‘তবু আশা জাগে, তবু ভালো লাগে’

0

সেলিম জাহান:

‘সত্য বাবুদের বাড়ির প্রতিমা সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে’- বেশ জোরের সঙ্গেই সিদ্ধান্তটি জানায় তিনটে কিশোরের একটি। ‘তোকে বলেছে!’, প্রতিবাদ জানায় দ্বিতীয় কিশোরটা,’সবচেয়ে ভালো হয়েছে চকবাজারের মণ্ডপ’।

‘তুই প্রতিমার কী জানিস?’, রেগে যায় প্রথম কিশোরটি, ‘তোরা পূজো করিস?’ উত্তেজিত দু’কিশোর প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে আসে। তৃতীয় যে বালকটি এতোক্ষণ চুপচাপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল, সে এবার নীচুস্বরে বলে, ‘এই চুপ, চুপ! পণ্ডিত মশাই আসছেন’। অন্য দু’টি কিশোর এ সাবধান বাণীতে সচেতন হয়ে ওঠে। ততক্ষণে একেবারে কাছে পড়েছেন। ‘নমস্কার, পণ্ডিত মশাই’ বলতে বলতে দু’মিনিট আগের ঝগড়া ভুলে গিয়ে তিন কিশোরই পণ্ডিত মশাইয়ের পদতলে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত’।
‘বেঁচে থাকো, বাবারা। দীর্ঘজীবী হও’। বলতে বলতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী তিন কিশোরেকে বুকে টেনে নেন পণ্ডিত মশাই সত্যবাবুদের বিরাট পূজো মণ্ডপের সামনে। পঞ্চান্ন বছরেরও ওপরে কোনো এক বিজয়া দশমীর দিন। স্হান বরিশাল শহরের মধ্যিস্হান।

‘খুব ক্ষিদে পেয়েছে’, তিন কিশোরের একজন ঘোষণা করে পণ্ডিত মশাইয়ের বিদায়ের ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই – কিছুক্ষণ আগের জোর তর্ক তখন ইতিহাস মাত্র। ‘বিমলদের বাড়ি সবচেয়ে কাছে’, একজন বলে ওঠে। মিনিট দশেকের মধ্যেই তিনজন বিমলদের বাড়ির রান্নাঘরের সামনে। বিমলবাবু তখন সবেমাত্র ফলারে বসেছেন। এ ত্রিমূর্তিকে দেখে তিনি মোটেই প্রীত হোন না – বুঝতেই পারেন বন্ধুরা ভাগ বসাতেই এসেছে। কিন্তু ভীষণ খুশি হোন আশা মাসিমা – বিমলের মা। উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাঁর মুখ হাসি আর আনন্দে।

‘আয়, আয় বোস’, বলতে বলতে তিন পাত পাড়েন তিনজনের জন্য। ক্ষিদের চোটে ত্রিরত্ন মাসীমাকে বিজয়ার প্রণাম করতেই ভুলে যায়। ‘ওদের পাতে দুটো করে নাড়ু দিয়েছো কেন? আমাকে দিয়েছো একটা মাত্র’, বিমলবাবু কাঁদো কাঁদো গলায় বলে। ‘ছি:, এভাবে বলতে হয় না। ওরা অতিথি না? অতিথি নারায়ণ’, বিমলের মা ভারী নরম গলায় বলেন। ‘কেন, ঈদের সময়ে যখন আমাদের বাড়িতে যাস, তখন আম্মা তোকে আটটা মাংসের টুকরো দেন না? আমাকে দেন মাত্র চারটে’, একটি কিশোর মোক্ষম যুক্তি উত্থাপন করে।

পেটপূজো সেরে মাসীমাকে কোনক্রমে একটি ছোট্ট প্রণাম সেরে তিন বন্ধু বাইরে এসে দাঁড়ায়। পেটটা ঠিকমতো ভরানো হয়নি – কী করা যায় এখন। ‘চল, শুভদের বাড়িতে গিয়ে রাবড়ি খেয়ে আসি’, একজন প্রস্তাব দেয়। এর চেয়ে ভালো কথা আর হয় না – ভাবে অন্য দু’জনা। নীলিমা কাকীমা ভারী ভালো রাবড়ি বানান। শিবরাম পড়ার পর থেকেই তিনজনাই রাবড়ির ভারী ভক্ত। মিনিট বিশেক পরে এই তিন হরিহর আত্মাকে দেখা যায় কলেজ পাড়ায় শুভেন্দুদের বাড়ির সামনের দরজায়।

খোলা দরজা দিয়ে তিনজনেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে। আর পড়বি তো পড়বো একেবারে নীলিমা কাকীমার সামনে। একপেড়ে করে পরা মোটা লাল পাড়ের গরদ পরা, কপালে লাল বড় টিপ, শাঁখা-সিঁদুরে ফর্সা কাকীমাকে প্রতিমার মতো মনে হয় তিন কিশোরের কাছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম কাকীমার, দু’হাতে দু’টো নৈবেদ্যের থালা। ঢিপ ঢিপ করে কাকীমাকে প্রণাম করে তিনজনই।

‘ওরে, থাম, থাম। থালা দু’টো আগে নামিয়ে রাখি’। কাকীমা বলে ওঠেন। ‘রাবড়ি আছে?’, সময় নষ্ট করতে রাজী নয় ত্রিরত্ন। ‘ও, এ’জন্যই আসা বাবুদের’, মুখ টিপে হাসেন নীলিমা কাকী, ‘বিজয়ার প্রণাম-ট্রনাম কিছু নয়’। ঢিপ ঢিপ করে আবার প্রণাম – রাবড়ি না ফসকে যায়। খিল খিল করে হেসে ওঠেন কাকীমা। তারপর ভারী মায়াময় কণ্ঠে বলেন, ‘আয়, দিচ্ছি’।

রাবড়ি দিয়ে পেট ভরিয়ে রাস্তায় নামতেই দেখা গেল হারান কাকা আর সিরাজ চাচা গল্প গল্প করতে এদিকেই আসছেন। ‘রাবড়ি খেতে আসছেন’, তিন কিশোরের একজন বাকি দু’জনকে জানায়। তারপর তিনজনই হাসিতে ভেঙে পড়ে। ‘কিরে, টই টই করে সারা দুপুর পাড়া বেড়াচ্ছিস কেন? যা বাড়ি যা’, সিরাজ চাচা ধমকে ওঠেন। ওঁরা পার হয়ে যেতেই তিন কিশোর ঠোঁট বাঁকায় – ‘হুঁ, নিজেরা পাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে! আর আমরা ঘুরলেই যতো দোষ’। ‘বড়রা ভারী হিংসুটে হয়’, দ্রুত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে তিন কিশোরের এক মিনিটও লাগে না।

ঠিক তখনই দেখা যায় বাঁদিকের গলি থেকে বেরিয়ে আসছেন নাজমা আপা আর রত্নাদি। স্কুলের শেষ বছরে পড়া দু’জন গলায় গলায় বন্ধু। গুজ গুজ করে তিন বন্ধু কি যেন মতলব ফাঁদে। তারপর বান্ধবী দু’জন একেবারে সামনে আসতেই দু’জন কিশোর দ্রুত প্রণামের ভঙ্গিতে দুই আপা আর দিদির পা জড়িয়ে বসে পড়ে। তরুণী দু’জন চরম বিব্রত। ‘এই, একি শয়তানী হচ্ছে!’, ‘দাঁড়া, এমন মার খাবি না!,

‘ছেড়ে দে লক্ষ্মী ভাই আমার’ – ভয় দেখানো, অনুরোধ-উপরোধ, কিন্তু নট নড়ন চড়ন, নট কিচ্ছু। ‘বিজয়ার প্রণাম। দু’জনকে দু’টো টাকা দিয়ে দাও, ছেড়ে দেবে’, তৃতীয় কিশোরটি ত্রাণকর্তার ভূমিকা নেয়। পারলে তিনজনকেই ভস্ম করে দেয় তরুণী দু’জন তাদের চোখের দৃষ্টি দিয়ে। দিতেই হয় টাকা – তিন কিশোরের উল্লাস দেখে কে? আপাতত: বাড়ি যাওয়া যাক। রাতে আবার প্রতিমা বির্সজনের সময়ে দেখা হবে।

গভীর রাত। কীর্তনখোলার পাড়। প্রতিমা নৌকোয় করে মাঝ নদীতে গেছে। ঢোলের বাদ্যি তুঙ্গে। নদীর পাড় ধরে শত শত মানুষ। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ঐ তিন কিশোর। সবার চোখে জল – তিন কিশোরেরও। প্রণামের ভঙ্গিতে সবাই যুক্তকর হয় – কে কোন ধর্মের তা সেখানে তুচ্ছ। এক সময়ে ঝপাৎ করে একটা শব্দ হয় – প্রতিমা বির্সজিত হয়েছে। তিন কিশোর বন্ধু জলভরা চোখে পরস্পরকে টেনে নেয় উষ্ণ আলিঙ্গনে।

আজও বিজয়া দশমী। কিন্তু সময় কত বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষ। এক সময় যা ছিল সার্বজনীন, আজ তা হয়ে গেছে খণ্ডিত, এক সময়ে যা ছিল অবিভাজ্য, আজ তা হয়ে গেছে বিভাজিত, এক সময়ে যা ছিল বৃহত্তর সংস্কৃতি, আজ তা হয়ে গেছে সীমিত ধর্ম।

বলা হচ্ছে, রাম আর রহিম আলাদা, জলের সঙ্গে পানি মিলতে পারে না, আল্লাহর আর ভগবান এক নন। নানান জায়গায় পূজোতে বাধা দেয়া হচ্ছে, মণ্ডপ ভাঙ্গা হচ্ছে এখানে ওখানে। ‘অদ্ভুত এক আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ’। ‘তবু আশা জাগে, তবু ভালো লাগে’ – বিজয়ার শুভেচ্ছা যাচ্ছে এক মানুষের কাছ থেকে আরেক মানুষের কাছে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। ‘ভালো থাকুক সবাই, আনন্দ আসুক প্রতিটি জীবনে, মঙ্গল হোক সবার’ – সব শুভেচ্ছার ওটাই তো মূলকথা। কিন্তু তার পরেও কথা আছে বিজয়ার শুভেচ্ছার – ‘আমরা কেউ একা নই, আমরা সবাই সবার সঙ্গে আছি, আমরা সবাই মিলে ঐ অদ্ভুত আঁধারকে সরিয়ে দেব’। আমাদের সবার ‘মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে’।

পঞ্চান্ন বছর পরে আজকের বিজয়া দশমীতে ঐ তিনটে কিশোরের একজন পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে। ঐতো ১৯৬৪ এর দাঙ্গার পরে অপূর্বরা চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে অতি ভোরে। ঠেলাগাড়ির মাথায় বসা অপূর্ব জামার হাতায় চোখ মুছছে। আজকের পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকা কিশোরটি হাতের ডালটি মট করে ভেঙ্গে ফেললো – কোন রাগে কে জানে! ঐ তো তার ক’বছর পরে ডেনিসরা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমালো – সংখ্যালঘু খৃস্টানদের জন্য নিরাপদ নয় এই দেশ।

যেদিন ওরা চলে যায়, আজকের পেছন ফিরে তাকানো কিশোরটি শুধু একবার আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। কী যে তার নালিশ, আর কার কাছে যে নালিশ – কে জানে? আস্তে আস্তে পেছন ফিরে তাকানো কিশোরটি সামনের দিকে মুখ ফেরায় – দেখা যায় তাকে পরিস্কার।

এ তো আর কেউ নয় – এ যে আমি।

লেখক: Selim Jahan

(Published as part of Social Media Campaign #BeHumaneFirst to promote secularism in Bangladesh)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 363
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    363
    Shares

লেখাটি ১,১৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.