাওয়ার?” একবারও মনে আসে না যে ওইস্থানে সে বা তার বাবাও হতে পারতো! আমরা কী অবলীলায় ভুলে যাই, আমরা মানুষ!

গত রবিবার এমপি পুত্রের আত্মহত্যার খবরে দেখলাম একই অবস্থা। কিছু কিছু মানুষের কিছু কমেণ্টের নমুনা এমন, “ইসলামের জ্ঞানের অভাব”, “বাবা-মা সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেনি”, “ইহকাল-পরকাল সবই হারাইলা, এখন কবরের আজাব ভোগ কর” এই রকম সব কমেন্ট। এমন একটা নাজুক সময়ে নিজের ধর্মের জ্ঞান জাহির না করলেই কি না? একবার চিন্তা করেন তো ওই বাচ্চাটার জায়গায় আপনার বাচ্চা! আপনি চোখের সামনে দেখছেন আপনার প্রাণাধিক সন্তান একবুক অভিমান নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে, সেই অভিমান কীসের, তা আপনি জানেন না।

মানবিকতার জায়গায় “ব্লেমিং” জিনিসটা এখন জায়গা করে নিচ্ছে। কিছু হলেই সেটার একটা মনগড়া দায় আমরা খুঁজে নিয়ে ব্লেমিং শুরু করছি। কেন গেল ওইখানে, ওই পোশাক না পরলে ধর্ষন হতো না, কেন বনভোজনে যাইতে দিল, কেন সেণ্টমার্টিন গেল? এইসব কেন’র কোনো উত্তর নেই, আর এইভাবে বেঁচে থাকা যায় না। এমন করে যারা বাঁচে, তাদের বলে কূপমণ্ডূক।

কূপমণ্ডূক মানে জানেন তো? কূয়ার ব্যাং, যে কূয়া থেকে অল্প একটু আকাশ দেখে আর ধারণা করে নেয়, আকাশের পরিধি ঠিক ততটুকুই, যতোটুকু সে দেখছে। জীবন এর বাইরে অনেক বড় কিছু। জীবনবোধ, মনুষ্যত্ব আরও বড়। যেটা ওষুধের মতো বা টিকার মতো দিয়ে দেয়া যায় না। আপনার বিচারবুদ্ধি দিয়ে তা অর্জন করতে হবে।

আসলে আর কতোটা নিচে আমাদের মনুষ্যত্ব নামলে এর নামার শেষ হবে? এ উত্তরটাও আমাদের খুঁজতে হবে, সমাধান আমাদের নিজেদের মাঝেই। শুধু দরকার একটু সহনশীলতা, একটু মানবিকতা, ঊনমানুষ থেকে মানুষ হওয়া।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 189
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    189
    Shares

লেখাটি ৭১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.