ওপেন রিলেশন কী?

শেখ তাসলিমা মুন:

সিমোন দ্য বুভুয়া এবং সার্ত ৫১ বছর একটি ‘ওপেন রিলেশনশিপে’ ছিলেন। বিষয়টি কী? সত্য কথা বলতে পৃথিবীব্যাপী এখনও ‘ওপেন রিলেশনশিপ’ নিয়ে ধারণা পরিষ্কার হয়নি। এখনও সিমোন দ্য বুভুয়া এবং সার্তের রিলেশন ব্যাপক অস্পষ্টতার ভেতর এবং মিসআন্ডারস্টুড।

একই সাথে এখনও সিমোন দ্য বুভুয়া এবং সার্তে এ সময়ের সবচাইতে মডার্ন কাপল।

‘ওপেন রিলেশনশিপ’ কনসেপ্টটি খুব জটিল কিছু নয়। কেবল সঠিকভাবে উপস্থাপনার অভাবে এটাকে আক্ষরিকভাবে একসাথে ‘বহু সম্পর্কের’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিষয়টির সংজ্ঞা এমন মোটা দাগের স্থুল কিছুতেই নয়।

কনসেপ্টটির ব্যাখ্যা এখন খুবই দরকারি, নইলে এটি দিন দিন ভুলদিকে নিয়ে নেওয়া হচ্ছে, বা অলরেডি হয়ে গেছে। মূল বিষয়টি এবং মেসেজটি, মানুষ মানুষকে ভালবাসে বলে কেউ কারও ‘মালিকানা’ নিয়ে নেয় না। এটাই বিষয়টির মূল বক্তব্য। মানুষ মানুষকে পজেজ করে না, বা পজেজ করতে চাইলেও তা করা সম্ভব হয় না। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালবাসে সেটি এক, কিন্তু ভালবাসে বলেই তাদেরকে, তাদের সত্তা, তাদের শরীর ও মনকে কেউ ‘ওউন’ করবে, সেটি এক নয়। এটি করতে গেলেই সম্পর্কে বিপর্যয় আসতে বাধ্য। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালবাসে বলেই মানুষের সেক্সুয়ালিটিকেও কেউ ওউন করে না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ। আমি রিপিট করছি, মানুষ মানুষের সেক্সুয়ালিটিকে ওউন করতে পারে না। সম্ভব নয়।

এ কনসেপ্টটি ক্লিয়ার হওয়া খুবই দরকারি। ‘তোমার হৃদয় আমার হোক, আমার হৃদয় তোমার’ বিবাহের এ মন্ত্রের সাথে যদি যোগ করি, ‘আমার সেক্সুয়াল অরগ্যান তোমার হোক, আমার অরগ্যান তোমার’ ক্ষমা করবেন বিষয়টি আসলে খুবই হাস্যকর। এর মানে বহুগামিতার সনদপত্র এনশিওর করা সেটি ভাবলেও বিষয়টির সরলিকরণ যেমন হয়, একইভাবে বিষয়টির অভ্যন্তরে প্রবেশ ঘটেনি সেটিও প্রমাণ হয়।

‘বহুগামিতা’ এখানে ভিত্তিপ্রস্তর নয়, ভিত্তিপ্রস্তর হলো কেউ কারও সেক্সুয়ালিটির মালিক হতে পারে না। সম্পর্ক মানেই তাকে কাউকে দস্তখত করে দেওয়া হয় না। বা সে দস্তখত দিলে তা মিথ্যে দস্তখতে সাক্ষর করা হয়, সে প্রিটেনশনে আমরা ঢুকি বলেই সেটি ফেইল করি। দস্তখতটি ভেঙে পড়ে। যা ‘অপরাধ’ বাড়ায়। কাজগুলো নিজের কাছেই অন্যায় ও অপরাধ হয়ে নিজেকে ও অন্যকে দূষিত করে তুলবে। যখন কোনো দস্তখত দেওয়ার দরকার পড়ে না, দায়িত্ববোধ তখনই নিজের কাছে ফিরে আসে। আপন জীবন আপন দায়িত্বে যাপন করতে পারে। বাধ্যবাধকতায় নয়, সে তখন যা করবে, নিজ দায়িত্বজ্ঞানে করবে।

এটা সৎ সাহসী মানুষেরাই রিয়ালাইজ করে এবং মোকাবেলা করে। সিমোন দ্য বুভুয়া এবং সার্তে এটি রিয়ালাইজ করেন এবং তারা একে অপরের কোনকিছু পজেজ না করে একত্র জীবন যাপন সম্ভব কিনা সেটি এক্সপেরিমেন্ট করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি একটি স্বেচ্ছা অ্যাক্ট। স্বেচ্ছা সিদ্ধান্ত। কেউ কাউকে বাধ্য করে নয়। কেউ কাউকে অপরাধবোধ চাপিয়ে নয়, অভিযোগ করে নয়, তাদের সকল অনুভব নিজেদের সাথে শেয়ার করবে এমনভাবে একে অপরের সঙ্গী হবার সিদ্ধান্তে আসে। এ সিদ্ধান্ত সহজ নয়। তবু মনে সাথে প্রতারণার পথ তারা পরিত্যাগ করে। কেবল মনের নির্দেশে তারা তাদের কাছে আসবে, এভাবে তারা ৫১ বছর একটি কাপল জীবন কাটিয়ে যায়। এটি শেষ হয় সার্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সিমন দ্য বুভুয়ার মৃত্যুর পর তাকে সার্তের পাশেই সমাহিত করা হয়। এ সম্পর্কটি ‘ওপেন রিলেশন’ এর এখনও একটি একক উদাহরণ। কিন্তু এখনও এটি অনেকের কাছে ক্লিয়ার নয়। যার যেমন খুশি আলোচনা সমালোচনায় ব্যাখ্যা দিয়ে যায়। যাচ্ছে।

পৃথিবীর স্টাব্লিস্টমেন্ট একদিনে গড়ে উঠে নাই। প্রাতিষ্ঠানিক ডিজাইন মগজের পরতে পরতে সেগুলো ঢুকে আছে। সেখান থেকে বন্ধনমোচন ঘটেনি। শৃঙ্খল মুক্তি ঘটেনি। সে বন্দিত্ব মুক্তি সহজ কথাও নয়। কোনো একটি জায়গায়ও একটি পাথরে ঠেকে আছি মানে, মনে করতে হবে ঠেকে আছি। অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণ মুক্তির! বাঁধার সে পাথরটি সরে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে ঝর্ণা হয়ে বেরিয়ে আসার জন্য।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.